কিশোর গ্যাং

ভৈরবে মাদকের ভয়াবহতায় আগ্রাসী কিশোররা

মাদকের টাকা জোগাড় করতেই তারা ছিনতাই খুনাখুনিতে জড়াচ্ছে -ইউএনও

  আসাদুজ্জামান ফারুক, ভৈরব প্রতিনিধি ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর গ্যাং

ভৈরবে কিশোরদের মধ্যে সংঘবদ্ধ হয়ে চলার প্রবণতা বাড়ছে। এই কিশোররাই গ্যাং কালচারে জড়িয়ে গড়ে তুলছে নিজেদের সাম্রাজ্য। আর এই সাম্রাজ্য রক্ষায় তারা জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষ ও খুনাখুনিতে। এছাড়া মাদকের বিস্তার তাদের করে তুলছে আরও আগ্রাসী। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিশোররা ছিনতাই, অপহরণ, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। নারীদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে তারা ভাড়ায়ও খাটছে। অনেকে জেল থেকে বেরিয়েই দ্বিগুণ উৎসাহে নিয়োজিত হচ্ছে আগের অপকর্মে। দিন দিন তাদের অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলছে।

৩০ মে ভৈরবের তিন কিশোর মিলে তাদের বন্ধু ফারদিন আলম রূপককে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করে। নেশার টাকা জোগাড় করতে রূপককে অপহরণ করে তারই বন্ধু ফজলে রাব্বি পিয়াস (১৬), আরাফাত পাটোয়ারী (১৫) ও রেজাউল কবির খান। শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণ না পেয়ে তারা রূপককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘটনার পরদিনই ভৈরব থানা পুলিশ ওই ৩ কিশোরকে গ্রেফতার করে। এর আগে ২৬ মে শহরের রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এক ব্যবসায়ীর টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই করতে গিয়ে ৫ কিশোর ধরা পড়ে রেলওয়ে পুলিশের হাতে। এরা হচ্ছে আবদুল্লাহ (১৬), মাহমুদুল হাসান (১৪), দুলাল (১৫), আজিজুল (১৭) ও নুর মোহাম্মদ (১৫)। কয়েক মাস আগে ভৈরবের মেঘনা নদীর পাড়ে তিন কিশোর ছিনতাই করতে গিয়ে সহকর্মী বাপ্পীকে (১৪) ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। একই সময়ে গোলাম হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন এক কিশোর ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে। ১৭ ফেব্রুয়ারি এক কিশোর ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ব্যাংক কর্মকর্তা বাবুল গুরুতর আহত হন। গত বছর শহরের নদীর পাড় এলাকায় ছিনতাই কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় কিশোর অপরাধীরা পুলিশ কনস্টেবল আরিফুরকে হত্যা করে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরাতেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উঠতি বয়সী কিশোররাই এসব ছিনতাই কাজে নিয়োজিত। পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক সময় কিশোর অপরাধীদের ধরার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদেরকে সংশোধনাগারে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। পুলিশ জানায়, ৬ মাসে ভৈরবে কমপক্ষে ২০-২৫ জন কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। এদের মধ্যে কামাল, শফিকুল, বিল্লাল, আ. আলী, আল-আমীন, সাদ্দাম, সুজন, রাব্বি, মোরশেদ, অনিক খানের নাম উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে নারীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় দু’জনকে ৩ মাসের সাজা দেয়া হয়েছে। এক বছরে ভৈরব থানায় বিভিন্ন অপরাধে কমপক্ষে শতাধিক কিশোর অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে অন্তত ২০ জনকে। এরা জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে থানা পুলিশের অভিযোগ। ভৈরব পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট ফখরুল আলম আক্কাছ মনে করেন, মাদকের সম্পৃক্ততার কারণে সমাজে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। তিনি বলেন, অভিভাবকরা সচেতন হলে কিশোর অপরাধ কমতে পারে।

