আলোচনা চক্রে বক্তারা

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে ‘তাদের’ কোনো দুঃখবোধ নেই

মেধাবীর অভাব নেই, অভাব যোগ্য নেতৃত্বের

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন আয়োজিত আলোচনা চক্রে বক্তারা বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হলেও এনিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো দুঃখবোধ নেই। বিষয়টা যেন গা সওয়া হয়ে গেছে।

মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক শফি আহমেদ। তিনি বিদ্যমান তিন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি উল্লেখ করে বলেন, ‘একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। নভেম্বরে প্রথম শ্রেণীর প্রশ্ন ফাঁসের খবরও

বেরিয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটা একটা নায়কোচিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এভাবে যে অপরাধীরা আগাম ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস

করছে। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দুঃখবোধও দেখছি না।’

তিনি বলেন, ‘একদিকে প্রচলিত ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে। আরেকদিকে আছে মাদ্রাসা এবং ইংরেজি ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা। এর ফলে দেশ বিভাজনের দিকে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরের অর্ধেকের বেশি স্কুলে জাতীয় পাঠ্য পুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বই পড়ানো হয় না। অনেকেই গাইড বই পড়ান।’

শফি আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে অনুমোদিত একটি দলিল। তাই এটি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। একটি বাস্তবায়ন কমিটি করা হলেও তার কোনো কাজ নেই। শিক্ষানীতি ৭ বছর ধরে কাগজে-কলমেই আছে। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা বড় ব্যর্থতা।’ মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে হিন্দু নাম বাদ দিয়ে মুসলিমকরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে গত বছর পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা হয়।’

অনুষ্ঠানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পেতে প্রাথমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য উপস্থাপনের ব্যবস্থা রাখেন আয়োজকরা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী মাহবুবা হোসেন বলে, ‘বর্তমানে কম পড়ে, কোচিং করে ও গাইড বই থেকে পড়ে পাস করার প্রবণতা চলছে। শিক্ষা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়। পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয় না। নিম্নমানের ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছি। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে এ শিক্ষা ব্যবস্থায় মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে এক সময়ে ভেঙে যাবে।’ মাহবুবা বলে, ‘আমরা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যেখানে প্রশ্ন ফাঁস হবে না, নকল হবে না। কর্মমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চাই। যে শিক্ষায় আচরণের গুণগত পরিবর্তন হবে সেই শিক্ষা চাই। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তা হচ্ছে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ছাত্রী সামিয়া ইসলাম বলেন, ‘আমি শহরের স্কুলে লেখাপড়া করেছি। সকাল ৮টায় শিক্ষকের বাসায় কোচিংয়ের মাধ্যমে দিন শুরু হতো। পরপর দুটি বাসায় পড়ে সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত স্কুলে কাটত। এ সময়ে নাস্তা ও দুপুরের খাবার বাইরে খেতে হতো। বিকালে ফেরার পর আবার বাসায় টিউটর আসত। আমাদের কোনো শৈশব বা কৈশোরের উপলব্ধি ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘পূর্ব কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষায় একের পর এক নতুন নতুন পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। একবার গণিতে সৃজনশীল চালুর পর প্রথম পরীক্ষায় আমার ক্লাসের ৬০ জনের ৫০ জনই ফেল করল। পরে শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ার পরে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় সবাই পাস করল। শিক্ষরা গাইড বই থেকে পড়ান ও প্রশ্ন নেন। আমাদেরও পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেয়া হতো তিনি কোন গাইড অনুসরণ করেন। আমরাও সেটা অনুসরণ করতাম।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বুয়েট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘আমাদের দেশে মেধা ও মেধাবীর কোনো অভাব নেই। অভাব আছে যোগ্য নেতৃত্বের। শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ শুভকর বলে মনে হচ্ছে না। এদেশে শিক্ষকদের চেয়ে ট্রাকচালক সমিতির গুরুত্ব বেশি। অথচ বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো শাখায় আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সমকক্ষ নই। আমাদের দেশের শিক্ষকরা শুধু প্রশ্নই দেন না, সে প্রশ্নের উত্তরও জানিয়ে দেন। কিভাবে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটবে জানি না। বলা হচ্ছে, পরীক্ষা পদ্ধতি পাল্টানো হবে। তাহলে বর্তমান পদ্ধতির দোষ কী? এসবের দায়িত্ব যাদের হাতে তাদের যোগ্য বলে মনে হয় না। এখনকার বাচ্চারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা থাকতে হবে। তা না হলে মেধার বিকাশ হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে প্রশ্ন ফাঁস চলছে। এটি এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। আসলে আমাদের গায়ের চামড়া মোটা হয়ে গেছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা চলছে। দেশে ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে। একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কোনো সরকারই উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের যে বান ডেকেছে তা থামছে না। এ জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। হেফাজতের পরামর্শ নিয়ে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কলেজগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে সেখানে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্লাসও হয় না। শিক্ষকরা ক্লাস না নিয়ে উপস্থিতির পূর্ণ নম্বর দিয়ে দিচ্ছেন। কওমির সিলেবাসে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাসসহ অন্য বিষয় পড়ানো হচ্ছে না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাদ্রাসা শিক্ষার ৭৫ শতাংশ ছাত্র বেকার থাকছেন।’

এছাড়া আলোচনা চক্রে ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, শিক্ষক নেতা শরীফুজ্জামান আগা খাঁন, হেনা রানী রায় প্রমুখ বক্তব্য দেন।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.