আরপিওসহ দুই আইন ও দুই বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত

সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারে নিষেধাজ্ঞা

অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা, নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের সাজা বৃদ্ধি, ইভিএমসহ আরপিওতে ৩০টির বেশি সুপারিশ * উপজেলা অখণ্ডতা, জনসংখ্যা এবং ভোটার সংখ্যার ওপর গুরুত্বারোপ করে সীমানা নির্ধারণ

  কাজী জেবেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান যুক্ত করে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে নির্বাচনী ফলের গেজেটে প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মাধ্যম, ডিজটাল ডিসপ্লে বোর্ড, ফেসবুক, টুইটার, ভাইভারসহ সব ধরনের সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় প্রচার নিষিদ্ধ থাকবে। কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী এ ধরনের প্রচার চালালে দায়ী ব্যক্তি বিধান অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি’র এক সভায় এসব বিধান যুক্ত করে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। ওই সভায় দুটি আইন ও আরেকটি বিধিমালা সংস্কারের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২, জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী (প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন যাচাই) বিধিমালা। ইসির একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের দুইজন যুগ্ম সচিব প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে জানান, কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে আইন ও সংস্কার কমিটির সুপারিশ করা চারটি আইন ও বিধিমালার সংশোধনের খসড়া কমিশন সভায় তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পেলে তা আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা পাস করতে সংসদে তোলা হবে।

তাদের কাছ থেকে আরও জানা গেছে, আরপিওতে ৩০টির বেশি সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ, নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের সাজা বাড়ানো, ইলেকট্রোরাল ইনকোয়ারিতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি কমিশনের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবসরের তিন বছর পর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বর্তমান বিধান বহাল রাখা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিধান সহজ করে এক হাজার ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। আরপিওতে এ বিধান যুক্তের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী (প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন যাচাই) বিধিমালা-২০০৮ এ বেশ কিছু ধারায় সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে। তারা আরও জানান, উপজেলা অখণ্ডতার ওপর গুরুত্বারোপ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন সংশোধনের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে উপজেলা ভেঙেও সীমানা নির্ধারণ করা যাবে। জেলার আসন সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ কমবেশি করার বিধান রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসি ঘোষিত রোডম্যাপের সাতটি কর্মপরিকল্পনার প্রথমটি হল আইন ও বিধিমালা সংস্কার। এতে গত ডিসেম্বরের মধ্যে আইন সংস্কারের প্রাসঙ্গিত খসড়া তৈরি এবং ফেব্রুয়ারির মধ্যে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ওই রোডম্যাপ থেকে পিছিয়ে থাকলেও ফেব্রুয়ারির মধ্যে খসড়া চূড়ান্ত করল এ কমিটি।

আরও জানা গেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত নির্বাচন পূর্ব সময় হিসেবে ধরা হয়। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণামূলক সভার অনুমতি নেয়ার ক্ষেত্রে নতুন বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। আচরণ বিধিমালার ৬ (১) (খ) (গ) এ নতুন বিধানে বলা হয়েছে- কোনো প্রার্থী বা দল সভা করার অনুমতি চেয়ে লিখিত আবেদন করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দিতে হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না দিলে সভার অনুমতি দেয়া হয়েছে মর্মে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা পর অনুমোদন পেয়েছে বলে গণ্য করা হবে।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার ও জেলার ভেতরে ডিসি সভা করার অনুমতি দেন। সভা করার লিখিত আবেদন প্রাপ্তির সময়ের ক্রমানুসারে অনুমোদন দেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ বিধানের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।

আচরণ বিধিতে ডিজিটাল প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দুটি বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিধিমালার ৭(৮) ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে কোনো প্রকার ইলেকট্রনিক মাধ্যম বা ডিসপ্লে বোর্ড ব্যবহার করা যাবে না। ৭ (ক) ধারা সংযোজন করে বলা হয়েছে, ফেসবুক, টুইটার, ভাইভারসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কোনো প্রার্থী বা সমর্থক বা রাজনৈতিক দল কোনো প্রকার প্রচারণা চালাতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ বিধান ভঙ্গ করলে প্রার্থী বা সমর্থক করাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর রাজনৈতিক দল এ ধারা লংঘন করলে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

আচরণ বিধিমালায় ভোট কেন্দ্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে নির্বাচনের সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আচরণ বিধিমালার ৫ (৪) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতা/কর্মী নির্বাচনপূর্ব সময় ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো সভায় অংশ নেবেন না এবং কোনো কাজে জড়িত হবেন না। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার কোনো বিধান ভঙ্গ করলে তা ইলক্টোরাল এনফোর্সমেন্ট অফিসার সংক্ষিপ্ত শুনানি করে বিধি ১৮(১) এ উল্লিখিত শাস্তি দিতে পারবেন।

কয়েক দফা বৈঠকে আরপিও সংশোধনী নিয়ে আলোচনার পর মঙ্গলবার তা চূড়ান্ত করা হয়। এতে ইভিএমে ভোটগ্রহণ, নির্বাচন কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা, অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা, স্বতন্ত্র প্রার্থিতা সহজ করা, নির্বাচন কর্মকর্তাদের সাজা বাড়িয়ে সর্বনিু তিন বছর করার বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, নির্বাচনী অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে অভিযোগকারীকে জানিয়ে দেয়া, জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া আরপিওর ৮৩ ও ৮৬ ধারায় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাজার সর্বনিু মেয়াদ ১ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩ বছর এবং সর্বোচ্চ মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আরপিওর ৯১ সি (৮) ধারায় ব্যয় মনিটরিংয়ে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। ৯১এএ ধারায় নির্বাচন নিয়ে জমা হওয়া অভিযোগ সম্পর্কে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া এবং গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে অভিযোগকারীকে জানানো বাধ্যতামূলক করার বিধান সংযোজনের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কমিটির অন্য সদস্যদের কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.