২৩ জুলাই ভৈরবে কমিনিউটি পুলিশিং সভায় কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনাদেরকে প্রতিনিয়ত সন্তানের খোঁজখবর রাখতে হবে। সন্তান লালনপালনের দায়িত্বে অবহেলার কারণেই কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। স্থানীয় অনেকেরই অভিযোগ, কিছু পরিবারের আর্থিক দুরবস্থাও অপরাধের কারণ বলে অনেকেই মনে করেন। ঘরে খাবার না পেয়ে অনেক কিশোর চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভৈরবে মাদক ব্যবসা, মাদক সেবনই কিশোর অপরাধের মূল কারণ বলে মনে করেন সমাজপতিরা। ভৈরবে কিশোর অপরাধীদের একাধিক গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে রূপক, মুরাদ, নিবির ও অপুর নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় গ্যাংটি সবচেয়ে দুর্ধর্ষ। প্রতিটি গ্যাংয়েই প্রায় ৮-১০ জন কিশোর রয়েছে। অনেক গ্যাংয়ে কিছু নারী সদস্যও রয়েছে। নারী সদস্যদের মূলত মাদক বেচাকেনার কাজে লাগানো হচ্ছে। ধনীর দুলালদেরও দেখা যায় এসব গ্যাংয়ে। গত সপ্তাহে পৌর কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় দুই কিশোর ছিনতাইকারী বাজিতপুরের এক গৃহবধূকে ছুরিকাঘাত করে তার টাকা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।

ভৈরবের রেলওয়ে হাইস্কুলের পরিচালনা পরিষদ সভাপতি মির্জা সুলাইমান মনে করেন, পুলিশ দিয়ে কিশোর অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। এই এলাকায় মাদকের ছড়াছড়িতে অনেক কিশোর মাদকসেবনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। ইদানীং ভৈরবে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে গেছে। এ কারণে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। মাদকের টাকা না পেলে ভয়ংকর হয়ে চুরি-ছিনতাইসহ খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। তাই সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। ভৈরবের সামাজিক সংগঠনের নেতা, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক সত্যজিৎ দাস ধ্রুব বলেন, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণে সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে। অভিভাবকসহ সমাজের সবাইকে সচেতন হলেই কিশোর অপরাধ কমতে পারে।

ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোখলেছুর রহমান জানান, প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক সচেতন হলেই কিশোর অপরাধ সমাজ থেকে বিতাড়িত হতে পারে। কারণ পরিবারের সন্তানদের খোঁজখবর রাখার দায়িত্ব অভিভাবকদের। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে। তিনি ভৈরবে মাদকের ভয়াবহতার কথা স্বীকার করে বলেন, মাদক ব্যবসা, মাদকসেবনই কিশোর অপরাধের মূল কারণ। অনেক সময় কিশোর অপরাধীদের ধরে পুলিশকে বিপদে পড়তে হয়। মামলা দিয়ে আদালতে পাঠালে তাদের বেশি দিন জেলে রাখা যায় না। মানবিক কারণেই আদালত তাদের জামিন দিয়ে দেয়। নেশাগ্রস্ত কিশোররা জেল থেকে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এ কারণে প্রতিটি পরিবারের অভিভাকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ভৈরব উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুজ্জামান জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কিশোর অপরাধীদের সাজা দিলেই তারা ভালো হয়ে যাবে এমন নয়। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। নিজের সন্তান প্রতিদিন কোথায় যায়, লেখাপড়া করছে কি না, রাতে কখন বাসায় ফিরে- সব খবর রাখতে হবে। এলাকায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনোদন বাড়াতে হবে। তাহলেই কিশোররা আনন্দ করে দিন কাটাবে।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত সাদমিন জানান, মাদকের ভয়াবহতা এখানে বেশি। কিশোর অপরাধীরা মাদকসেবনের টাকা জোগাড় করতে শহরে চুরি, ছিনতাই, খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। শুধু সাজা দিয়েই কিশোর অপরাধ দমন করা মোটেও সম্ভব নয়। সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×