বাদলকে স্মরণ করে সংসদে প্রধানমন্ত্রী

‘তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আর শুনব না’

  সংসদ রিপোর্টার ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা শেখ হাসিনা জাসদ নেতা মাঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, তার মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আর শুনব না। তিনি বলেন, চলার পথে অনেক আপনজনকে হারিয়েছি, অনেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধেও তার বলিষ্ঠ অবদান রয়েছে। তিনি সব সময় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং শান্তি-সমৃদ্ধিতে বিশ্বাসী ছিলেন। সংসদে তার প্রত্যেকটা ভাষণই মনে একটা দাগ কেটে যেত। অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবেই তিনি কথা বলতেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য সবসময় তিনি সক্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুতে তার এলাকাবাসীর যেমন ক্ষতি হয়েছে, তেমনি রাজনীতিরও।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক মন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, সাবেক প্রধান হুইপ আ স ম ফিরোজ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, আজ (বৃহস্পতিবার) সকালেই মাঈনউদ্দীন খান বাদল চলে গেলেন। তার লাশ নিয়ে আসার জন্য এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমাদের হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছি। মরদেহ আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যার মধ্যে পৌঁছানোর কথা, হয়তো আগামীকাল (শুক্রবার) সকালের মধ্যে পৌঁছাবে।

তিনি বলেন, মাঈনউদ্দীন খান বাদল ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ তিনটা নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ছাত্র রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা যারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছি, আমরা যারা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি, এমনকি আইয়ুববিরোধী আন্দোলন থেকে ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাদলের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি জাসদে যোগ দেন। আমরা যখন ঐক্যজোট গঠন করি, আমাদের ঐক্যজোটের সঙ্গেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। কাজেই আন্দোলন-সংগ্রামের রাজপথে এবং এই সংসদে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

সংসদনেতা বলেন, রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ও প্রজ্ঞায় মাঈনউদ্দীন খান বাদল যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হল। তিনি বলেন, আমি সবসময় তার শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতাম। তিনি অসুস্থ ছিলেন। তার স্ত্রী মেসেজ পাঠিয়ে খবর দিতেন তিনি কী অবস্থায় আছেন। সকালে যখন খবর পেলাম, তখন একটা বিরাট ধাক্কা লেগেছিল। কারণ এটা আমি ভাবতেই পারিনি যে তিনি এভাবে চলে যাবেন। তার চলে যাওয়াটা মেনে নেয়া কঠিন; কিন্তু আমাদের মানতেই হয়। আমি তার শোকন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, অত্যন্ত বিনয়ী, বিচক্ষণ ও অনলবর্ষী বক্তা মাঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত, গভীরভাবে শোকাহত। সোয়াত জাহাজ থেকে পাক হানাদাররা অস্ত্র খালাস করছিল, তখন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদল আক্রমণ চালিয়ে সেই অস্ত্র লুটে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে দিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। সংসদেও তার সপ্রতিভ ক্ষুরধার বক্তব্য ও শব্দচয়নও ছিল চমৎকার। দেশের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরতেন। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা হল, তা কোনোদিন পূরণ হবে না।

আমির হোসেন আমু বলেন, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মাঈনউদ্দীন খান বাদল অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখে গেছেন। অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদল সংসদের ভেতর ও বাইরে একজন বলিষ্ঠ সুবক্তা ছিলেন। তার মৃত্যুতে রাজনীতির জন্য বিরাট একটা ক্ষতি হয়ে গেল।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, একদিন আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। ছাত্রজীবনে, স্কুল ও কলেজজীবনেও ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন মাঈনউদ্দীন খান বাদল। পরে জাসদে যোগ দিলেও অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তিনি চলে যাবেন ভাবতেও পারি না।

মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাঈনউদ্দীন খান বাদল একজন সুবক্তা, প্রখর চিন্তাবিদ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ১৪ দল গঠনে অন্যতম ভূমিকা পালন করে গেছেন প্রয়াত এই নেতা। অসুস্থ অবস্থায়ও সংসদে প্রাণবন্ত বক্তব্য দিয়েছেন। দেশপ্রেমিক এই রাজনীতিবিদের চলে যাওয়া দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

রাশেদ খান মেনন শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদারদের আতঙ্কের নাম ছিল মাঈনউদ্দীন খান বাদল। তার অকাল মৃত্যু পূরণ হওয়ার নয়।

হাসানুল হক ইনু বলেন, মাঈনউদ্দীন খান বাদল আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখেন। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণতান্ত্রিক প্রতিটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বীর এই মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, ব্রিটিশ ও কানাডিয়ান পার্লামেন্টে সংরক্ষিত হিসাব কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। তার অকাল মৃত্যুতে দেশের প্রথম সারির একজন রাজনীতিবিদকে হারালাম।

শাজাহান খান বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌ-কমান্ডোরা চারটি সমুদ্রবন্দরে পাকবাহিনীর অসংখ্য জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে। প্রয়াত মাঈনউদ্দীন খান বাদল এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছাত্রজীবন থেকে মাঈনউদ্দীন খান বাদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরিবারের চেয়েও এলাকার লোকজন সবসময় প্রাধান্য পেয়েছেন। তার স্ত্রীও দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত।

হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, একজন সুবক্তা, গুণী, বিচক্ষণ ও মহান মুক্তিযোদ্ধাকে আমরা হারালাম। পড়াশোনা করে সংসদে বক্তব্য রাখতেন। তার অভাব সত্যিই আমাদের ব্যথিত করেছে।

আ স ম ফিরোজ বলেন, সুবক্তা ও বিচক্ষণ নেতা ছিলেন মাঈনউদ্দীন খান বাদল। শুধু সংসদেই নয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনারে তার বক্তব্য দেশকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন নেতা ছিলেন তিনি। মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত চমৎকার।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×