এত অভিযোগ তবুও ৩৪ বছর বহাল ভোলা আদালতের নাজির

মন্ত্রণালয়ের দুই দফা তদন্তেই ঘুষ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোলা জজ আদালতেই কাটছে ৩৪ বছর: এত অভিযোগ তবুও বহাল তিনি
ভোলা জেলা জজ আদালতের নাজির হোসেন শাহ। ছবি: সংগৃহীত

দরিদ্র পিতার সন্তান ভোলা জেলা জজ আদালতের নাজির হোসেন শাহ এখন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। ১৯৮৫ সালে ২ হাজার টাকারও কম বেতনে নিুমান সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর ধীরে ধীরে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন তিনি।

হোসেন শাহর বিরুদ্ধে কয়েক দফা দাফতরিক তদন্তও হয়েছে। তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পরও ৩৪ বছর ধরে তিনি এই আদালতেই বহাল তবিয়তে। সর্বশেষ গত বছরের শেষের দিকে জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তার তদন্তেও তার বিরুদ্ধে মিলেছে বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতির প্রমাণ।

হোসেন শাহ অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং ষড়যন্ত্র করছে। আমার সকল অর্থ সম্পদ বৈধ ও কোনো দুর্নীতি করিনি বলে দাবি করেন তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারীর।

জজ আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেছেন, ‘বলতে গেলে চাকরিজীবনে বেতনের টাকা তোলেননি হোসেন শাহ। চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই বেতনের সিংহভাগ জমা রেখেছেন জিপি ফান্ডে। ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট পর্যন্ত তার জিপি ফান্ডে জমার পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ। তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারী যদি বছরে বেতনের ৮২ হাজার টাকাই জিপি ফান্ডে জমা দেন তাহলে তার সংসার চলেছে কী করে?

বিপুল পরিমাণ জমি কেনা, আলিশান বাড়ি করা, ছেলেকে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর অর্থই বা পেলেন কোথায় দরিদ্র পরিবারের এই সন্তান। যিনি এক সময় লজিং থেকে পড়াশোনা করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভোলা সদরের আলিনগর, সাচিয়া, সিফুলিয়া এবং চন্দ্র প্রসাদ এলাকায় ৪০৩৭/২০০০, ৪০৭৬/২০০৬, ৬৫৬০/০৬, ৫৪১৫/০৬ এবং ১৪৪১/০৮ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা মূল্যের একরের পর একর জমি ক্রয় করেছেন।

কিছু জমি তার স্ত্রী ও পোষ্যদের নামেও কেনা হয়েছে। এছাড়া ঢাকায় রয়েছে প্লট এবং ফ্ল্যাট। স্বর্ণের দোকানসহ ৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, বীমা খাতে বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগের খোঁজও পাওয়া গেছে। ব্যাংকেও আছে মোটা অংকের টাকা। ছেলে পড়াশোনা করে ঢাকার ব্র্যাক ইউনিভাসির্টিতে।

এখানে ৪ বছরের কোর্র্সে ব্যয় হওয়ার কথা ১০ লাখ ৩৩ হাজার ২০০ টাকা। প্রশ্ন উঠেছে সাকল্যে হাজার ত্রিশেক টাকা বেতন পাওয়া হোসেন শাহ এই ব্যয় কী করে মেটাচ্ছেন?

চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ভোলা জেলা আইনজীবী সমিতির প্রাক্তন সভাপতি অ্যাডভোকেট বশিরুল্লাহর করা লিখিত অভিযোগে জানা যায়, ‘পেশকার, সেরেস্তাদার, রেকর্ডকিপার এবং নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হোসেন শাহার বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই।

নিয়মিতই ঘুষের বিনিময়ে বিচার বিক্রি, অর্থের বিনিময়ে রেকর্ড দেয়া এবং নোটিশ জারির জন্য অর্থ আদায়ের কাজটি তিনি নিয়মিতই করতেন।

এছাড়া নানা অভিযোগে ২০০৭, ২০১০ এবং ২০১১ সালে ভোলা জেলা আইনজীবী সমিতি ৩ বার তার বিরুদ্ধে রেজুলেশন করে। ২০১১ সালে ভোলা সদর পারিবারিক আদালতের ২৬/২০০৭ নং মামলার নথি মোটা অংকের অর্থের বিনিয়ে গায়েবের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

পরে আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সিনিয়র সহকারী জজ আবদুর রহমান তদন্ত করে তাকে দায়ী করে রিপোর্ট দেন ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল। রহস্যজনক কারণে তার বিরদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

এর পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ৩৪ বছর ধরে ভোলা জেলা জজ আদালতে চাকরি করে যাওয়া হোসেন শাহর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা তদন্ত করেন ভোলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আতোয়ার রহমান। গত বছর ১৩ নভেম্বর রিপোর্ট জমা দেন তিনি।

৫৫ পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘হোসেন শাহ আপাদমস্তক অভ্যাসগত ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ। বিচারপ্রার্থীদের জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। রেকর্ডরুমের দায়িত্বে থাকাকালে ৫-২০ হাজার টাকায় রেকর্ড সরবরাহ করে সে। বদলি ও চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়েও কর্মচারীদের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। মাসিক ও সাপ্তাহিক হারে ঘুষ আদায়, নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।’ রিপোর্টের শেষে বলা হয়েছে, তার কারণে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, নাজির হোসেন শাহার ‘খুঁটির জোর’ অনেক বেশি। তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেই হয় চাকরিচ্যুতি, নয়তো বদলি। গত কয়েক বছরে এভাবে চাকরিচ্যুতির শিকার হয়েছেন কম করে হলেও ৪ জন কর্মচারী।

তার বিরুদ্ধে যিনি তদন্ত করেছেন সেই জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার আতোয়ার রহমানকে কাকতালীয়ভাবে হলেও ভোলা ছাড়তে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে করা অভিযোগে জানা যায়, ভোলা শহরের অভিজাত এলাকা কালীবাড়ি রোডে ভদ্রপাড়া নবী মসজিদের কাছে হোসেন শাহ তার স্ত্রী মোহসেনা ফাতিমার নামে ক্রয় করেছেন ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি। যার বাজার দর কোটি টাকার ওপর।

২০০৩ সালে যখন এই জমি তিনি ক্রয় করেন তখন তার বেতন ১০ হাজার টাকা। ওই জমিতে ৫ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ৩ তলা বাড়ি করা হয়েছে, যা খুবই আধুনিক। অভিযোগ রয়েছে এই বাড়িতে তার ব্যয় ৪ কোটি টাকার কম নয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হোসেন শাহ প্রথমেই সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বলেছেন, এসবই প্রতিপক্ষের অপ্রপচার। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রধান জেলা জজ আতোয়ার রহমানের কাছে আমার মোটা টাকার বিল পাওনা ছিল। আমি বিল চাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি আমার সাক্ষ্যও নেননি।

২০১১ সালে যে তদন্ত হয়েছে তা বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। যেসব দলিল এবং জমি কেনার কথা বলা হচ্ছে সেগুলো আমি আমার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে কিনেছি। আমার ছেলে ঢাকায় টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ চালায়। ভোলা শহরে আমার যে বাড়ি রয়েছে তা লোন করে করা। জমিও কিনেছি ৩৪ বছরের চাকরিজীবনে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে। জিপি ফান্ডের বিপরীতে ৫ লাখ এবং ২০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ রয়েছে।

এখনও আমার কাছে রড, সিমেন্টের দোকানদার টাকা পাবে। জিপি ফান্ডে ২৮ লাখ টাকা জমা থাকতে ব্যাংক লোন কেন নিলেন এবং এত কম বেতনের চাকরিতে ওই ফান্ডে এই বিপুল অংকের টাকা কী করে জমালেন জানতে চাইলে অবশ্য কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি হোসেন শাহ। কেবল বলেন, ‘এখন আমি মাসে ৫ হাজার টাকা জমা দেই জিপি ফান্ডে।’ তবে জিপি ফান্ড থেকে ঋণ বাবদ নেয়া টাকা এরই মধ্যে পরিশোধ করেছেন তিনি।

পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোলার বর্তমান জেলা ও দায়রা জজ মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘আমি এই জেলায় নতুন যোগদান করেছি। সবকিছু ভালো করে জানতে পারিনি। তবে সে যদি কোনো অন্যায় অপরাধ করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×