দ্বন্দ্ব-কোন্দল হতাশায় নিষ্প্রাণ জাবি ছাত্রলীগ

২১৪ সদস্যের কমিটির অর্ধেকের বেশি ক্যাম্পাসে নেই * সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাস ছেড়েছেন, মুঠোফোনও বন্ধ * ২০ মাসের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ, নতুন কমিটির দাবি জ্যেষ্ঠ নেতাদের

  রাহুল এম ইউসুফ, জাবি ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি

অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ভাগবাটোয়ারার দ্বন্দ্বের সঙ্গে সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তায় নিষ্প্রাণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রলীগ। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, সিনিয়র নেতাদের চাকরিতে প্রবেশ আর ‘মাইনাস ফর্মুলায়’ নেতৃত্ব সংকট প্রকট।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের ‘আউট অফ নেটওয়ার্ক’ এ সংকটকে আরও প্রকট করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেগা প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগে সংগঠনের ভাবমূর্তিই এখন প্রশ্নের মুখে। কয়েকজন শীর্ষ নেতা এ অবস্থায় কমিটি ভেঙে দেয়ার পক্ষে।

সূত্র জানায়, জাবি শাখা ছাত্রলীগ এখন তিন ভাগে বিভক্ত। শক্তিশালী গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন সভাপতি জুয়েল রানা।

দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ রাসেলের অনুসারী সহসভাপতি নিয়ামুল হাসান তাজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম মোল্লার গ্রুপ। তৃতীয় অবস্থানে আছে সাধারণ সম্পাদক এসএম সুফিয়ান চঞ্চলের গ্রুপ।

চঞ্চলের অনুসারী একাধিক নেতা হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, চঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তিনি মুঠোফোন বন্ধ করে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। ছাত্রলীগের একটি সূত্র বলছে, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আগস্টের শেষ সপ্তাহে ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজ জেলা দিনাজপুরে চলে গেছেন।

তার অনুসারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এভাবে ‘আত্মগোপনে’ যাওয়া তার জন্য নতুন কিছু না। এবার একবারেই বিচ্ছিন্ন। একটি সূত্রের দাবি, ক্যাম্পাসে নিগৃহীত হওয়ার ভয় আছে তার।

দুর্বল নেতৃত্বের কারণে সাধারণ সম্পাদক অনুসারীরা সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। গত শনিবার তারই অনুসারী শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অভিষেক মণ্ডল এক নাট্যকর্মীকে মারধর করলে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।

এমন তুচ্ছ ঘটনায় থানার মামলা করার নজির বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রথম। তারই অনুসারী শহীদ রফিক-জব্বার হলের সভাপতি পদপ্রার্থী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী নিলয়কে নাটকীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বছরের জন্য বহিষ্কার করেছে।

এছাড়া এই গ্রুপের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক নিলাদ্রী শেখর মজুমদার জুনিয়র নেতাকর্মীদের হাতে মার খাওয়ার এক বছর পার হলেও এর কোনো বিচার হয়নি। এছাড়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ঈদুল আজহার আগে সেলামির মোটা অংকের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির অনেক পদধারী নেতা চাকরিতে যোগদান করেছেন। ২১৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনেক নেতাই এখন নিষ্ক্রিয়। এর মধ্যে শাখা ছাত্রলীগের প্রায় ৫০ জন নেতা ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। ছাত্রত্ব নেই ৬৮ জনের।

এদের মধ্যে সহসভাপতি ১৩ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ৬ জন ও ৩ জন সাংগঠনিক সম্পাদক। একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ৩ জন সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ১০ জন বিয়ে করেছেন। ফলে শোকের মাস আগস্টের বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিতি ছিল অনেক কম।

সাংগঠনিক কাজে স্থবিরতার বড় নজির ধরা পড়েছে গত বৃহস্পতিবারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাসে না থাকায় সভাপতিও তাতে সই করেননি। আবার দফতর সম্পাদক চাকরিতে যোগদান করায় সেখানে স্বাক্ষর করেছেন উপ-দফতর সম্পাদক।

জাবি ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই নয়, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সঙ্গেও রয়েছে শীর্ষ নেতাদের বৈরী সম্পর্ক। গত মে মাসে মেগা প্রকল্পের টেন্ডার নিয়েই মূলত শাখা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্পর্কে চিড় ধরে। শুরু থেকেই জাবি শাখা সভাপতি জুয়েল রানা কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদককে অনুসরণ করতেন।

উত্তরবঙ্গে বাড়ি হওয়ায় সাধারণ সম্পাদক চঞ্চলের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল কেন্দ্রীয় সভাপতির। কিন্তু চঞ্চলকে ফোনে না পাওয়া ও তার সাংগঠনিক অদক্ষতার কারণে কেন্দ্রীয় সভাপতির বলয় থেকে ছিটকে পড়ে চঞ্চল।

অপরদিকে নানা ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে জুয়েলের মতানৈক্য দেখা দেয়ায় জুয়েল কেন্দ্রীয় সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। গত ঈদের আগে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে চঞ্চলের বিদ্রোহী গ্রুপটি।

গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক নিলাদ্রী শেখর মজুমদার বলেছেন, এখন নতুন কমিটি করাই মঙ্গলজনক। সহসভাপতি হামজা রহমান অন্তর যুগান্তরকে বলেন, ‘কমিটির মেয়াদ এক বছর আট মাস আগেই শেষ হয়েছে।

নতুন নেতৃত্বের অভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। ১৬টি হলের একটিতেও কমিটি দিতে পারেনি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে সমন্বয়হীনতায় পরিস্থিতি খুবই হতাশাজনক।’

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, অবশ্যই সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। সাধারণ সম্পাদক তো ক্যাম্পাসেই থাকেন না। নতুন কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছি।’ মুঠোফোন বন্ধ থাকায় সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতার অভিযোগ নাকচ করে শাখা সভাপতি জুয়েল রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি ছাড়াও আমরা অতিরিক্ত কর্মসূচি পালন করে আসছি। পারিবারিক কারণে অনেক নেতা চাকরিতে যোগদান করেছেন।

সাধারণ সম্পাদকের মা অসুস্থ থাকায় তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। কিন্তু তাতে সংগঠনের আহামরি ক্ষতি হচ্ছে না। আমরা সিনিয়ররা চালিয়ে যাচ্ছি। কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ ও নতুন কমিটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যে কেউ যে কোনো সময় নতুন কমিটি চাইতেই পারেন।

তবে কমিটি গঠন কেন্দ্রের এখতিয়ারাধীন। তাই কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত নেবে আমরা সেটিকেই স্বাগত জানাব।’ এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×