সংসদ সদস্য মাঈনউদ্দীন খান বাদল আর নেই

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতার শোক

  যুগান্তর রিপোর্ট ও চট্টগ্রাম ব্যুরো ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সংসদ সদস্য মাঈনউদ্দীন খান বাদল আর নেই

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সংসদ সদস্য মাঈনউদ্দীন খান বাদল মারা গেছেন। ভারতের বেঙ্গালুরুতে নারায়ণ হৃদরোগ রিসার্চ ইন্সটিটিউট অ্যান্ড হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভোরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, নেতাকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। সর্বশেষ চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও জাসদ একাংশের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ।

মাঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাদলের অবদানের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় বলেন, বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে মাঈনউদ্দীন খান তার মতামত দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে তার (বাদল) অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পৃথক এক শোকবার্তায় মাঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদকে হারাল। প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এ নেতাকে জনগণ সবসময় মনে রাখবে।

জাসদ নেতা বাদলের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে তার দল জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

এক শোকবার্তায় তারা বলেন, মাঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারাল। বাদলের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হারুন-অর-রশিদ, সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া পৃথক শোক জানিয়েছেন। এছাড়া ১৪ দলীয় জোট, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট শোক প্রকাশ করেছে।

মাঈনউদ্দীন খান বাদল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ’৬০-এর দশকে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস প্রতিরোধের অন্যতম নেতৃত্বদাতা তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর জাসদ হয়ে বাসদ ও পরে আবারও জাসদে যোগ দেন। ১২ মার্চ ২০১৬ সালে জাসদের জাতীয় কাউন্সিলে আবার দুই ভাগ হয়।

হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন অংশটি ইসির স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশ জাসদ নামে আলাদা দলের অংশটি স্বীকৃতি পায়নি। এ অংশের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন বাদল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠনেও বাদলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।

দেখা হল না কালুরঘাট সেতু : স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত বাদল সংসদ ও সংসদের বাইরে নানা বক্তব্য দিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচিত হন। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীতে সেতু নির্মাণের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তিনি। বারবার সেতুটি নির্মাণের দাবি জানিয়েও সাড়া না পাওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘোষণা দেন, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার কালুরঘাট সেতু নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের ঘোষণা আসে। কিন্তু কাজ শুরুর আগেই চিরবিদায় নিলেন বাদল।

আজ আসবে মরদেহ, শনিবার দাফন : বাদলের ব্যক্তিগত সহকারী এসএম হাবিব বাবু যুগান্তরকে জানান, বেঙ্গালুরু থেকে আজ সকালে বাদলের লাশ ঢাকায় আনা হবে। এদিন দুপুরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরদিন তার লাশ চট্টগ্রাম নেয়া হবে।

নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে জানাজা এবং সেদিনই বোয়ালখালীর সারওয়াতলীর গ্রামের বাড়িতে সর্বশেষ জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হবে।

শোকার্ত চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন : সংসদ সদস্য বাদলের মৃত্যুতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এক বিবৃতিতে বলেন, বাদলের ইন্তেকালে জাতি একজন কৃতী রাজনীতিবিদকে হারাল।

অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি লেখেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় নেতা, অনলবর্ষী বক্তা, সংসদ সদস্য, বীর চট্টলার গৌরব আজ না ফেরার দেশে। মনে হচ্ছে যেন আবারও পিতৃহারা হলাম। চীন সফরে থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এক শোকবার্তায় বলেন, বাদল ভাইয়ের মৃত্যুতে চট্টগ্রামবাসী একজন সাহসী সন্তানকে হারাল।

বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, দুই বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন বাদল। হার্টেও সমস্যা ছিল তার। রুটিন চেকআপের অংশ হিসেবে ১৮ অক্টোবর ভারতে যান বাদল। সেখানে আবারও মাইল্ড স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাকে বেঙ্গালুরুর ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেঠি ও নিউরো সার্জন ড. বিক্রম সিংয়ের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসায় মাঝে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। হাসপাতালে মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন বাদলের সহধর্মিণী সেলিনা বাদল।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটি বিশেষ দল বাদলের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করছে। সকালে এই রাজনীতিকের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, উপজেলা প্রশাসন, পৌর প্রশাসন, বোয়ালখালী প্রেস ক্লাব, উপজেলা আওয়ামী লীগ, জাসদ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার পক্ষ থেকে শোক জানানো হয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×