কোটি টাকার চাঁদা ভাগাভাগি

টালমাটাল জাবিতে সংঘর্ষের আশঙ্কা

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক আজ * ভিসির বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি

  রাহুল এম ইউসুফ, জাবি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

টালমাটাল জাবিতে সংঘর্ষের আশঙ্কা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের মধ্যে ঈদ সেলামির এক কোটি টাকা ভাগাভাগি কেন্দ্র করে টালমাটাল ক্যাম্পাস। দুর্নীতির কারণে ইমেজ সংকটে ছাত্রলীগ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

দুর্নীতির পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিভেদ তৈরি হয়েছে শাখা ছাত্রলীগে। এ পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রক্টর।

অপরদিকে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সমসাময়িক ইস্যুতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠা জাবি ভিসির পদত্যাগের দাবির বিষয়টিকে সরকার কীভাবে দেখছে-জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ কী কারণে, নৈতিক স্খলন, সেটা যদি তদন্ত করে প্রমাণ হয়, তিনিও কোনো আইনের ঊর্ধ্বে নন।

তিনি যদি কোনো অন্যায় করেন, এখানে যদি তার কোনো অপকর্মের সংশ্লিষ্টতা থাকে, তদন্তে যদি এটা প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আনীত এই দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মঞ্চের নেতারা। তদন্ত চলাকালীন সময়ে ভিসিকে অব্যাহতি নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

ছাত্রলীগের দাবি ঈদের আগে শাখা ছাত্রলীগকে এক কোটি ‘ঈদ সেলামি’ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাখা ছাত্রলীগের তিনটি গ্রুপের মধ্যে এই টাকা বণ্টন করা হয়েছে। সভাপতি মো. জুয়েল রানা পেয়েছে ৫০ লাখ, সাধারণ সম্পাদক এসএম আবু সুফিয়ান চঞ্চল পেয়েছে ২৫ লাখ এবং চঞ্চলের বিদ্রোহী গ্রুপ বলে পরিচিত সহসভাপতি নিয়ামুল হাসান তাজ ও যুগ্ম সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের গ্রুপ পেয়েছে ২৫ লাখ। এর আগে ছাত্রলীগ নেতা তাজ ও সাদ্দাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ঈদের আগে ১০ আগস্ট পাওয়া এই ‘ঈদ সেলামি’র টাকা সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভাগ করে দেয়া হয়। এর মধ্যে ৮টি হল ও দুই নেত্রীর মধ্যে ভাগাভাগি করেন শীর্ষ নেতারা। শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সভাপতি মো. জুয়েল রানা ৬টি হলে ৩ লাখ করে টাকা দেয়। দুই নেত্রীর ৩০ হাজার করে এবং কিছু টাকা সাবেক নেতাদের দেন।

একটি সূত্র বলছে অবশিষ্ট ২৭ লাখ টাকা জুয়েল নিজে রেখেছেন। তবে সভাপতি জুয়েল রানা বলেছেন তিনি সেলামির টাকা নেননি। অন্যদিকে নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা পেয়েছেন তারা দাবি করেন জুয়েল তাদের টাকা দিয়েছেন।

সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল শহীদ রফিক-জব্বার হল, আল বেরুনী হল, মীর মশাররফ হোসেন হল, শহীদ সালাম বরকত হল এবং দুই নেত্রীকে ৩০ হাজার টাকাসহ মোট আড়াই লাখ টাকা দিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এছাড়া শোকাবহ আগস্টের হলভিত্তিক কর্মসূচিতে তিনটি হলের প্রতিটিতে ২০-৩০ হাজার করে টাকা দেয়। এছাড়া বাকি টাকা নিয়ে আগস্টের শেষ সপ্তাহে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন চঞ্চল। শিক্ষকদের একটি সূত্র জানায়, চঞ্চল বাকি টাকা থেকে ১৪ লাখ টাকার দেনা পরিশোধ করেছে। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এক্ষেত্রের বিভিন্ন হলের নেতাকর্মীরা দাবি করেন তারা টাকা পেয়েছেন।

অপরদিকে তাজ, সাদ্দামের ২৫ লাখ টাকা থেকে তারা দুই জন ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম মোল্লা ৩ লাখ করে ৯ লাখ টাকা নেন। বঙ্গবঙ্গু, ভাসানী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ৩ লাখ করে দেয়। আর বাকি টাকা তারা বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও সাবেক নেতাদের মধ্যে ভাগ করে দেন বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তিনটি গ্রুপের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের নেতা-কর্মীরা বঞ্চিত হওয়ায় এ নিয়ে মিডিয়ার সামনে সবাই মুখ খুলতে থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন রূপ নেয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শাখা ছাত্রলীগের যোগসাজশে এই দুর্নীতি হয়েছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে তাজ ও সাদ্দাম। তবে শাখা সভাপতি মো. জুয়েল রানা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করছে।

