বই উৎসবের সমাপ্তি আজ

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হক ফারুক আহমেদ

বইমেলাকে এখন সবাই বলে বইয়ের উৎসব। একদিকে বিভিন্ন ধরনের বই কেনা, অন্যদিকে মেলামঞ্চে বিচিত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সব মিলে মেলায় থাকে উৎসবের পরিবেশ। সেই উৎসবেরই সমাপ্তি আজ।

ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ঋদ্ধ এক মাসের মিলনমেলা ভাঙবে। মেলার শেষদিকে এসে দু’দিন বাগড়া দিয়েছে বৃষ্টি। তবে সেটা রাতে হওয়ায় পাঠকদের বই সংগ্রহ করতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। আজ মেলার দ্বার খুলবে বিকাল ৩টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। শেষদিন হওয়ায় আজ মেলায় থাকবে উপচেপড়া ভিড়। যারা এখনও প্রিয় লেখকের বইটি সংগ্রহ করতে পারেননি তারা সেটি সংগ্রহ করবেন।

মেলার শেষদিন নিয়ে বলতে গিয়ে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মেলায় আজ হবে শেষদিনের বিকিকিনি। যারা এখনও প্রিয় লেখকের বই সংগ্রহ করেননি তারা বই কিনবেন। পাঠক-প্রকাশক সবার কাছেই আজকের দিনটি বিশেষ দিন। কারণ আবার এক বছর পর মেলা হবে। তাই পাঠকরা যেমন বই কিনবেন তেমনি প্রকাশনাগুলো শেষ মুহূর্তের বিক্রি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।

মঙ্গলবার মেলার ২৭তম দিনে ছিল উপচেপড়া ভিড়। অনেকটা ছুটির দিনের মতোই অবস্থা। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ায় মেলার নানা জায়গায় কাদা পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। তবে ধুলোর উৎপাত ছিল না বলে বেশ স্বচ্ছন্দেই কেনাকাটা করেছে বইপ্রেমীরা। বিকালে দ্বার খুলতেই দেখা গেল আগের রাতের ২০ মিনিটের ঝড়ের ছাপ। প্রায় ৩০টি প্রকাশনা সংস্থা ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, কথাপ্রকাশ, অনুপম, চারুলিপি, আগামী, একুশে বাংলা, এশিয়ান পাবলিকেশন্স, ভাষা প্রকাশ, ম্যাগনাম ওপাস, সূচনা, মুক্তচিন্তা, ইলমা, ঘাস ফুল নদী, চমন, নওরোজ কিতাবিস্তান, আইডিয়াল, দেশ পাবলিকেশন্স, অনার্য, ঐতিহ্য, অনন্যা, সূচীপত্র, শোভাপ্রকাশ, সময় প্রকাশন, উৎস প্রকাশন, পাঠক সমাবেশ, স্টুডেন্ট ওয়েজ, আফসার ব্রাদার্স।

বইমেলায় হুমায়ূন আজাদকে স্মরণ : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ হত্যাকাণ্ডের পর ১৪ বছর কেটে গেলেও বিচারকাজ সমাপ্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক, লেখক, প্রকাশকরা। মঙ্গলবার বিকালে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস চত্বরে ‘লেখক পাঠক প্রকাশক ফোরামে’র ব্যানারে এই প্রতিবাদ সমাবেশে তারা বলেন, হুমায়ূন আজাদ হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার হয়নি বলেই পরবর্তীতে আরও ক’জন লেখক, প্রকাশক ও মুক্তমনাকে হারাতে হয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, আর্টস ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, শিল্পী কামাল পাশা চৌধুরী, ছড়াকার আসলাম সানী, প্রকাশক ওসমান গণি।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, হুমায়ূন আজাদ হত্যাকাণ্ডের রহস্যের কূলকিনারা হয়নি ১৪ বছরেও, ১৪০ বছরেও হবে না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তা অনেক আগেই সম্পন্ন হতো। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, হুমায়ূন আজাদ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি বলে পরে অভিজিৎ রায়, ফয়সল আরেফিন দীপনসহ আরও অনেক ‘আলোকিত মানুষকে’ হারাতে হয়েছে। অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফুটিয়ে তুলেই থেমে ছিলেন না হুমায়ূন আজাদ। একাত্তরের অশুভ শক্তিটি কারা তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীনভাবে মুক্তমত প্রকাশ করতে হলে, আমাদের স্বার্থেই এই বিচারকাজ সমাপ্ত হওয়া প্রয়োজন। পাঠ্যপুস্তক থেকে হুমায়ূন আজাদের ‘বই’ কবিতাটি বাদ দেয়ার ক্ষোভ এই সমাবেশেও সঞ্চারিত হয়।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশের বইমেলা থেকে বেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে টিএসসির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তের চাপাতির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন হুমায়ূন আজাদ। কয়েক মাস চিকিৎসা নেয়ার পর ওই বছর আগস্টে গবেষণার জন্য জার্মানিতে যান এই লেখক। ১২ আগস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

নতুন বই : অন্যপ্রকাশ এনেছে মাজহারুল ইসলামের ‘হুমায়ূন আহমেদের মাকড়সাভীতি ও অন্যান্য’, বাতিঘর এনেছে প্রান্ত পলাশের কাব্যগ্রন্থ ‘চিয়ার্স, ক্যামেলিয়া’, সুন্দরম এনেছে শুচি সৈয়দের ছড়ার বই ‘তেলেসমাতির রাজ্যে’, একই প্রকাশনা থেকে এসেছে শফিকুল ইসলাম শিবলির ‘স্বপ্নের শরীরে আমি’, বাংলানামা এনেছে মোস্তফা সোহেলের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সাদা মেঘে ওড়াই মৌনতা’। বইটির ভূমিকা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। গ্রন্থমেলায় প্রকাশ হয়েছে আমিনুর রহমান সুলতান সম্পাদিত ‘অমিত্রাক্ষর’-এর ‘নাজমুন নেসা পিয়ারি’ সংখ্যা। সোমবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ‘অমিত্রাক্ষর’-এর পাঠ উন্মোচন করেন খ্যাতিমান শিল্পী ফকির আলমগীর।

মেলামঞ্চের আয়োজন : মঙ্গলবার গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে ছিল ‘বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা এবং বাংলাদেশের প্রকাশনার মান উন্নয়নের সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খান মাহবুব। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বদিউদ্দিন নাজির, রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং মোস্তফা সেলিম। সভাপতিত্ব করেন ফজলে রাব্বি। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাহিদুল ইসলাম। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী লিলি ইসলাম, নীলোৎপল সাধ্য, মহাদেব ঘোষ ও কামাল আহমেদ।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষ দিন। মেলা চলবে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকালে মূল মঞ্চে রয়েছে ‘বাংলাদেশের আদিবাসী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রাহমান নাসির উদ্দিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী এবং রণজিত সিংহ। সভাপতিত্ব করবেন রাশিদ আসকারী। সন্ধ্যায় সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চারটি গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হবে।