সাতক্ষীরা জেলা আ’লীগ : ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ তালিকা তৈরি শুরু

এ প্রক্রিয়া নিয়ে নেতাদের মধ্যে আছে মতবিরোধ

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লোগো

সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। জেলা ও উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে চিহ্নিত করার এ কাজ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

‘অনুপ্রবেশকারীদের’ অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন। কেউ কেউ নিচ্ছেন অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।

আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে যে বিচ্ছিন্ন তালিকা পাওয়া গেছে তাতে অনেকের নামই উঠে এসেছে। তবে এ তালিকা নিয়ে মতবিরোধ আছে। দলটির কোনো কোনো নেতা দলে আগতদের অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিতে নারাজ।

তাদের মতে যাদের অনুপ্রবেশকারী তকমা দেয়া হচ্ছে তারা চোরাপথে কিংবা নিজের পূর্ব দলীয় পরিচয় গোপন করে আওয়ামী লীগে আসেননি।

এদিকে অন্য দল থেকে আগতরাও নিজেদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে স্বীকার করে নিতে নারাজ। তারা বলেছেন, ‘আমরা দলত্যাগ করেছি। আগের দলের মতাদর্শ ত্যাগ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আওয়ামী লীগ অথবা অঙ্গ সংগঠনে যোগদান করেছি।

এখন আমরা মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগার। দল পরিবর্তন করা কি অপরাধ? এখনও আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, অতীতে তারা ভিন্ন আদর্শের রাজনীতি করেছেন।

তবে যারা সহিংসতা, নাশকতা, খুন-খারাবি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তাদের বিষয়টি ভিন্ন। তাদের অনুপ্রবেশকারী বলা যেতে পারে। কিন্তু আমরা অনুপ্রবেশকারী নই।’

তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন- শ্যামনগর উপজেলার কৈখালি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক জামায়াত নেতা বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি রেজাউল করিম, সাবেক জামায়াত নেতা ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি বজলুর রশীদ ও শ্রমিক দলের সাবেক নেতা বর্তমানে বুড়িগোয়ালিনী ইউপি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি গোলাম মোস্তফা।

এ উপজেলার কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান রয়েছেন যারা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দারের হাত ধরে বাগেরহাটের সংসদ সদস্য শেখ হেলালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।

তাদের মধ্যে আছেন- বিএনপি নেতা আকবর হোসেন, আবুল কাসেম, জেলা বিএনপি নেতা ইমরুল হায়দার, উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারি সাদেকুর রহমান সাদেম এবং কাশিমারি ইউপি চেয়ারম্যান সাবেক জামায়াত নেতা আবদুর রউফ।

২০১৪ ও ২০১৮-এর নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দার ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

তার ভাই বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট জহুরুল হায়দার ছাত্রসমাজের নেতা ছিলেন। তিনি এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। 

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মোশা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য।

শিবপুর ইউনিয়নের আবুল কালাম কখনও বিএনপি, কখনও জামায়াত, আবার কখনও জাতীয় পার্টি করে এখন ইউনিয়ন শ্রমিক লীগ নেতা।

সাতক্ষীরা সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলসের সাবেক সিবিএ সভাপতি ও শ্রমিক দল সভাপতি আবদুল্লাহ সরদার এখন জেলা শ্রমিক লীগের যুগ্ম সম্পাদক। বর্তমানে জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মহিতুল আলম মাহি গণফোরাম ও ছাত্র সমাজের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ডা. মুনসুর আহমেদ জাসদ থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন ১৯৯৬ সালে। ঘোনা ইউপি যুবদলের সহ-সভাপতি অরুন ঘোষ বর্তমানে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি। কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া  ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মফে আগে বিএনপি করতেন।

বর্তমানে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি। সরদার জাকির হোসেন ছাত্রসমাজ থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। ছাত্রশিবিরের এক সময়ের দুর্ধর্ষ ক্যাডার ডা. হাদিউজ্জামান আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক হয়েছেন।  

কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আসাদুর রহমান সেলিম বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এখন জেলা পরিষদ সদস্য।

চাম্পাফুল ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন বর্তমানে আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সভাপতি। তিনি ছিলেন উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি। এ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ ছিলেন বিএনপি নেতা।

এখন তিনি আওয়ামী লীগ নেতা। নলতা ইউপির সাবেক বিএনপি নেতা আনিসুজ্জামান খোকন এখন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি। 

দেবহাটা উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল গনি জাসদ থেকে জাতীয় পার্টি হয়ে এখন তিনি আওয়ামী লীগ নেতা। একই উপজেলার ইয়ামিন মোড়ল উপজেলা যুবদলের শীর্ষ নেতা ছিলেন। এখন তিনি উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি। 

আশাশুনির শ্রীউলা ইউপির তৌশিকে কাইফু ছাত্রদলের ইউনিয়ন সম্পাদকের পদ ছেড়ে এখন উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

আশাশুনি উপজেলা চেয়ারম্যান এবিএম মোস্তাকিম ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা। তিনি ২০০৩ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও এ উপজেলার পরপর তিনবারের চেয়ারম্যান।

একই উপজেলার শোভনালী ইউপির শাহাদাত হোসেন বিএনপি সভাপতির পদ ছেড়ে আওয়ামী লীগে, আক্তার হোসেন শাহীন বিএনপি উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যপদ ছেড়ে আওয়ামী লীগে, আয়েশা আক্তার বিএনপি ছেড়ে মহিলা আওয়ামী লীগে, জিয়াউর রহমান জিয়া বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এবং রেজাউল করিম বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টার পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

এছাড়া দরগাপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ মিরাজ আলী ছিলেন বিএনপি নেতা। বর্তমানে তিনি ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

এছাড়া আশাশুনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম কখনও বাম দল, কখনও বিএনপি আবার কখনও জাতীয় পার্টি করেছেন।

জামায়াতসংশ্লিষ্ট তুহিন ও বিএনপির শাহিন এখন জেলা তাঁতী লীগের শীর্ষ পদে রয়েছেন। এছাড়া ওলামা লীগে ঢুকে পড়েছেন জামায়াতদলীয় বহু নেতাকর্মী।

জেলা আইনজীবী সমিতির বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম পাওয়া গেছে যারা আগে বিএনপি অথবা জাতীয় পার্টি করতেন। এখন তারা আওয়ামী লীগে নাম লিখিয়েছেন। 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরির কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি।

তবে জানতে পেরেছি বিভিন্ন সংস্থা এ ধরনের তালিকা তৈরি করছে। এমনকি কেন্দ্রীয়ভাবে বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে এমন তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কে বা কারা অনুপ্রবেশকারী এটা বলা কঠিন।

ভিন্নমতাদর্শ ত্যাগ করে আওয়ামী লীগ অথবা অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে যারা যোগদান করেছেন তাদের খসড়া তালিকা জেলা দলের হাতে থাকলেও তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। 

জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, ‘যাদের অনুপ্রবেশকারী তকমা দেয়া হচ্ছে তারা চোরাপথে কিংবা নিজের পূর্ব দলীয় পরিচয় গোপন করেননি। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আগের দলের আদর্শ ত্যাগ করায় আমরা তাদের ফুল দিয়ে প্রকাশ্যে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছি। এরপর থেকে তারা দলের হয়ে দায়িত্ব পালনও করছেন। কেউ কেউ পদও পেয়েছেন। এ অবস্থায় কিভাবে আমরা তাদের অনুপ্রবেশকারী বলব।’