আমরণ অনশন অব্যাহত : বশেমুরবিপ্রবি বন্ধ ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

তদন্তের নির্দেশ শিক্ষা উপমন্ত্রীর * সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ * বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

  গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বশেমুরবিপ্রবি

গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। উপাচার্যের মদদপুষ্ট ক্যাডারদের হামলায় ২০ শিক্ষার্থী আহত হন।

এদিকে আন্দোলনের মুখে আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মো. হুমায়ূন কবীর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর করা এক অফিস আদেশে শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে ছাত্রদের এবং বিকাল ৪টার মধ্যে ছাত্রীদের আবাসিক হল ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশ, র‌্যাব ও আর্মড ফোর্সের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকি করতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সকাল থেকে তৃতীয় দিনের মতো প্রশাসনিক ভবনের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন করেন।

বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল নির্মাণে আড়াই কোটি টাকা লোপাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি, নিয়োগ ও ভর্তি বাণিজ্য এবং নারী কেলেঙ্কারির হোতা উপাচার্যকে অপসারণ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তারা বিক্ষোভ করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন।

দুপুর ১২টার দিকে ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন মেস ও বাড়িতে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ক্যাম্পাসে প্রবেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। পথিমধ্যে নিলারমাঠে তাদের ওপর উপাচার্যের মদদপুষ্ট বহিরাগত ক্যাডাররা হামলা চালায়।

শহরের নবীনবাগ এলাকার বিভিন্ন মেস ও বাসায় বসবাসরত শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দিতে ক্যাম্পাস অভিমুখে যাত্রা করলে সার্কিট হাউসের সামনে ক্যাডারদের বাধার মুখে পড়েন। এ সময় তারা গোপালগঞ্জ-পাটগাতী সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে মূল ফটকের সামনে অনেক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেন। এ খবরে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আহত সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আঞ্জুমান আরা আঁখি বলেন, উপাচার্যের সশস্ত্র ক্যাডাররা তাকে আহত করেছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর উপাচার্যের মদদপুষ্ট ক্যাডারদের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে শিক্ষক নেতারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

বঙ্গবন্ধু পরিষদ বশেমুরবিপ্রবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহজাহান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. রাজিউর রহমান, প্রচার সম্পাদক এমরান হোসেন তীব্র নিন্দা জানান।

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা শেখ তারেক বলেন, অবিলম্বে বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ট অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনকে অপসারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

ফিরিয়ে দিতে হবে শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতা। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নিন্দা ও বিচার দাবি করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল হামিদ ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। ১৪৪ ধারা জারি করতে উপাচার্য অনুরোধ করলেও পরিস্থিতি সেরকম কিছু না হওয়ায় আমরা তা করিনি।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করা হয়েছে। এরপরও কেন তারা আন্দোলন করছেন, তা বোধগম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করতে বিশেষ মহল তাদের উসকানি দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করতে পারেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, এ আন্দোলন তার বিরুদ্ধে নয়, এটা রাজনৈতিক আন্দোলন।

উদ্ভূত পরিস্থিতি তদন্তের নির্দেশ শিক্ষা উপমন্ত্রীর : বশেমুরবিপ্রবি উদ্ভূত পরিস্থিতি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইনকে তিনি এ নির্দেশনা দেন বলে জানিয়েছেন তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের।

এ ব্যাপারে আজ কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানা গেছে। বশেমুরবিপ্রবির এক ছাত্রীকে সাময়িক বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ : বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ করেছে।

ঢাবি প্রতিনিধি জানান, বশেমুরবিপ্রবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে শনিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। এর আগে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে।

মিছিলটি ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে রাজু ভাস্কর্যে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ডাকসু ভিপি নূরুল হক নূর বলেন, শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বশেমুরবিপ্রবির উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কর্মরত সাংবাদিকরা। শনিবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে তারা কর্মসূচি পালন করেন।

এ সময় তারা ‘সাংবাদিকের ওপর হামলা কেন’, ‘ভিসি নাসির উদ্দিনের পদত্যাগ চাই’, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হামলা কেন’ সংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। এরপর সাংবাদিকরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।

জাবি প্রতিনিধি জানান, ঢাকা ও ফরিদপুরে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

সন্ধ্যায় ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বর থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদিক্ষণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সদস্য রাকিবুল রনি বলেন, গোপালগঞ্জের শিক্ষার্থীরা যখন দুর্নীতিবাজ, চরিত্রহীন ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে তখন সেই ভিসিই স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি- ঢাবি, জাবি ও বশেমুরবিপ্রবির উপাচার্যরা দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তারা সবাই একই সুতোয় বাঁধা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ জাবি শাখার আহ্বায়ক শাকিল উজ্জামান বলেন, কোনো হামলা শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে না।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা সব অন্যায় প্রতিহত করবে। অপরাধ, জুলুম করে কেউ টিকে থাকতে পারেনি, ভবিষ্যতেও টিকতে পারবে না। দুর্নীতিবাজ-সন্ত্রাসী ভিসিদের শাস্তি অবধারিত।

বেরোবি প্রতিনিধি জানান, বিশেমুরবিপ্রবি ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (বেরোবিসাস) নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।

ইবি প্রতিনিধি জানান, বশেমুরবিপ্রবির উপাচার্যের অপসারণ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) মোমবাতি জ্বালিয়ে মৌন মিছিল করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বশেমুরবিপ্রবির উপাচার্যের কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’ ম্যুরালের সামনে কুশপুত্তলিকা দাহ করার মাধ্যমে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়।

এর আগে ক্যাম্পাসের জিয়া মোড় এলাকা থেকে মোমবাতি হাতে মৌন মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি ম্যুরালে সামনে গিয়ে এক প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়।

সাংবাদিক ফাতিমাতুজ জিনিয়ার বহিষ্কারাদেশ ও শামস জেবিনসহ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর উপাচার্যের মদদপুষ্ট ক্যাডারদের হামলার তীব্র নিন্দা জানান শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনের সঙ্গে তারা একাত্মতা ঘোষণা করেন।

সমাবেশে শামিমুল ইসলাম সুমনের সঞ্চালনায় আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মমিনুর রহমান, তৌফিক আহমেদ, ইইই বিভাগের আরিফুর রহমান ও বাংলা বিভাগের জিকে সাদিক বক্তব্য দেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×