বিতর্ক এড়াতে বিএনপির উদ্যোগ

তৃণমূলে পাঠানো হচ্ছে সংশোধিত গঠনতন্ত্র

প্রথম ধাপে মার্চে পাঠানো হবে ১০ হাজার কপি

  তরিকুল ইসলাম ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সংশোধিত গঠনতন্ত্র তৃণমূলে পাঠাচ্ছে বিএনপি। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা পর্যন্ত সব পর্যায়ের নেতার হাতে পেঁৗঁছে দেয়া হবে এই গঠনতন্ত্র। মার্চে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কপি পাঠানো হবে। সংশোধিত গঠনতন্ত্রে সপ্তম ধারাসহ আরও দুটি উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। সংযোজন করা হয়েছে দুটি ধারাসহ ৫টি উপধারা। বিতর্ক এড়াতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলায় গঠনতন্ত্র পাঠানো হবে। সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে যতই ষড়যন্ত্র করুক, তা কোনো দিন সফল হবে না। জনগণ তা সফল হতে দেবে না।’

সূত্র জানায়, ‘সংশোধিত গঠনতন্ত্র ছাপানোর কাজ চলছে। প্রথম ধাপে ১০ হাজার কপি ছাপানো হচ্ছে। হাইকমান্ডের অনুমতি পেলে মার্চের মধ্যে এসব কপি ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা শাখায় পাঠানো হবে। দলের সাংগঠনিক জেলা শাখার নেতারা পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, মহানগর নেতাদের কাছে পৌঁছাবেন।

দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি গণতান্ত্রিক একটি দল। সংবিধান সংশোধন হলে বরাবরই তা তৃণমূল নেতাদের কাছে পৌঁছায়। তবে এবার সংশোধিত গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল বিতর্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তাই ওই ধারা সম্পর্কে সচেতন করতে মার্চের মধ্যেই সংশোধিত গঠনতন্ত্র তৃণমূল নেতাদের হাতে পৌঁছে দেয়া হেব।’

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে কাউন্সিলরদের সর্বসম্মতিক্রমে গঠনতন্ত্র সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন হয়। ১ বছর ১০ মাস পর ২৮ জানুয়ারি সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেয় বিএনপি। সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, ‘কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সংশোধিত গঠনতন্ত্রটি সম্পাদনা ও গ্রন্থনায় বিলম্ব হয়েছে।’ তবে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, বিলম্ব হওয়ার আরেকটি কারণ হল গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের অসুস্থতা। পরে কাজ শুরু করেন আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে অনুমোদিত গঠনতন্ত্র ও সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে অনুমোদিত সংশোধিত গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংশোধিত গঠনতন্ত্রে সপ্তম ধারাসহ আরও দুই উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। সংযোজন করা হয়েছে দুটি ধারাসহ ৫টি উপধারা।

সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ‘৫’ এর (ক) ধারায় ‘সদস্য পদ লাভের যোগ্যতা’ নির্ধারণে ‘৫’, ‘৬’ এবং ‘৭’- তিনটি উপধারা নতুন যোগ করা হয়েছে। ‘৫’ উপধারায় বলা হয়েছে, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যদের মাসিক চাঁদার হার দলের চেয়ারপারসন নির্ধারণ করবেন। ‘৬’ উপধারায় দলের ইউনিয়ন ওয়ার্ড কমিটি থেকে জেলা কমিটির কর্মকর্তা ও নির্বাহী সদস্যদের মাসিক চাঁদার হার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ‘৭’ উপধারায় মাসিক এবং বার্ষিক চাঁদা নিয়মিত পরিশোধ না করলে কোন প্রক্রিয়ায় কীভাবে সদস্যপদ বাতিল হবে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, যথাসময়ে চাঁদা পরিশোধে অক্ষম হলে সংশ্লিষ্ট কমিটির চেয়ারম্যান বা সভাপতি ও মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদক বরাবর চাঁদা মওকুফের কিংবা বিলম্বে পরিশোধের আবেদন জানালে তার বিবেচনা করা যাবে।

একই সঙ্গে ‘৪’ উপধারায় প্রাথমিক সদস্য চাঁদাসহ সদস্যপদ লাভের পরবর্তী বছর থেকে দলের বাৎসরিক চাঁদা ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে।

