চাঁদের দেশে চাঁদনী শ্রীদেবী

শোক জানিয়ে অভিনেতা অভিনেত্রীদের টুইট

  কৃষ্ণকুমার দাস, কলকাতা থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র ৫৪ বছর বয়সেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘রূপ কি রানী’ শ্রীদেবী চলে গেলেন। দুবাইয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে শনিবার রাত ভারতীয় সময় সাড়ে এগারোটা নাগাদ হার্টঅ্যাটাক হয় তার। দুবাইয়ে যে হোটেলে তিনি স্বামী বনি কাপুর ও কন্যা খুশির সঙ্গে ছিলেন সেখানেই অসুস্থ হন। সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের ডাক্তার ছুটে আসেন। পরে দুবাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দুবাইয়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নবদ্বীপ সুরি রোববার জানিয়েছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলেও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম মেনে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। রাতের বিমানে মুম্বাই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শ্রীদেবীর মরদেহ। জন্মসূত্রে শ্রীদেবী চেন্নাইয়ের বাসিন্দা হলেও সোমবার তার শেষকৃত্য হবে মুম্বাইয়ে।

মুম্বাইয়ে দুবাইয়ের বিমান থেকে নেমে এ খবর দেন শ্রীদেবীর দেবর সঞ্জয় কাপুর। তিনিও দুবাইয়ের ওই বিয়েতে গিয়েছিলেন। রাতের বিমান ধরে মুম্বাইয়ে ফিরে আসেন। বিমান থেকে নেমে মোবাইল খোলার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীদেবীর স্বামী বনি কাপুরের মেসেজ পান। মুহূর্তে শোকের ছায়া নেমে আসে ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে।

১৯৬৩ সালে জন্ম শ্রীদেবীর। মাত্র চার বছর বয়সে তামিল ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ১৩ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন জুলি ছবিতে। প্রথম ব্যবসায়িক সফল ছবি হিম্মতওয়ালা। সদমা, চালবাজ, মাওয়ালি, তোফা, গুমরাহ, লমহে, নাগিনা ও চাঁদনী ছবি সুপারহিট হয়েছে তার। তবে অন্যধারার ছবিতেও তিনি সমান সফল হয়েছেন। পাঁচবার ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন শ্রীদেবী। ভারত সরকার পদ্মশ্রী সম্মানও দিয়েছে তাকে। অভিনয়ের পাশাপাশি শাস্ত্রীয় নৃত্যেও সমান পারদর্শী ছিলেন প্রয়াত এই অভিনেত্রী। প্রায় ৩০০ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। এর মধ্যে হিন্দি ছাড়াও তামিল, কন্নড়, মারাঠী ছবিতেও তিনি দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্র, মিঠুন, শাহরুখ খানের সঙ্গেও তিনি অভিনয় করেছেন। প্রযোজক বনি কাপুরকে বিয়ে করে কিছুদিন অভিনয় থেকে দূরে সরে যান। দুই মেয়ে বড় হতেই তিনি ফের অভিনয়ে ফিরে আসেন। ২০১৭ সালে তিনি ‘মম’ নামের একটি ছবিতে শেষ অভিনয় করেন।

শ্রীদেবীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী নিজেও। রাষ্ট্রপতি তার টুইটার হ্যান্ডেলে লিখেছেন- ‘শ্রীদেবীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে স্তম্ভিত হয়েছেন। কোটি কোটি ভক্ত রেখে গিয়েছেন এই অভিনেত্রী। যার অভিনয় জীবনে ছিল অত্যন্ত দক্ষতার ছাপ।’ এছাড়াও বলিউড অভিনেত্রী সুম্মিতা সেন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, অনুশকা শর্মা, প্রীতি জিনতা, নেহা ধুপিয়া, জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ সবাই নিজেদের টুইটে যার যার মতো করেই শোক জানিয়েছেন। একইভাবে শোকস্তব্ধ হওয়ার কথা লিখেছেন সঙ্গীতশিল্পী আদনান সামি, এ আর রহমান। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অভিনেতা গোবিন্দা, সঙ্গীতশিল্পী কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অদিত নারায়ণ প্রমুখ। প্রীতি জিনতা তার টুইটে লিখেছেন- ‘আমার অল টাইম ফেবারিট শ্রীদেবী নেই শুনে আমি শকড। তার আত্মার শান্তি কামনা করি। তার পরিবার শক্তি পাক।’ অভিনেত্রী নেহা ধুপিয়ার ভাষায়, ‘শ্রীদেবী ম্যাম নেই। আমরা আমাদের সবচেয়ে সূক্ষ্ম অভিনেত্রীকে হারালাম। আমরা একজন আইকনকে এত তাড়াতাড়ি হারালাম’- টুইট করে এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ। সঙ্গীতশিল্পী আদনান সামির টুইট ছিল- ‘শেষ রাতে শ্রীদেবীর খবরটা শুনে আমি আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। অসাধারণ প্রতিভা। বেস্ট ইন পিস।’ অভিনেত্রী সুস্মিতা সেন জানিয়েছেন- আমি শুনলাম শ্রীদেবী ম্যাম চলে গেছেন। কান্না থামাতে পারছি না। একইভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী রাভিনা টেন্ডনও। তিনি জানান, শকিং একটা খবরে ঘুম ভাঙল। কেন এমন হল? এত তাড়াতাড়ি চলে গেল শ্রী! সঙ্গীতপরিচালক ও শিল্পী এআর রাহমানের টুইট ছিল এমন- আমি মর্মাহত। তার পরিবারের সবার প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। শোকবার্তায় অনুশকা শর্মা লিখেছেন, আমি শোকাহত। কী বলব, কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।

