জ্বর কমলে মশার কামড়েও ডেঙ্গু ছড়ায় না

২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১৬২৬ , আরও ৪ জনের মৃত্যু * মোট আক্রান্ত ৫৭,৯৯৫ জন

  রাশেদ রাব্বি ২২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু জ্বর

জ্বর কমে যাওয়ার পর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর রক্তের মাধ্যমে এ রোগ ছাড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেই- এমন তথ্য দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জ্বর কমতে শুরু করলে সংশ্লিষ্ট রোগীকে কোনো এডিস মশা কামড়ে আবার অন্য কাউকে আক্রমণ করলে সেই ব্যক্তির শরীরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটবে না।

কারণ জ্বরের শুরু থেকে ৫ দিন পর্যন্ত শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস সক্রিয় অবস্থায় থাকে। এরপর ভাইরাসের ‘ডিটিকশন লেভেল’ অনেক নিচে নেমে যায়। ফলে জ্বর কমে যাওয়ার পর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শরীরে ভাইরাসের যে অবস্থান থাকে, সেটি মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা খুবই ক্ষীণ।

এদিকে গত তিন দিন (রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার) ক্রমান্বয়ে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে দেখা গেলেও বুধবার তা সামান্য বেড়েছে। ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬২৬ জন, যা আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ৫৪ জন বেশি। এর মধ্যে রাজধানীর ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৭১১ জন এবং দেশের অবশিষ্ট জেলাগুলোয় ৯১৫ জন রয়েছে।

এর আগে রোববার ১৮ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬১৫ জন। যার মধ্যে ৭৫৭ জন ঢাকায়, ৮৫৮ জন ঢাকার বাইরের। এর পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৩৪ জন এবং ঢাকার বাইরে ৯৭২ জন, মোট ১৭০৬ জন।

বুধবার সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী ২১ আগস্ট পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৮৫ জনে। যদিও চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪৭ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা হচ্ছে ৫৭ হাজার ৯৯৫ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র।

তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টায় কিছুটা রোগী বাড়লেও সামগ্রিকভাবে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমেছে ৩ শতাংশ।

জ্বর কমার পর আক্রান্ত রোগী থেকে ডেঙ্গু ভাইরাস না ছড়ানো প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুনসী যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে ৫ থেকে ৭ দিন। অর্থাৎ ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর জ্বর হতে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগে। মানুষ ভেদে জ্বর থাকে ৩ থেকে ৫ দিন। জ্বর হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৫ দিন পর্যন্ত ভাইরাস সক্রিয় থাকে।

এই সময়ে পরীক্ষায় শরীরে ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এরপর ভাইরাসের ডিডেকশন লেভেল এতটাই নিচে নেমে যায় যে, সাধারণ প্রক্রিয়ায় রক্তে সেটি চিহ্নিত করা যায় না। তাই এমন কোনো ব্যক্তি যার জ্বরের আক্রান্ত সময় ৫ দিন অতিবাহিত হয়েছে, তার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে।

এছাড়া মুগদা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম ছামসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ১২ দিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। ভাইরাস সংক্রমণের ৫ থেকে ৭ দিন পর জ্বর হয় এবং ৩ থেকে ৫ দিন পর জ্বর সেরে যায়। এরপর আরও এক সপ্তাহ ভাইরাস শরীরে থাকলেও অতটা সক্রিয় অবস্থায় থাকে না। তাই এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছাড়ানোর ঝুঁকি সীমিত হয়ে পড়ে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় সারা দেশে ইতঃপূর্বে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার নির্ণয় করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণার ফল প্রকাশ হয় ২০১৬ সালে। সেখানে দেখা গেছে, ওই সময়ে ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৭১ ভাগ।

