আসন ধরে রাখতে চায় আ’লীগ পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

প্রার্থী নিয়ে স্বস্তিতে জাতীয় পার্টি

  আরিফ উল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জ, শেখ সাইদুর রহমান টুটুল, লৌহজং ও ব.ম শামীম, টঙ্গীবাড়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার ২৩টি ইউনিয়ন নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে বইছে ভোটের হাওয়া। নানামুখী চাপে বিএনপি প্রচারে কিছুুটা পিছিয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগে কিছুটা কোন্দল থাকলেও ভোটের মাঠ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণার মুখর। আসনটি মূলত বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও ২০০১ সালের ভোটে আসন দখলে নেন আওয়ামী লীগের সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। এর পর ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনেও জয়ী হন এমিলি। একাদশ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী। এর আগে ১৯৯৬ সালে

মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের এমপি হওয়ার পর বিএনপির দুর্গে হানা দেন এমিলি। তার নেতৃত্বে সাংগঠনিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে আওয়ামী লীগ। মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের অবস্থান এখন অনেক মজবুত। আগামী নির্বাচনে শাসক দলের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ আসনে বিশেষ করে নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের প্রথম ভোটে বিজয়ী হন সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা। ১৯৯৬ সালের ভোটে বিজয়ী হন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা। আগামী নির্বাচনে তার দলীয় মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত বলে সূত্রের দাবি। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে কিছুটা পিছিয়ে থাকা বিএনপি আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসন পুনরুদ্ধার করতে চায়। নানামুখী চাপে পড়ে বিএনপির অনেক নেতা দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তবে ফুরফুরে মেজাজে থাকা আওয়ামী লীগ আসন ধরে রাখতে মাঠে সক্রিয় প্রবলভাবে।

আওয়ামী লীগের ওই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী ছাড়াও অন্য যারা মাঠে রয়েছেন তারা হলেন- জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন, আরেক নারী নেত্রী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা, টঙ্গীবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ, লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ শিকদার। এদিকে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সিনহা ছাড়া অন্য প্রার্থীরা হচ্ছেন- বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলামের বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম বাবু, জেলা বিএনপির সহসভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপন। জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি মো. কুতুব উদ্দিন আহমেদ, কেন্দ্রীয় নেতা নোমান মিয়া ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল হোসেনও দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

সূত্র বলছে, দীর্ঘ ২১ বছরে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির নেতৃত্বে দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্বে আনা হয়েছে দলের নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীদের। এলাকায় বিএনপিকে দাঁড়াতে না দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। দলীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন বিএনপি নেতারা। এদিকে জাতীয় পার্টি তাদের ক্লিন ইমেজ নিয়ে এগোচ্ছে ধীরে। বিরোধী দল হিসেবে এলাকায় কোনো টানাপোড়েন নেই।

নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় বিএনপির মিজানুর রহমান সিনহার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, ভোট নিয়ে এখনও ভাবিনি। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে এবং বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সে ক্ষেত্রে দল আমাকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করছি, এলাকায় কিছু করতে চাই। জনপ্রতিনিধি হলে এলাকার কাজ করা সহজ। দলের কাছে মনোনয়ন চাইব, দিলে নির্বাচন করব, এ ছাড়া যাকে মনোনয়ন দেবে তার জন্য নিরলসভাবে কাজ করব।

ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম বাবু স্থানীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে না পারলেও বিএনপির বুদ্ধিজীবী হিসেবে চেয়ারপারসনের গুডবুকে আছেন। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স, ব্রাজিলের অনারারি কনসুলার, বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন জি-৯-এর সাবেক সভাপতি ছিলেন। আলাপকালে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার পিতা শামসুল ইসলামের সব নির্বাচন আমিই পরিচালনা করেছি এবং দীঘিরপাড় ও বেতকা স্কুলের উন্নয়নের সঙ্গে থাকাসহ অনেক ভালো কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় এলাকার নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা চায় আমি নির্বাচন করি। আমার পিতা মুন্সীগঞ্জ-২ ও ৩ আসনে নির্বাচন করেছেন। দল যে আসনে মনোনয়ন দেবে সেখানেই নির্বাচন করতে প্রস্তুত। কথা হয় আলী আজগর মল্লিক রিপনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইব। না পেলে স্বতন্ত্র হিসেবেও লড়ব।’

আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এলাকায় আসছেন ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। তাছাড়া দান অনুদান করছেন তিনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সেভাবে কাছে টানতে না পারলেও ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, এলাকার মানুষের সেবা করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। তাই আগামী নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চাইব। দলের সভানেত্রী মনোনয়ন দিলে জনগণের সেবা করে যাব। ভোটের মাঠে পিছিয়ে নেই একসময়ের আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনিও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। প্রবীণ এ রাজনীতিক স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এলাকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির হাল ধরে রেখেছেন। এদিকে নারী নেত্রী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা ও লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ শিকদার হঠাৎ প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নড়েচড়ে বসেন। কর্মীদের জন্য দুই হাতে খরচ করছেন আবদুর রশিদ শিকদার। আবদুর রশিদ বলেন, দল এ আসনে নতুন নেতৃত্ব চাইছে। দলের প্রতি আমার যে অবদান তাতে আগামী নির্বাচনে মনোনয়নের দাবি করতেই পারি। অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা আগে থেকেই নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। দৃষ্টি আকর্ষণে তিনি নারীদের নিয়ে উঠোন বৈঠকসহ নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। পারিবারিক ঐতিহ্যে ও নিরলস পরিশ্রমের কারণে স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন এরই মধ্যে। টঙ্গীবাড়ী উপজেলা পরিষদের দুইবারের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদও মাঠে সক্রিয়। দলের অনেকেই মনোনয়ন চাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোন্দল নিরসন করা সম্ভব না হলে আসনটি ধরে রাখা কঠিন।

জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমান মিয়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান। ছাত্র রাজনীতি থেকেই স্বচ্ছতার সঙ্গে দলে তিনি তার ইমেজ ধরে রাখতে পেরেছেন। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও লৌহজং উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি নোমান নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নোমান মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এরশাদের মুক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ছাত্রসমাজের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করি। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা। তার উন্নয়নের ধারা ফিরিয়ে আনতে নির্বাচন করতে চাই। গত নির্বাচনে দল মনোনয়ন পেয়েছিলাম। এবার মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। অপরদিকে কুতুব উদ্দিন আহমেদ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি থাকার সুবাধে প্রতিনিয়ত দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও জেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন দলীয় কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করতে। কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫০ বছর ধরে সততার সঙ্গে রাজনীতি করছি। আগামী দিনে ইসলামী মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষে এবার মাঠে নেমেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ লৌহজং শাখার সভাপতি হাফেজ মাওলানা মুনসুর আহাম্মাদ মুসা। তিনি অনেকটা আশাবাদী এবং দলীয় মনোনয়ন পেতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। ওয়াজ মাহফিল এবং সভা-সমাবেশ করে নিজের প্রার্থিতা অনেকটা জানান দিচ্ছেন এ নেতা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter