রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি: নেপথ্যে শক্তিশালী দুই সিন্ডিকেট
jugantor
রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি: নেপথ্যে শক্তিশালী দুই সিন্ডিকেট
দুদকের তদন্তে অনেকেই চিহ্নিত * প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে ঢাকায়

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো  

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভোটার করা বা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেয়ার পেছনে দুটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দুই সিন্ডিকেটের অধিকাংশ সদস্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ঢাকা নির্বাচন কমিশন অফিসের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তাদের সঙ্গে আছে অনেক দালাল। নির্বাচন অফিসের যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ও কম্পিউটার অপারেটর। একটি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার ডবলমুরিং থানার নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন।

অপর সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এনআইডি প্রজেক্টে কর্মরত শাহানুর। জয়নাল গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছে।

দুদক সূত্র জানায়, একটি সিন্ডিকেটের সদস্যরা হল- ঢাকায় এনআইডি প্রজেক্টের (বর্তমানে নেই) টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সত্য সুন্দর দে এবং সাগর। ফরম-২ সরবরাহকারী হলেন চট্টগ্রাম জেলার ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন (এ তিনজনই মামলার আসামি)।

জয়নাল আবেদীনের আত্মীয় নুর আহম্মদ, আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত রিশি এবং জাফর (জয়নাল আবেদীনের বেতনভুক্ত সেক্রেটারি) রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করে। রোহিঙ্গাদের ডাটা এন্ট্রি করে অস্থায়ী অপারেটর সৈকত বড়ুয়া, শাহজামাল, পাভেল বড়ুয়া, বায়ান উদ্দিন (জয়নালের বোন জামাই) ও জনপ্রিয় বড়ুয়া।

কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসেন কক্সবাজার জেলার নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মোজাফ্ফর ও দালাল নজিবুল্লাহসহ আরও কয়েকজন। এই অবৈধ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে।

অপর সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে শাহানুর। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট হিসেবে এনআইডি প্রজেক্টে কর্মরত। তার ১০ জনের অধিক নিকটাত্মীয় মাঠ প্রকল্পের প্রায় প্রত্যেকটি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচিতে কর্মরত রয়েছেন।

তার সিন্ডিকেটে রয়েছেন- চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের অপারেটর তাসলিমা আকতার, ডবলমুরিং নির্বাচন অফিসে কর্মরত শাহনুরের ছোট ভাই শাহজামাল, বাঁশখালী নির্বাচন অফিসের অপারেটর ও শাহনুরের ভাগিনা জাহিদ হোসেন, খালাতো ভাই কক্সবাজার সদর নির্বাচন অফিসের অপারেটর নঈম ইসলাম।

সিন্ডিকেটে আছেন শাহানুরের বন্ধু হিরো, যিনি কক্সবাজার রামু নির্বাচন অফিসের অপারেটর। আছেন খালাতো ভাই শাহ আলম; যিনি বোয়ালখালী নির্বাচন অফিসের অপারেটর।

এছাড়া শাহানুরের আপন খালাতো দুই বোন অপারেটর ইয়াসমিন আক্তার রুপা ও ফারজানা আক্তারও আছেন। শাহানুরের ভাগিনা শহিদুল্লাহ, ভাগ্নি শারমিন ও আপন জেঠাতো ভাই শাহেদ, মামা শহীদুল্লাহ লোকবল সংগ্রহ করে অপকর্মে সহায়তা করেন।

শাহানুর মিয়ার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায় ও অন্যদের বাড়ি তারই আশপাশের উপজেলায়। সিন্ডিকেটে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার অনেক অপারেটর রয়েছেন। যাদেরকে তিনি প্রকল্পের আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান আইপিপিএলের কর্মকর্তা দ্বিজেন দাসের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা দিয়ে নিয়োগ পাইয়ে দেন।

দুদক সূত্র জানায়, এ দুই সিন্ডিকেট সম্পর্কে দুদক কর্মকর্তারা প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। এতে দুই সিন্ডিকেট সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালে নির্বাচন কমিশনের গায়েব হওয়া ৪৩৯১ নম্বরের ল্যাপটপটির মাধ্যমে কতজন রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে, ল্যাপটপটি কার নামে এনডোর্স ছিল, কোথায় কোথায় ব্যবহার হয়েছে, সর্বশেষ কাস্টুডিয়ান কে ছিল তা চট্টগ্রাম নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছে দুদক। ওই ল্যাপটপটি ২০১৪ সালে হারিয়ে গেলেও এ বিষয়ে থানায় কোনো জিডি করেনি নির্বাচন কমিশন, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলার নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে নির্বাচন অফিসের ফরম-২ এর সিরিয়াল নম্বর ৪১৮৬৬৩৩৩ থেকে ৪১৮৬৬৩৯৩ সহ ৬৮টি ফরম-২ এর মাধ্যমে যারা ভোটার হয়েছিল তার মধ্যে ৬৭ জনই রোহিঙ্গা।

যে একজন বাংলাদেশি ভোটার রয়েছেন তিনি বাঁশখালী এলাকার বসিন্দা। তার নাম মোস্তফা আলী। তিনি ডবলমুরিং নির্বাচন কমিশন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন ও কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কমিশন অফিসের অফিস সহায়ক মোজাফফরের নিকটাত্মীয়।

জানতে চাইলে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার পেছনে কারা কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

দুটি সিন্ডিকেটের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানতে পেরেছি। চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি: নেপথ্যে শক্তিশালী দুই সিন্ডিকেট

দুদকের তদন্তে অনেকেই চিহ্নিত * প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে ঢাকায়
 নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভোটার করা বা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেয়ার পেছনে দুটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দুই সিন্ডিকেটের অধিকাংশ সদস্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ঢাকা নির্বাচন কমিশন অফিসের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তাদের সঙ্গে আছে অনেক দালাল। নির্বাচন অফিসের যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ও কম্পিউটার অপারেটর। একটি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার ডবলমুরিং থানার নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন।

অপর সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এনআইডি প্রজেক্টে কর্মরত শাহানুর। জয়নাল গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছে।

দুদক সূত্র জানায়, একটি সিন্ডিকেটের সদস্যরা হল- ঢাকায় এনআইডি প্রজেক্টের (বর্তমানে নেই) টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সত্য সুন্দর দে এবং সাগর। ফরম-২ সরবরাহকারী হলেন চট্টগ্রাম জেলার ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন (এ তিনজনই মামলার আসামি)।

জয়নাল আবেদীনের আত্মীয় নুর আহম্মদ, আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত রিশি এবং জাফর (জয়নাল আবেদীনের বেতনভুক্ত সেক্রেটারি) রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করে। রোহিঙ্গাদের ডাটা এন্ট্রি করে অস্থায়ী অপারেটর সৈকত বড়ুয়া, শাহজামাল, পাভেল বড়ুয়া, বায়ান উদ্দিন (জয়নালের বোন জামাই) ও জনপ্রিয় বড়ুয়া।

কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসেন কক্সবাজার জেলার নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মোজাফ্ফর ও দালাল নজিবুল্লাহসহ আরও কয়েকজন। এই অবৈধ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে।

অপর সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে শাহানুর। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট হিসেবে এনআইডি প্রজেক্টে কর্মরত। তার ১০ জনের অধিক নিকটাত্মীয় মাঠ প্রকল্পের প্রায় প্রত্যেকটি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচিতে কর্মরত রয়েছেন।

তার সিন্ডিকেটে রয়েছেন- চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের অপারেটর তাসলিমা আকতার, ডবলমুরিং নির্বাচন অফিসে কর্মরত শাহনুরের ছোট ভাই শাহজামাল, বাঁশখালী নির্বাচন অফিসের অপারেটর ও শাহনুরের ভাগিনা জাহিদ হোসেন, খালাতো ভাই কক্সবাজার সদর নির্বাচন অফিসের অপারেটর নঈম ইসলাম।

সিন্ডিকেটে আছেন শাহানুরের বন্ধু হিরো, যিনি কক্সবাজার রামু নির্বাচন অফিসের অপারেটর। আছেন খালাতো ভাই শাহ আলম; যিনি বোয়ালখালী নির্বাচন অফিসের অপারেটর।

এছাড়া শাহানুরের আপন খালাতো দুই বোন অপারেটর ইয়াসমিন আক্তার রুপা ও ফারজানা আক্তারও আছেন। শাহানুরের ভাগিনা শহিদুল্লাহ, ভাগ্নি শারমিন ও আপন জেঠাতো ভাই শাহেদ, মামা শহীদুল্লাহ লোকবল সংগ্রহ করে অপকর্মে সহায়তা করেন।

শাহানুর মিয়ার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায় ও অন্যদের বাড়ি তারই আশপাশের উপজেলায়। সিন্ডিকেটে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার অনেক অপারেটর রয়েছেন। যাদেরকে তিনি প্রকল্পের আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান আইপিপিএলের কর্মকর্তা দ্বিজেন দাসের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা দিয়ে নিয়োগ পাইয়ে দেন।

দুদক সূত্র জানায়, এ দুই সিন্ডিকেট সম্পর্কে দুদক কর্মকর্তারা প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। এতে দুই সিন্ডিকেট সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালে নির্বাচন কমিশনের গায়েব হওয়া ৪৩৯১ নম্বরের ল্যাপটপটির মাধ্যমে কতজন রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে, ল্যাপটপটি কার নামে এনডোর্স ছিল, কোথায় কোথায় ব্যবহার হয়েছে, সর্বশেষ কাস্টুডিয়ান কে ছিল তা চট্টগ্রাম নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছে দুদক। ওই ল্যাপটপটি ২০১৪ সালে হারিয়ে গেলেও এ বিষয়ে থানায় কোনো জিডি করেনি নির্বাচন কমিশন, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলার নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে নির্বাচন অফিসের ফরম-২ এর সিরিয়াল নম্বর ৪১৮৬৬৩৩৩ থেকে ৪১৮৬৬৩৯৩ সহ ৬৮টি ফরম-২ এর মাধ্যমে যারা ভোটার হয়েছিল তার মধ্যে ৬৭ জনই রোহিঙ্গা।

যে একজন বাংলাদেশি ভোটার রয়েছেন তিনি বাঁশখালী এলাকার বসিন্দা। তার নাম মোস্তফা আলী। তিনি ডবলমুরিং নির্বাচন কমিশন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন ও কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কমিশন অফিসের অফিস সহায়ক মোজাফফরের নিকটাত্মীয়।

জানতে চাইলে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার পেছনে কারা কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

দুটি সিন্ডিকেটের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানতে পেরেছি। চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা