প্যাকেটে ভুয়া ‘ব্যান্ডরোল’

হারাগাছে বিড়ি খাতে মাসে রাজস্ব ফাঁকি ৪ কোটি টাকা

  মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হারাগাছে বিড়ি খাতে মাসে রাজস্ব ফাঁকি ৪ কোটি টাকা

রংপুরের হারাগাছে বিড়ি শিল্প এলাকায় ভুয়া ‘ব্যান্ডরোল’ ব্যবহার করে দেড় শতাধিক কারখানা প্রতিমাসে ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে ও রংপুর জেলা বিড়ি মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর সঙ্গে অসাধু বিড়ি ব্যবসায়ী ও রংপুর কাস্টমসের কর্মকর্তারা জড়িত বলে জানা গেছে।

জেলায় ছোটবড় মিলে তালিকাভুক্ত বিড়ি কারখানার সংখ্যা ২৭৮টি। এর মধ্যে হারাগাছ এলাকাতেই সিংহভাগ কারখানা অবস্থিত। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে চালু থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে ২০টি কারখানা নিয়মিত বিড়ির প্যাকেটে সরকারের সরবরাহকৃত ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে থাকে। বাকি দেড় শতাধিক কারখানার মালিক ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে উৎপাদিত বিড়ি বাজারজাত করছেন। এভাবে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে কর ফাঁকিবাজ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগের হারাগাছ পৌর কমিটির সভাপতি জামিল আক্তার।

জামিল আক্তারের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান সুজনের আশিক বিড়ি নামে একটি বিড়ি কারখানা রয়েছে। বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা আশিক বিড়ির প্যাকেট সংগ্রহ করে সেখানে ভুয়া ব্যান্ডরোল পাওয়া গেছে। এ রকম রংপুর, কাউনিয়া, গাইবান্ধাসহ রংপুর জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে জামাল, শিমুল, বাংলা, সেলিম, নিউ আশা, এনতাজ, সাগর, বাদল, ফেন্সি, সিজার, আবুল, মধু, শাকিল, ফুটবল, কাজল, দুলাল, গ্রাম বাংলা, রাংগা, বুলেট, তুফান, আপন, ফ্রেস, রতনা, অটো, তৈয়ব, বিউটি, সুন্দর ময়, আনিছ, দুলাল, রবি নামে বিড়ি বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন হাটবাজার থেকে এ সব বিড়ির প্যাকেট সংগ্রহ করে দেখা গেছে এতে ব্যবহৃত ‘ব্যান্ডরোল’ ভুয়া, যা সরকারের সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রেসে ছাপা হয়নি।

সরকার ডাক বিভাগের মাধ্যমে ‘ব্যান্ডরোল’ বিড়ির কারখানার মালিকদের কাছে বিক্রি করে থাকে, যা প্রতিটি জেলা শহরের জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে ট্রেজারিতে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু এগুলো ব্যবহার না করে ভুয়া ‘ব্যান্ডরোল’ ব্যবহার করা হচ্ছে। রংপুর, বগুড়া ও সৈয়দপুরের বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেস থেকে ভুয়া ব্যান্ডরোল ছাপিয়ে বিড়ি প্যাকেটে ব্যবহার করছেন মালিকরা।

রংপুর কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল মান্নান সরদার যুগান্তরের অনুসন্ধানে সংগৃহীত বিড়ির প্যাকেটে লাগানো ব্যান্ডরোল ভুয়া স্বীকার করে বলেন, ‘আমরাও বেশ কিছু অভিযান চালিয়ে এর সত্যতা পেয়েছি। ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার করায় গত দু’বছরে ১৪৫টি মামলা দায়ের করার পাশাপাশি জরিমানা করেছি। জরিমানা থেকে অর্থ আদায়ের পরিমাণ ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রেস থেকে মালিকরা ভুয়া ব্যান্ডরোল ছাপিয়ে বিড়ির প্যাকেটে ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এভাবে ফাঁকি না দিলে রাজস্ব আদায় আরও বেশি হতো।’

আবদুল মান্নান আরও বলেন, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছরে রংপুর জেলায় বিড়ির ব্যান্ডরোল থেকে ৩৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার না হলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ হতো।’

রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তিনি স্বীকার করলেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এড়িয়ে যান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘কেউ এমন অনৈতিক আর্থিক লেনদেন করেছেন কিনা তা জানি না।’

ভুয়া ‘ব্যান্ডরোল’ ব্যবহার করে বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে রংপুর জেলা বিড়ি মালিক সমিতির সভাপতি মজিবর রহমান বলেন, ‘বছরে এই খাত থেকে রংপুর জেলায় ৫শ’ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। সরকারদলীয় একজন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে বিড়ি বাজারজাত করছে। এর সঙ্গে কাস্টম অফিসের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত। তারা একশ্রেণির বিড়ি মালিকের কাছ থেকে প্রতিমাসে অর্থ নিয়ে থাকেন। এ কারণে প্রকৃত বিড়ি ব্যবসায়ী যারা সরকারের রাজস্ব দিয়ে ব্যবসা করছেন তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের নির্ধারিত ব্যান্ডরোল থেকে স্বাস্থ্য, ভ্যাট ও আয়কর খাত থেকে প্রতিটি বিড়ির প্যাকেট বাজারজাত করার বিপরীতে ৭ টাকা ৮৩ পয়সা পেয়ে থাকেন। বিড়ির মালিকদের বিড়ি উৎপাদন খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৪ টাকা। সরকারিভাবে বিড়ি বিক্রির জন্য প্রতিটি প্যাকেটে ১৪ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু যারা ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার করছেন তারা প্রতিটি প্যাকেট গড়ে ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা বিক্রি করছেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারী মালিকরা সরকারের নির্ধারিত প্রতি প্যাকেট মূল্য ১৪ টাকার নিচে বিক্রি করতে পারছেন না। এ কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না তারা।’

রংপুর কাস্টম অফিসের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আজিজ বিড়ি থেকে আগে সরকারের রাজস্ব আয় হতো শত কোটি টাকা। কিন্তু গত বছরে তা ৬৫ কোটি ৩২ লাখ ১২ হাজার ৫শ’ টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ যারা সততার সঙ্গে বিড়ির ব্যবসা করছেন, তাদের সবার রাজস্ব প্রদানের হার কমে গেছে। হারাগাছ বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আমিন উদ্দিন বলেন, ‘ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার করায় রংপুর জেলায় বিড়ি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কমে গেছে। এজন্য কাস্টমের অসাধু কর্মকর্তারা দায়ী।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের হারাগাছ পৌর কমিটির সভাপতি জামিল আক্তার বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কোনো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করি না। যদি কেউ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে থাকে, সে জন্য দায়ী কাস্টমস কর্মকর্তারা। তারা সুযোগ না দিলে কেউ এমনটা করার সাহস পেত পারে না। রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×