‘৬’ এর (খ) ধারায় ‘সাংগঠনিক কাঠামোর গঠনপ্রণালিতে’ মহানগর ওয়ার্ড কাউন্সিল ও মহানগর ওয়ার্ড নির্বাহী কমিটি (৭ উপধারা) এবং মহানগর থানা কাউন্সিল ও মহানগর থানা নির্বাহী কমিটি (৮ উপধারা)- এ দুটি বিলুপ্ত করে ‘১১’ এবং ‘১৩’ উপধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। ‘১১’ উপধারায় জাতীয় নির্বাহী কমিটির কর্তব্য ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। যদিও এ উপধারটি আগের গঠনতন্ত্রের ‘১১’ উপধারা ‘জাতীয় নির্বাহী কমিটির’ অংশে ছিল। আর ‘১৩’ উপধারাটিতে ‘বিষয়ভিত্তিক উপকমিটির’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। যে কমিটিগুলোয় দলের সদস্য নন অথচ বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী, যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন- এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। একই ধারার ‘১২’ উপধারায় ‘চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিল’ গঠনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে চেয়ারম্যানকে বিভিন্ন বিশেষ পরামর্শদানের জন্য একটি উপদেষ্টা কাউন্সিল থাকবে। উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যরা চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত হবেন এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যানের পদমর্যাদার অধিকারী হবেন। পদাধিকার বলে উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যরা দলের জাতীয় কাউন্সিলের কাউন্সিলর বলে গণ্য হবেন। জাতীয় নির্বাহী কমিটির আকারও বাড়ানো হয়েছে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে। জাতীয় নির্বাহী কমিটি অনূর্ধ্ব ৩৫১ জনের জায়গায় এখন অনূর্ধ্ব ৪৭০ জন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত হবে।

গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারাটি বিলুপ্ত করে এ ধারায় আগের ৮ নম্বর ধারাটি রাখা হয়েছে। তবে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে ‘৭’ এর (ক) ধারায় চেয়ারম্যান নির্বাচনের বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান নির্বাচনের সময় একই সঙ্গে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান স্বপদে বহাল থাকবেন। ৭ (গ) এর ৩ উপধারায়ও একটি লাইন সংযোজন করা হয়েছে। এই উপধারায় ছিল, যে কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যানের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এর সঙ্গে সংযোজন করা হয়েছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।

আগের গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারায় ‘কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা ছিল, ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যে কোনো পর্যায়ের যে কোনো নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তারা হলেন : (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতি আদেশ নং ৮ এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি। (খ) দেউলিয়া; (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি; (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।

অবশ্য সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ৫ এর ‘ক’-এ ‘সদস্যপদ লাভের যোগ্যতা’ ও ‘খ’-এ ‘সদস্যপদ লাভের অযোগ্যতা’ উপধারা দুটি বলবৎ আছে। ‘খ’-এ বলা আছে, ‘বাংলাদেশের আইনানুগ নাগরিক নন এমন কোনো ব্যক্তি জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হতে পারবেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতার বিরোধী; গোপন কিংবা সশস্ত্র রাজনীতিতে বিশ্বাসী ও সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সমাজবিরোধী ও গণবিরোধী কোনো ব্যক্তিকে সদস্যপদ দেয়া হবে না।’

দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, ‘ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে কাউন্সিলররা সর্বসম্মতিক্রমে সপ্তম ধারাটি বাতিল করেছেন। তাই এখন থেকে ৫ এর ‘ক’ ও ‘খ’ উপধারার নির্দেশনাই দলের যে কোনো কমিটির সদস্য ও সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্যতা হিসেবে ধরে নেয়া হবে।’

এছাড়া সংশোধিত গঠনতন্ত্রে ‘১৪’ ও ‘১৫’ আরও দুটি ধারা যোগ করা হয়েছে। ১৪ ধারায় বলা হয়েছে ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র ও মিডিয়া উইং’-এর বিষয়টি। আর ১৫ ধারায় ‘বিশেষ বিধান : এক নেতা এক পদ’ যোগ করা হয়েছে।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.