শোকস্তব্ধ কলকাতার টালিগঞ্জের চলচ্চিত্রপড়া। রোববার এমনিতেই সেখানে তেমন কোনো শুটিং হয় না। তবুও অতিরিক্ত চাপে যে কয়েকটি শুটিং চলছিল, শোকের কারণে সবকটিই ‘প্যাকআপ’। বাংলা চলচ্চিত্রের সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ, অঙ্কুশ, দেব কিংবা সুপার হিরোইন ঋতুপর্ণা সেন ছাড়াও অভিনেত্রী গার্গী রায় চৌধুরী, শ্রীলেখা, স্বস্তিকা, শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, পায়েল, মিমি- সবাই মর্মাহত, শোকে-বিয়োগে মুহ্যমান। চলচ্চিত্র নির্মাতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল, শ্রীজিত মুখোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী যে যার মতো করেই নিজেদের অফিসিয়াল পেজে কিংবা টুইটার পেজে শোক জানিয়েছেন রোববার।

শুধু চলচ্চিত্র অঙ্গনই নয়, সাহিত্য জগৎ থেকে রাজনীতিক, সবার চোখেই যেন শ্রীদেবী সত্যিই একটি স্বপ্নের দেবীর জায়গায় রয়েছেন। আশি-নব্বই দশকে সুপার-ডুপার হিট অভিনেত্রী এই প্রজন্মের কাছেও যে কতটা জনপ্রিয়, সেটা রোববার দিনজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘শ্রী-ঝড়’ দেখেই অনুমান।

দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ টুইটে লিখেছেন, আমার কোনো ভাষা নেই, বাকরুদ্ধ। হঠাৎ ঝড়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সুন্দরী ও মেধাবী অভিনেত্রীর মৃত্যু হল। অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত মনে করেন, ভারতের সেরা সুন্দরী অভিনেত্রী ছিলেন শ্রীদেবী। তার এমন করে অসময়ে চলে যাওয়া শুধু ভারতীয় সিনেমাই নয়, অভিনয়শিল্পের বড় ক্ষতি হল। শোক প্রকাশ করেছেন সাবেক ক্রিকেটার ও জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক সৌরভ গাঙ্গুলীও। তার টুইটে লিখেছেন, কয়েক মাস আগেই আমার শো’তে দেখা হয়েছিল। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। শ্রীদেবীজির খবরটা শুনে শকড।

গার্গী রায় চৌধুরী বলেছেন, ‘শ্রীদেবীর চোখে এক অদ্ভুত চমক ছিল। শুনেছিলাম কোনো শট দেয়ার আগে নাকি তিনি চোখ বন্ধ করে থাকতেন। শট শুরু হলেই চোখ খুলতেন। আর তখনই এক অসম্ভব চমক ঔজ্জ্বল্য ছিটকে বের হয়ে আসত তার চোখ থেকে।’ শ্রীলেখা মিত্রের ভাষায়, ‘দারুণ একজন অভিনেত্রী ছিলেন। আসলে ছিলেন বলতে ইচ্ছা করছে না। খুব ভালোবাসি তাকে। আমি বিশ্বাসই করব না কোনো দিন শ্রীদেবী নেই। মানবই না শ্রীদেবী প্রয়াত। আমাদের কাছে উনি যেমনটি ছিলেন, তেমনই থাকবেন।’ পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, ‘একজন বড়মাপের তারকা হওয়ার পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত দক্ষ অভিনেত্রী। আর সেটাই ছিল তার হাতিয়ার। মর্মান্তিক, অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা ঘটে গেল। তার প্রয়াণে সিনেমা জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।’ জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী ইন্দ্রানী হালদারের কথায়, ‘মুম্বাইয়ে অনেকবারই তাকে সামনে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। অত্যন্ত সাদামাটাভাবেই থাকতেন। সহজসরল মনের একজন মানুষ ছিলেন। অথচ কত বড়মাপের অভিনেত্রী তিনি।’

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.