কিশোর গ্যাং: ‘বড়ভাইদের’ হাত ধরে বিপথগামী কিশোররা

বরগুনায় আর নতুন গ্যাং তৈরির সুযোগ হবে না -এসপি মারুফ হোসেন

  এম. মজিবুল হক কিসলু, বরগুনা ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর গ্যাং
কিশোর গ্যাং। প্রতীকী ছবি

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার পর সরাসরি আলোচনায় আসে সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং ‘০০৭ বন্ড’। ওই হত্যায় জড়িত ‘০০৭ বন্ড’-এর স্রষ্টা নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীসহ অনেকেই গ্রেফতার হওয়ার পর গ্রুপের বাকি সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েছে।

এটি ছাড়াও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ‘লারেলাপ্প’ ও ‘হানি বন্ড’সহ কিশোরদের একাধিক গ্রুপ এখনও সক্রিয় বরগুনায়। কিশোরদের মাদকের নেশায় পেয়ে বসা ও মাদক বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি অভিভাবকদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিশোরদের অপরাধ জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যরা।

নয়ন বন্ডের নিজ হাতে গড়া ‘০০৭ বন্ড’ গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় হলেও এখন পর্যন্ত এ গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১১৯। এরই মধ্যে এ গ্রুপের অনেকেই যোগ দিয়েছে বা দিচ্ছে ‘লারেলাপ্প’ ও ‘হানি বন্ড’ গ্রুপে। এসব গ্রুপের প্রায় সবাই বরগুনার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত।

বরগুনা জিলা স্কুল ও বেসরকারি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এ গ্রুপে যুক্ত। শহরের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে হতদরিদ্র, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যম কর্মীদের সন্তানরাও এই গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে।

বরগুনা জিলা স্কুলের একজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, রিফাত শরীফ হত্যার পর আমরা অনেকেই ‘পার্ট অব ০০৭’ নামে একটি গ্রুপ তৈরি করেছি।

কথা হয় বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং গ্রুপের হোতাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে এসেছে। পুলিশের বিভিন্ন শাখা এ নিয়ে কাজ করছে। নতুন করে গ্যাং তৈরি হওয়ার আর কোনো সুযোগ বরগুনা শহরে নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অনেক সময় বিদ্যালয়ের কেবিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিশোরদের মধ্যে বিভক্তি শুরু হয়। তাদের মধ্যে মেধার বিকাশ না ঘটে উল্টো শক্তি প্রদর্শন শুরু হয়। তৈরি হয় গ্রুপ ডিলার। অনেক সময় ‘বড়ভাইদের’ সহায়তাও চাওয়া হয়।

আর এই ‘বড়ভাইরা’ও পরে এই কিশোরদের নানা কাজে ব্যবহার করে। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কিশোররা নিজেদের প্রভাবশালী ভাবতে শুরু করে। পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো ইস্যুতে নিজেদের সম্পৃক্ত করে।

সমাজের কূটচালে জড়িয়ে সংঘাত, হানাহানি থেকে শুরু করে ছিনতাই, জমি দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অনেক সময় খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে।

গত ১০ বছর ধরে বরগুনা জিলা স্কুলের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন আবদুর রহমান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রায়ই এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা মারামারি করে। পরে ‘বড়ভাইরা’ এসে মীমাংসা করে দেয়। ‘বড়ভাই’ কারা- এমন প্রশ্নে তিনি নিশ্চুপ থাকেন।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র রাইয়ান হাসান অন্তর যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী নেতৃত্বে আসতে চায় তাদের প্রায় সবাই কোনো-না-কোনো বড়ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। তাদের নানা প্রয়োজনে বড়ভাইরা এগিয়ে আসে।

এরা মাদকের সঙ্গে যুক্ত কি না, জানতে চাইলে অন্তর বলে, সবাই তো আর ভালো না, কেউ কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

ওই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রবিউল হাসান ইমন বলে, ‘বড়ভাইরা’ই শিক্ষার্থীদের মাঝে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। ‘বড়ভাইদের’ পরিচয় জানতে চাইলে সে নিশ্চুপ থাকে। পীড়াপীড়ি করার পর সে বলে, এই বড়ভাইয়ের নামের প্রথম অক্ষর ‘স’।

বরগুনার সবচেয়ে পুরনো বিদ্যাপীঠ জিলা স্কুলের দক্ষিণ দিকে প্রধান শিক্ষকের বাসভবন। বেশ কয়েক বছর ধরেই ভবনটি পরিত্যক্ত। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল এটি এখন মাদকের অভয়াশ্রম। মাদকের উপাদান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তখনও।

একই অবস্থা বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের ভেতরেও। ছাত্রাবাসটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা না হলেও সেখানে কেউ না থাকায় ছাত্রাবাসের কয়েকটি কক্ষে নির্বিঘ্নে চলে মাদক সেবন।

হোস্টেলের পেছনের দিকে দীঘির পাড়ের সরু গলি পথ ধরে সামনে এগোতেই দেখা মেলে গোপন একটি দরজা। মাদক সেবনের পর ওই পথ ধরেই বেরিয়ে যায় মাদক সেবনকারীরা। উত্তর প্রান্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি পরিত্যক্ত ভবনে দেখা গেল, সেখানেও পড়ে আছে সদ্য সেবন করা ইয়াবার উপাদান ও সরঞ্জামাদি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্র বলছিল, এখানে ‘বড়ভাইয়েরাও’ মাদক নেয়। স্কুল চলাচলে ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মাদকের স্পটে চলে যায়।

জানতে চাইলে বরগুনা জিলা স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিদ্যালয়ের ভেতরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আমাদের জানা ছিল না। তবে এখন সতর্ক হয়েছি। এরপর যাতে এ বিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোনো গ্যাং সৃষ্টি হতে না পারে সে জন্য প্রশাসনের সহায়তা নেয়া হবে।

ওই প্রধান শিক্ষক আরও জানান, ইতিমধ্যে এ ধরনের ছাত্রদের তালিকা তৈরির জন্য বলা হয়েছে। ছাত্রদের গতিবিধি লক্ষ রেখে তালিকা করার জন্য শিক্ষকদেরও বলা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তালিকা তৈরির কাজ শেষ হবে।

কথা হয় শহরের অসহায় অভিভাবক গোলাম হায়দারের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রভাবশালী তরুণদের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায় যুক্ত একটি চক্র সুকৌশলে কিশোরদের টার্গেট করে মাদক সেবনে অভ্যস্ত করছে। মাদকাসক্তদের কেউ কেউ সরাসরি খুচরা বিক্রেতায়ও পরিণত হচ্ছে।

বরগুনা জেলা পাবলিক পলিসি ফোরামের সভাপতি হাসানুর রহমান ঝন্টু যুগান্তরকে বলেন, অধিকাংশ পুলিশ প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে শিথিলতা, রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয় ও পরিবারের দায়িত্বহীনতার ফলেই কিশোররা বখে যাচ্ছে। অপরাধী কিশোরদের আইনের আওতায় আনা এবং তাদের প্রশ্রয়দাতাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর গ্যাং একদিনে সৃষ্টি হয় না। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।

বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবির মোহাম্মদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বরগুনায় কিশোর গ্যাং বন্ধসহ শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে সরিয়ে আনতে পুলিশের আইনি কার্যক্রমের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজ, মসজিদের ইমামসহ সর্বস্তরের মানুষের সমন্বয়ে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম নেয়া হচ্ছে। বরগুনায় যাতে আর কোনো ন্যক্কারজনক ঘটনা না ঘটে সে জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×