ভারতীয় বিমানবন্দর হয়ে কার্গো পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ বেবিচকের

৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হুমকির মুখে পড়বে * বিমানের কার্গো পরিবহনে ধস নামবে, বিমানের আয় কমবে ৩৫০ কোটি টাকা

  মুজিব মাসুদ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতীয় এয়ারস্পেস (বিমানবন্দর) ব্যবহার করে বাংলাদেশি কার্গো বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটি বলছে, এ প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য। এর ফলে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের এভিয়েশন খাত।

জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের (এক লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা) পণ্য রফতানি হচ্ছে। এর বড় অংশই তৈরি পোশাক। এর মধ্যে বিমানে পরিবহন করা হচ্ছে ১৮-২০ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ অবস্থায় ভারতীয় এয়ারস্পেস ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশের জন্য আত্মঘাতী হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একটি সিন্ডিকেট বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত ধ্বংসের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। বিশেষ করে বিমানে পরিবহন করা পুরো ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকার পণ্য পরিবহন হুমকির মুখে পড়বে। সিন্ডিকেট এ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৯ জানুয়ারি উপসচিব ড. একেএম আতিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি রফতানি পণ্য ভারতের এয়ার কার্গো স্পেস ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেছে। জানা গেছে, গত ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারত সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে ভারতের বাণিজ্য সচিব মিজ রীতা তিওতিয়া এ বিষয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসুকে তার দেশের সরকারের অনাপত্তির কথা জানিয়ে দেন। তবে এটি কার্যকরে প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করতে বেশ কিছু সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি। কেননা বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে ঢাকার এ প্রস্তাবটি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে এখন বাণিজ্য সহযোগিতার অংশ হিসেবে চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারায় এ প্রস্তাবটি সুবিধাজনক সময়ে সংযোজনে দুই দেশই সম্মত।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এমজিএইচ গ্রুপের দেয়া এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ার বাংলাদেশ বিমানের কার্গো পরিবহনে ধস নামবে। একই সঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যাবে। বছরে ৩৫০ কোটি টাকার আয় কমে যাবে বিমানের। বেকার হয়ে পড়বে দুই হাজারের বেশি জনবল। একই সঙ্গে বেবিচকের আয়ও কমবে ২০ কোটি টাকার বেশি।

বেবিচক এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি চিঠি দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে বলা হয়, ভারতীয় এয়ারস্পেস ব্যবহার করে কার্গো পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এটা বাস্তবায়ন হলে গোটা দেশের এভিয়েশন খাতে ধস নামবে। চিঠিতে বলা হয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহত্তর রফতানি পণ্যের ‘এক্সিট গেট ওয়ে’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কার্গো ভিলেজে কার্গো ওয়্যার হাউস করা হয়েছে। এর আয়তন ১৩ হাজার স্কয়ার মিটারের বেশি। ধারণ ক্ষমতা দুই হাজার টনের বেশি। ভবিষ্যতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় নতুন কার্গো ভিলেজের আয়তন হবে ২০ হাজার বর্গফুট। আর ধারণ ক্ষমতা হবে পাঁচ হাজার টনের বেশি। কার্গো ওয়্যার হাউসের ভেতর একটি বিশেষ নিরাপত্তা জোন গড়ে তোলা হয়েছে। এর নাম আরএ-৩ (রেগুলেটেড এজেন্ট) এলাকা। আরএ-৩ এলাকাটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে নির্ধারিত নিরাপত্তা মানসম্মত। এর আয়তন দুই হাজার ৬০০ বর্গফুট। আরএ-৩’র মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সরাসরি পণ্য রফতানি করা হয়ে থাকে। কার্গো কমপ্লেক্সে এখন ইডিএস (এক্সপ্লোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম) ও ডুয়েল ভিউ স্ক্যানিং মেশিন বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ইটিডি (এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডেটেকশন) মেশিন, ডব্লিউটিএমডি (ওয়াক থ্রো মেটাল ডিটেকটর), ফ্লাপ বেরিয়ার, সিসিটিভি সংযোজন করা হয়েছে। এসব নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত আছেন আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬৬ জনের কর্মী বাহিনী। দ্বিতীয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসাবে সম্প্রতি কার্গো ভিলেজে প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড নামানো হয়েছে। প্রতিদিন ৫০ টন কার্গো পণ্য সেকেন্ডারি স্ক্রিনিং করে এই ডগ স্কোয়ার্ড। এসব কারণে সম্প্রতি ঢাকা-লন্ডন রুটে আকাশপথে সরাসরি কার্গো পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামাল বলেছেন, যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে বলে আশা করছি।

বেবিচকের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান কার্গো ভিলেজে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করছে। সেখানে ৭০০ জনবল কাজ করছে। সরকার সম্প্রতি গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের ওপর নতুন নীতিমালা তৈরি শুরু করেছে। এর ফলে রফতানি কার্গো ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিকায়ন হবে। বর্তমানে প্রতি মাসে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে ১৪ হাজার মেট্রিক টন তৈরি পোশাক, তিন হাজার ৬০০ মেট্রিক টন কৃষিজাত পণ্য রফতানি হচ্ছে। এসব পণ্যের প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেট্রিক টন বাংলাদেশ বিমান ও প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন অন্য এয়ারলাইন্স যোগে বিদেশে যাচ্ছে। শাহজালাল ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকেও কার্গো পণ্য যাচ্ছে বিদেশে। দিন দিন পণ্য পরিবহন বাড়ছে। এ অবস্থায় এমজিএইচ গ্রুপের এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সেটা হবে দেশের জন্য আত্মঘাতী। চিঠিতে বেবিচক কর্তৃপক্ষ এমজিএইচ গ্রুপের প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করার জন্য মতামত দিয়েছে। এমজেএইচ গ্রুপ তাদের প্রস্তাবে বলেছে, ঢাকা বিমানবন্দরের বিভিন্ন অনিয়ম, শিডিউল বিপর্যয় ও নানা চুরির কারণে শাহজালাল থেকে পণ্য রফতানি খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় কার্গো স্পেস না থাকায় শিডিউল অনুযায়ী পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। এতে অনেক শিডিউল বাতিল করতে হয় তাদের। সম্প্রতি এক মিলিয়ন ডলার পণ্যের অর্ডার বাতিল করতে হয়েছে যথাসময়ে ফ্লাইট না পাওয়ায়। ভারতীয় বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রয়োজনীয় কার্গো স্পেস খালি আছে। শুধু কলকাতা বিমানবন্দরে বর্তমানে গড়ে ৪০ শতাংশ কার্গো স্পেস খালি আছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter