জাতীয় পার্টির দুর্গের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে

  মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৩:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় পার্টি। গ্রাফিক্স: যুগান্তর অনলাইন
জাতীয় পার্টি। গ্রাফিক্স: যুগান্তর অনলাইন

প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির দুর্গ রংপুরের নিয়ন্ত্রণে ফাটল ধরেছে। বিরোধীদলীয় নেতা আর পার্টির চেয়ারম্যান পদ নিয়ে রশি টানাটানিতে এখানকার নেতাকর্মীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন।

এরই মধ্যে কেউ রওশনপন্থী আবার কেউ জিএম কাদেরপন্থীর তকমাও পেয়েছেন। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে- জাতীয় পার্টির দুর্গ রংপুরের নিয়ন্ত্রণ এখন কার হাতে।

জাতীয় পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ দলীয় সংসদ সদস্য পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ঘোষণার জন্য বুধবার জাতীয় সংসদের স্পিকারকে চিঠি দেন। এরপর জাতীয় পার্টির একাংশের নেতারা বৃহস্পতিবার পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। এতে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এ নিয়ে দলটির ভেতরে শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রওশনপন্থীদের প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন রংপুরের শীর্ষ নেতাদের একাংশ। আর অন্য একটি অংশ শূন্য হওয়া রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপনির্বাচনকে মাথায় রেখে ‘কিছু সময়ের জন্য’ রওশনকে দলের চেয়ারম্যান মানতে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে।

এছাড়া অপর একটি অংশ কারও পক্ষে-বিপক্ষে নেই জানিয়ে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

জিএম কাদেরের পক্ষের নেতারা রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান মানতে নারাজ। তারা বলছেন, যারা রওশনকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়েছেন, তারা দলের ‘ভুঁইফোড়’ নেতা। রংপুরে রওশনপন্থীদের প্রতিহতেরও ঘোষণা দেন জিএম কাদেরপন্থীরা।

তারা আরও জানান, এপ্রিলে অসুস্থ থাকা অবস্থায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। ১৪ জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার মৃত্যুর ৪ দিন পর ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙা।

এরপর ২৩ জুলাই জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে অস্বীকার করে বিবৃতি দেন রওশন এরশাদসহ দলের সাত সংসদ সদস্য ও দু’জন প্রেসিডিয়াম সদস্য।

এ নিয়ে রংপুর জাতীয় পার্টির নেতারা বলেন, জীবিত অবস্থায় এরশাদই তার ভাই জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান বলে ঘোষণা দিয়ে গেছেন। এ অবস্থায় রওশনকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা এরশাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান কে হবেন, এটা তো এরশাদ ঘোষণা দিয়ে গেছেন। আমরা জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান মানি; রওশন এরশাদকে মানি না। রংপুর অঞ্চলের নেতাকর্মীরা জিএম কাদেরের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রাখেন। এখানে রওশন এরশাদের কোনো আদেশ-নির্দেশ মানা হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণাকারী ভুঁইফোড় নেতারা রংপুরে এলে তাদের প্রতিহত ও প্রতিরোধ করা হবে।’

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াসির বলেন, যারা রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন, তারা দলের গঠনতন্ত্রবিরোধী কথা বলেছেন। রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা দেয়া ঠিক হয়নি।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও রংপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক এসএম ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমরা রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত মানি না। আমরা এরশাদের নির্দেশনা অনুযায়ী জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান মানি। রওশনের কথায় নয়, এরশাদের ভাই জিএম কাদেরের কথায় দল চলবে।’ তিনি দাবি করেন, ‘রংপুরসহ পুরো বিভাগে রওশন এরশাদের পক্ষে একজন নেতাকর্মীও খুঁজে পাওয়া যাবে না; সবাই জিএম কাদেরের পক্ষে।’

এদিকে জিএম কাদের বা রওশনের পক্ষে-বিপক্ষে নেই জানিয়ে রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় যুব সংহতির জেলা সভাপতি হাজী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি রংপুর সদর আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী। আমরা দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা একেবারেই সহ্য করব না।’

শুধু আবদুর রাজ্জাক নন, তার মতো আরও অনেকেই আছেন; যারা পক্ষ বা বিপক্ষে যেতে রাজি নন, বরং তারা দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা চান না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের চেয়ারম্যানের বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী নিয়েও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে জাতীয় পার্টিতে। জিএম কাদেরপন্থীরা চান, এরশাদের পরিবার বা স্থানীয় নেতাদের মধ্য থেকে কেউ নির্বাচন করুক। আর রওশনপন্থীরা চান, এ আসনে এরশাদপুত্র রাহগির আল মাহির সাদ এরশাদ নির্বাচন করুক।

রংপুরের রওশনপন্থীরা জানান, জিএম কাদের তো বেশ কিছুদিন ধরেই দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এখন এ দায়িত্ব রওশন এরশাদ কিছুদিন পালন করতেই পারেন। এতে একদিকে দলের বিশৃঙ্খলা দূর হবে। আবার চেয়ারম্যান হিসেবে কে বেশি যোগ্য তাও প্রমাণ হবে।

রংপুরের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, রওশন এরশাদ তার ছেলে সাদকে প্রার্থী করতে অনেকদিন ধরে তাদের চাপ দিয়ে আসছেন। অন্যদিকে এরশাদের ভ্রাতুষ্পুত্র সাবেক সংসদ সদস্য আসিফ শাহারিয়ার, ভাগ্নি টুম্পা ও এরশাদের আমেরিকা প্রবাসী ভাই মোর্শেদ মনোনয়ন চাইছেন। এ অবস্থায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা আসনটিতে দলের ত্যাগী কোনো নেতাকে দেখতে চান, সাদ এরশাদকে প্রার্থী করার ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই।

রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণার বিষয়ে এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমি নিজেও রংপুর সদর আসনের উপনির্বাচনে একজন প্রার্থী। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাব।’

রওশন এরশাদবিরোধী ঝাড়ু মিছিল :

রংপুর মহানগর জাতীয় মহিলা পার্টি শুক্রবার রওশন এরশাদবিরোধী ঝাড়ু মিছিল করেছে। পার্টির রংপুর শহীদ মোবারক সরণি কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিলটি বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।

মিছিলে রওশন এরশাদবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হয়। এর আগে পার্টি কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন, রংপুর মহানগর মহিলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক জেসমিন আক্তার, সদস্য সচিব জোৎসনা বেগম, যুগ্ম আহ্বায়ক হালিমা বেগম, সদস্য সুলতানা প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঘোষিত বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। পার্টির ভেতরে কোন্দল ও বিশৃঙ্খলা থাকলে তা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে শুধরে নেয়া প্রয়োজন।

এগুলো বাইরে প্রকাশ পেলে তৃতীয় পক্ষ ফায়দা লুটবে। যারা দলের ভেতরে থেকে এসব করছেন তাদের চিহ্নিত ও শাস্তি দাবি করে এদের ইন্ধনদাতা হিসেবে রওশন এরশাদ ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে বহিষ্কারেরও দাবি জানান বক্তারা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×