হোসনি দালানে গ্রেনেড হামলা: চার বছরেও শেষ হয়নি বিচার

৪৬ সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ * তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় সাক্ষ্যগ্রহণে স্থবিরতা

  হাসিব বিন শহিদ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হোসনি দালানে গ্রেনেড হামলা
হোসনি দালানে গ্রেনেড হামলা। ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে পুরান ঢাকার হোসনি দালানে গ্রেনেড হামলার চার বছর পার হলেও এর বিচার কাজ আজও শেষ হয়নি।

২০১৭ সালের মে মাসে ১০ জঙ্গির বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। এরপর প্রায় আড়াই বছর কেটেছে। কিন্তু সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়নি। সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বদলি হওয়ার পর বিচার কাজে গতি ফিরেছিল। তবে তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় বর্তমানে বিচার কাজে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে।

নাবালক আসামিকে সাবালক সাজিয়ে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করায় সাক্ষ্যগ্রহণে চলে এসেছে স্থবিরতা। মোট ৪৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এ মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মামলাটি গত বছরের এপ্রিল মাসে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য বদলি হয়ে আসে।

এখানে ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এর আগে একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ কালে কারাগারে থাকা আসামি জাহিদ হাসান ওরফে রানার আইনজীবী দাবি করেন, চার্জশিট দাখিলের সময় রানার বয়স ছিল ১৭ বছর। সে অনুসারে রানার বিচার হবে শিশু আদালতে।

এ বিষয়ে শুনানি নিয়ে ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেছেন। এরপর আরেক আসামিকেও নাবালক দাবি করেছেন তার আইনজীবী।

সে বিষয়েও ট্রাইব্যুনাল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সোমবার তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আইনি এ জটিলতা কেটে গেলে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম ফের গতিশীল হবে।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় চার্জশিটে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। নাবালক আসামিকে সাবালক সাজিয়ে তিনি আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন। মূলত এ কারণেই সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম এগোচ্ছে না।

এ আইনি জটিলতায় গত এক বছরে কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। বিনা বিচারে আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া অদ্যাবধি যেসব সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে- তা অভিযোগ প্রমাণের মতো যথেষ্ট নয়।’

বিচারের অগ্রগতি যতটুকু : ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর রাত পৌনে ২টার দিকে তাজিয়া মিছিলে জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। এতে দু’জন নিহত ও শতাধিক আহত হন। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করে।

এ ঘটনায় রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে ডিবি দক্ষিণের পুলিশ পরিদর্শক মো. শফিউদ্দিন শেখ ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ১০ জঙ্গিকে আসামি করে চার্জশিট অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠান। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা ওই বছরের অক্টোবরে বিচারিক আদালতে আসে।

২০১৭ সালের ৩১ মে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করে মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি করেন। ওই আদালতে বেশ কয়েকটি ধার্য তারিখে একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।

এরপর মামলাটি গত বছরের এপ্রিল মাসে ওই আদালত থেকে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য বদলি হয়ে যায়। এরপর ১০ জুন চারজনের, ১৫ জুলাই দু’জনের, ১২ আগস্ট দু’জনের, ১১ অক্টোবর একজনের ও ২২ সেপ্টেম্বর একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।

আসামিরা কে কোথায় : তাজিয়া মিছিলে হামলায় ১৩ জঙ্গি জড়িত ছিল। এদের মধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযানের সময় তিন জঙ্গি ক্রসফায়ারে মারা যায়। চার্জশিটভুক্ত আসামির সবাই জেএমবির সদস্য।

তারা হল- জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মোসায়েব, আরমান, কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক, রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব, মাসুদ রানা, আবু সাঈদ সোলায়মান ওরফে সালমান, হাফেজ আহসান উল্লাহ মাহমুদ, শাহজালাল, ওমর ফারুক ওরফে মানিক ও চান মিয়া।

আসামিদের মধ্যে প্রথম ছয়জন কারাগারে ও পরের চারজন জামিনে আছেন। এছাড়া আসামিদের মধ্যে প্রথম তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী শাহাদাৎ ওরফে আলবানি ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর গাবতলীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

পরের বছর ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় অপর দুই জেএমবি কমান্ডার আবদুল বাকি ওরফে আলাউদ্দির ওরফে নোমান ও সাঈদ ওরফে হিরণ ওরফে কামাল।

জবানবন্দিতে আসামিরা যা বলেছে : দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিন আসামি জানায়, প্রথমে তাদের মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পের শিয়াদের ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরে হোসনি দালানে হামলার পরিকল্পনা করে কামরাঙ্গীরচরে বাসা ভাড়া নেয় তারা।

হামলার দৃশ্য ভিডিও করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু আলোকস্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। হোসনি দালানের কবরস্থান থেকে হোজ্জা (বন্দুকযুদ্ধে নিহত) পাঁচটি হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে মারে।

এ সময় তার সঙ্গে ছিল কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক। সে জেএমবির আত্মঘাতী হামলাকারী দলের সদস্য। তবে চার্জ (অভিযোগ) গঠনের সময় সব আসামিই আদালতের কাছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×