বরিশালে ২৭ দশমিক ৮৬ ভাগ, চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ৮২ ভাগ, খুলনায় ৫৮ দশমিক ৪৩ ভাগ, রাজশাহীতে ৮ দশমিক ৭৭ ভাগ, রংপুরে ১৯ দশমিক ৮১ ভাগ এবং সিলেটে ২৩ দশমিক ৩০ ভাগ। এ থেকে সহজেই প্রতিয়মান হয় যে, ভয়াবহ পর্যায়ে না পৌঁছলেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি কয়েক বছর আগে থেকেই ছিল আশঙ্কাজনক।

এদিকে চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগে নারীর তুলনায় পুরুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৬ ভাগই পুরুষ আর ৩৪ দশমিক ৪ ভাগ নারী। বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি (৩০ ভাগের বেশি) আক্রান্ত হয়েছে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা। এরপরেই রয়েছে ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা, যাদের আক্রান্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। এছাড়া ১৫ শতাংশের কিছুটা কম আক্রান্ত হয়েছে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সীরা।

হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে বুধবার ২১ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৯৯৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের। এই সংখ্যা ১৯ বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট রোগীর চেয়ে অনেক বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫০ হাজার ১৪৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০০০ সালের পর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি ছিল ২০০৩ সালে।

সে বছর সরকারি হিসাবে ৪৮৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১০ জনের মৃত্যু হয়। সরকারি হিসাবে এই সময়ে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় ২০০০ সালে। সেবছরই বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গুরে প্রাদুর্ভাব ধরা পড়ে। ওই বছর দেশে পাঁচ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালে ৬ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও মৃত্যু ঘটে ৫৮ জনের।

২০০১ সালে সরকারি হিসাবে ২ হাজার ৪৩০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ওই আট বছরে কখনোই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়ায়নি। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ৪৬৬ জন, ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন, ২০১০ সালে ৪০৯ জন, ২০১২ সালে ৬৭১ জন এবং ২০১৪ সালে ৩৭৫ জন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হন। সরকারি হিসাবে ২০১২ সালে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সাল থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার বাড়তে শুরু করে। ২০১৭ সালে কিছুটা কমে ২০১৮ সালে আবার বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে ৬ জন, ২০১৬ সালে ১৪ জন, ২০১৭ সালে ৮ জন এবং ২০১৮ সালে ২৬ জন সরকারি হিসাবে মারা যান মশাবাহিত এ রোগে।

এদিকে চলতি বছরে জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৩৮ জন ফেব্রুয়রিতে ১৮, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মেতে ১৯৩, জুনে ১ হাজার ৮৮৪, জুলাইয়ে ১৬ হাজার ৫২৩ এবং চলতি মাসের ২১ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৯ হাজার ৫৩৪ জন। এর মধ্যে এপ্রিলে ২ জন, জুনে ৫ জন, জুলাইয়ে ২৮ জন এবং চলতি আগস্টে এ পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে এ রোগে।

চার মৃত্যু : ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বুধবার। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম খাদিজা আকতার নীলা (২৭)। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার স্বামীর নাম মো. মনির হোসেন। বাড়ি গেণ্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ। তার এক আত্মীয় আবুল হোসেন যুগান্তরকে জানান, ঈদের দিন থেকে নীলা জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে গত ১৬ আগস্ট তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।

যুগান্তরের ফরিদপুর ব্যুরো জানায়, ফরিদপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সাহেব আলী নামের এক ব্যক্তি। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর সদর উপজেলার মাটিপাড়া গ্রামে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, সোমবার সকালে গুরুতর অবস্থায় সাহেব আলীকে ফমেক হাসপাতালে আনা হয়। রাতেই তার মৃত্যু হয়।

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার পিংলাকাঠি গ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪ সন্তানের জননী নাছিমা বেগম (৩৫) নামের এক গৃহবধূ মারা গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেয়ার পথে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শেফালী (৪৫) নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। সে বর্নী গ্রামের লুতফর রহমানের স্ত্রী। মঙ্গলবার প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে জামুর্কী হাসপাতালে যান শেফালী। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×