আর সাধারণ সম্পাদক রয়েছেন ‘আউট অফ নেটওয়ার্ক’ বা গোটা ক্যাম্পাসের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

এদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং ছাত্রলীগ নেতাদের স্বীকারোক্তিতে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি বা ‘ঈদ সেলামি’র টাকা পাওয়া না পাওয়ার বিষয় ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে মুখোমুখি অবস্থান করছে শাখা ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ। ফলে যে কোনো মুহূর্তে সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছেন ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা।

প্রশাসনের একটি বিশ্বস্ত সূত্র যুগান্তরকে মঙ্গলবার বিকালে নিশ্চিত করে যে, রোববার ও সোমবার রাত থেকেই ক্যাম্পাসে ‘অবৈধ সামগ্রী’ আনা হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার রাতে ভাসানী হলে একটি আনা হয়। এছাড়া সাবেক নেতা একই রাতে ক্যাম্পাসে হালকা বস্তু রেখে গেছে। অপর একটি তথ্য বলছে ক্যাম্পাসে আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে ৪টি, শহীদ সালাম বরকত হলে ৪টি, শহীদ রফিক-জব্বার হলে ৩টি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ২টি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে অন্তত ১৩টি, মীর মশাররফ হোসেন হলে ১টি এবং আল বেরুনী হলে ১টি হালকা ও মাঝারি ‘সামগ্রী’ আছে। এগুলো অধিকাংশ সময় ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে। কিন্তু গত দুই রাতে এসব ‘সামগ্রী’ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য একটি গ্রুপ আবাসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ছাত্রলীগের জুনিয়ার নেতাকর্মীরাসহ নবীন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। সোমবার ও মঙ্গলবার দুপুরে তারা এই মহড়া দেয়।

তবে মঙ্গলবার নবীন শিক্ষার্থীদের ব্যাচ ডে হিসেবে ঢোল-তবলা, বাঁশি বাজিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেছে। এমন অনুষ্ঠান ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও নির্বিকার ছিল প্রশাসন। এ বিষয়ে হলটির প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল্লাহ হেল কাফি বলেন, আমি জানাতে পেরে তাদের হলে ফিরিয়ে দিয়েছি। তবে হলের বাহিরের বিষয় প্রক্টরের দেখাশোনা করার কথা।’

শাখা ছাত্রলীগের এক সম্পাদক যুগান্তরকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘আগামী ২২ তারিখ থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে। ভর্তি পরীক্ষা শুরুর দু’এক দিনের মধ্যেই সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন খাবারের স্টল (দোকান) বরাদ্দের চাঁদা ভাগাভাগি নিয়ে এ সংঘর্ষ বাধতে পারে।’

শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘একটি পক্ষ ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তারা চাচ্ছে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াই। কিন্তু আমরা তাদের মতলব বুঝতে পেরে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, যারা ক্যাম্পাস নিয়ে চক্রান্ত করে তাদের পরিণতি ভালো হয় না।

ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান যুগান্তরকে বলেন, আমরাও এমনটি শুনেছি। ইতিমধ্যে সে অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসে যদি কেউ অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায় তবে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ তিনি আরও বলেন, যে কোনো সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে হলে অভিযান চালানো হতে পারে।

এদিকে ভিসির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন দেয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন ‘শিক্ষক মঞ্চ’। এ ঘটনার দ্রুত তদন্ত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাময়িকভাবে ভিসির অব্যাহতিও চেয়েছেন শিক্ষক নেতারা। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষক মঞ্চের পর্যবেক্ষণ ও দাবি সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির যে ন্যক্কারজনক ঘটনার অভিযোগ পত্রিকায় উঠে এসেছে, তাতে আমরা মর্মাহত এবং লজ্জিত। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশাসনের রহস্যজনক লুকোচুরি এবং একগুঁয়েমির মধ্য দিয়ে ঘটনার শুরু হলেও পরবর্তীতে টেন্ডার গ্রহণে অনিয়ম এবং ছিনতাইয়ের অভিযোগ সামনে আসে। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এসেছে। ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগকে ১ কোটি টাকা ভাগ করে দেয়ার অভিযোগ এসেছে, যা একাধিক ছাত্রলীগ নেতা স্বীকারও করেছেন।’

বিবৃতিতে শিক্ষকরা চারটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হল : তদন্ত কমিটি স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে টার্মস অব রেফারেন্স এবং এখতিয়ার জনসমক্ষে প্রকাশ করা, তদন্তের স্বার্থে ভিসিকে সাময়িকভাবে পদ থেকে সরে যেতে হবে। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদেরকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

আজ বুধবার ভিসির সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। সেখানে ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দাবি করব তদন্তকালীন সময়ে ভিসি যেন তার পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি নেয়। এটা সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সহায়ক হবে।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×