যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে পাবনা পৌরসভার মেয়র

সফলতা-ব্যর্থতা দুটোই আছে: পাবনা পৌরসভার মেয়র

সিটি কর্পোরেশন দাবি পৌরবাসীর

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা

পাবনা পৌরসভার মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু

পাবনা পৌরসভার পথচলা শুরু ১৮৭৬ সালের ১ জুলাই। এর আয়তন ২৭ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ৮৮ জন।

১৯৮৯ সালের ৩০ আগস্ট পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। পৌরসভায় বর্তমানে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক ছাত্রনেতা কামরুল হাসান মিন্টু। ২০১৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। এর আগেও দু’দফায় তিনি মেয়র ছিলেন।

এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পৌরবাসী আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শহরে ভয়াবহ যানজট। পর্যাপ্ত ড্রেনব্যবস্থা নেই। ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ের দুর্গন্ধে মানুষের ভোগান্তি চরমে।

শহরে বিনোদন কেন্দ্র, শিশুদের খেলার মাঠ নেই। গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়ক ও রাস্তার অবস্থা বেহাল। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তা নেই। অথচ এই পৌরসভা এলাকায় রয়েছে নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

পৌরসভার মধ্যেই অবস্থিত সরকারি মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতাল, ২৫০ শয্যার পাবনা জেনারেল হাসপাতাল, পাবনা টেক্সটাইল কলেজ, ঐতিহ্যবাহী সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, পাবনা সরকারি কলেজ ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট। আর শহরের অদূরে দাঁড়িয়ে আছে পাবনা ক্যাডেট কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

পাবনা নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক আবদুল মতিন খানের অভিযোগ, ‘ভায়াবহ যানজটে পৌরবাসী অতিষ্ঠ। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল। ড্রেনেজ ব্যবস্থা শোচনীয়। একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত, তার অধিকাংশই নেই।’

পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি প্রফেসর শিবজিত নাগ বলেন, ‘পাবনা একটি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী পৌরসভা। এখানে শিশুদের জন্য কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই। বড়দের বিনোদনসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কোনো হলরুম বা অডিটোরিয়াম নেই।’ তিনি বলেন, পুরনো ১৭ জেলার একটি হল পাবনা। অনেক আগেই এই পৌরসভাটি সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটাও হয়নি।’

সংস্কৃতিকর্মী ভাস্কর চৌধুরী বলেন, ‘পৌরসভার বিদ্যমান সমস্যাগুলোর জন্য দায়ী পৌর মেয়রের সঙ্গে অন্য জনপ্রতিনিধি তথা কাউন্সিলরদের সমন্বয়হীনতা। সবাই এক হয়ে কাজ করলে সমস্যাগুলোর সমাধান অনেক আগেই হয়ে যেত।’

এসব অভিযোগের জবাব দিতে যুগান্তরের মুখোমুখি হয়েছিলেন পৌর মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু; যিনি একসময় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে পৌরবাসীকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেইনি। বলেছিলাম পৌরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করব। নির্বাচনের পর পৌরবাসীর মতামত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে সফলতা যেমন আছে। আছে ব্যর্থতাও।’

তিনি বলেন, ‘পৌরসভায় পর্যাপ্ত সড়ক বাতির ব্যবস্থা করেছি। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। পৌরসভার নিজস্ব স্বাস্থ্য কর্মসূচি রয়েছে। গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের নানাভাবে সাহায্য করা হচ্ছে। পৌরবাসীর ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেইনি। পৌরসভাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পেরেছি। সেবা নিতে এসে পৌরবাসী হয়রানির শিকার হন না। চলমান ডেঙ্গু সমস্যা নিয়ে কাজ করছি। নাগরিকদের সচেতন করার জন্য সভা-সমাবেশ, লিফলেট, বিলবোর্ড প্রভৃতি উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পালন করছি।

প্রতি ওয়ার্ডে এডিস লার্ভা ধ্বংসসহ মশা নিধনের জন্য দুটি করে মেশিন দেয়া হয়েছে। এরপরও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। যানজট নিরসন করতে পারিনি। আবর্জনা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। বাজেটের অপ্রতুলতা, লোকবলের স্বল্পতা এবং সংশ্লিষ্ট মহলের সহযোগিতা না পাওয়ায় এ সমস্যা সমাধান করতে পারিনি। এছাড়া পৌরবাসীর সচেতনতার অভাবও রয়েছে। পৌরসভার ড্রেনের মধ্যে নাগরিকরা যাতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলেন, সে বিষয়ে তাদের সচেতনতা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা থাকবে না।’

যানজট প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘পৌরসভা থেকে প্রায় ৫ হাজার রিকশা ও অটো বাইকের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। কিন্তু চলাচল করছে ১০ হাজারের মতো। এর অর্ধেকই ইউনিয়ন বা শহরের বাইরে থেকে আসে। তাই সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা ছাড়া যানজট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। পাবনা শহরের প্রধান সড়কসহ অধিকাংশ রাস্তা ও গলি সরু। দিনে বাস-ট্রাকসহ ভারি যানবাহন শহরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকেই নিয়ম মানেন না। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘পৌরসভার কাঁচা-পাকা মিলে ২১৩ কিলোমিটার সড়ক বা রাস্তার মধ্যে ১৫৪ কিলোমিটারের অবস্থা খারাপ। ১৯১ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে ১৬০ কিলোমিটার ড্রেন পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা জরুরি। তহবিল সংকট ধাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এসব কাজ করা যাচ্ছে না।’

শিশুদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘একটি শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠা অতি জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনীয় ফান্ড ও জায়গা নেই।’

মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই- এসব সামাজিক অপরাধ দমন প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, এসব অপরাধ দমনে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ পৌরবাসীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।