কিউলেক্স মশার উপদ্রব বাড়ছেই

কামড়ে গোদ ও স্নায়ুতন্ত্রের রোগ হয় * ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার পর ঢাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গতিহীন

  মতিন আব্দুল্লাহ ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মশা

এডিস মশার প্রকোপ কমতে না কমতেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে কিউলেক্স মশা। রাতদিন এসব মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রাজধানীবাসী। দেশের অন্যান্য স্থানেও বেড়েছে এর উপদ্রব। তবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন বলতে গেলে ঘুমিয়ে দিন পার করছে।

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিউলেক্স মশা থেকে ফাইলেরিয়াসিস (গোদ রোগ) ও ওয়েস্ট নাইল (একধরনের জ্বর) ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস সাধারণত কাকজাতীয় পাখির শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

এ ভাইরাসে সংক্রমিত মশা কামড়ালে মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। এ ভাইরাসের কারণে স্নায়ুতন্ত্রের রোগ হয়ে থাকে, যার কারণে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। আক্রান্ত মানুষের ৮০ শতাংশের মধ্যে রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। আক্রান্ত ঘোড়ায় এ রোগের তীব্রতা বেশি দেখা দেয় এবং ঘোড়া মারা যায়।

এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কিছুদিন ব্যাপক তোড়জোড় ছিল। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে মশক নিধন তৎপরতা প্রায় ৮০ ভাগ গুটিয়ে নিয়েছে তারা। স্বল্পসংখ্যক মশক নিধন কর্মী দিয়ে নগরবাসীর মনভোলানো কিছু কার্যক্রম সচল রেখেছে। যদিও এখনও প্রতিদিন রাজধানীতে অন্তত ৩০ জন লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে।

ডেঙ্গু প্রায় মহামারী পর্যায়ে গেলে বিশেষজ্ঞরা দুই সিটি কর্পোরেশনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন- যেনতেনভাবে কাজ করলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলারও পরামর্শ ছিল।

দুই সিটির কর্তাব্যক্তিরা সেসময় এ ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ দেখান। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসার পরপর তারা ভুলে গেছেন সবকিছু। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় দুই মেয়রকে বিভিন্ন ইস্যুতে জনসভা ও গণসংযোগে ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। নগরাসীকে সেবা দেয়ার কথা বলতে গেলে ভুলেই গেছেন তারা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের একটি এলাকা ‘বছিলা সিটি’। এখানকার ফিরোজা বাশার স্কুলের শিক্ষার্থী আবদুর নূরের মা বিলকিছ খাতুন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘খুব উপদ্রব হয়েছে। আমরা বাসায় কয়েল জ্বালিয়ে বা স্প্রে করে কোনো রকম মশার কামড় থেকে বেঁচে থাকি।

কিন্তু বাইরে কীভাবে বাঁচব।’ ছেলের চোখ ও পায়ে পাঁচটি মশার কামড় দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখুন স্কুলে আসার পর এই মশাগুলো কামড়াল। মশার কামড়ে বিভিন্ন ধরনের অসুখ হতে পারে শুনছি। সিটি কর্পোরেশন মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে বলে টিভিতে দেখছি, কিন্তু এ এলাকায় কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না আমাদের।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) হাজারীবাগের কোম্পানীঘাট মসজিদ মার্কেট এলাকার মানুষের মুখেও একই কথা। মুদি দোকানদার রুবেল আহমেদ বলেন, ‘এ এলাকায় মশা নিধনে ২-৩ মাসের মধ্যে কোনো ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। সারাদিনই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ থাকি আমরা, তবে সন্ধ্যা নামলে রীতিমতো মশার মিছিল শুরু হয়ে যায়।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে ডিএনসিসির ২৭০ জনবল রয়েছে। নতুন করে ৫৪ ওয়ার্ডে ১০ জন করে জনবল নিয়োগ দেয়ার কার্যক্রম চলমান। আধুনিকমানের নতুন ২৩৮টি ফগার মেশিন, ২০টি মিক্সড ব্লেয়ারসহ বেশকিছু সরঞ্জামাদি কেনা হয়েছে। এছাড়া একজন কীটতত্ত্ববিদকে প্রধান করে ১০ জন শিক্ষানবিশ কীটতত্ত্ববিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিমের সমন্বয়ে ডিএনসিসি নিজ এলাকায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

সেখান থেকে তারা জানতে পেরেছেন, ৫৪ ওয়ার্ডের ৫৪০টি স্থানে কিউলেক্স মশা প্রজননের ৬২০টি হটস্পট রয়েছে। ডিএনসিসি সূত্রের দাবি, এসব হটস্পটসহ ডিএনসিসি এলাকার সার্বিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

শনিবার ডিএনসিসি মেয়র মশক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। বিশেষ এ কর্মসূচি চলবে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত। চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসির মশক নিধন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, রুটিন মশক নিয়ন্ত্রণে ৪০০ জনবল রয়েছে। নতুন করে কিছু জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে। সে জনবল এলে কাজের গতি বাড়বে। নতুন করে ২৫০টি ফগার মেশিন কেনা হয়েছে। সূত্রের দাবি, একদফা বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এটা অনেকটা নীরবে নীরবে পরিচালিত হয়েছে।

কিছুদিনের মধ্যে আবারও বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে ডিএসসিসি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ডিএসসিসির মশক নিধন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

গত অর্থবছরের তুলনায় দুই সিটি কর্পোরেশনের বাজেট বাড়ানো হলেও মশক নিধনে কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়ায় দুই সিটির মেয়র, কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে নগরবাসীর। তারা দ্রুত, কার্যকর ও জোরালো ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, ‘মশক নিয়ন্ত্রণে সুফল পেতে হলে ‘সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঢাকঢোল পিটিয়ে লোক দেখানো বা যেনতেনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করলে সেখান থেকে তেমন সুফল মিলবে না।’

তিনি আরও বলেন, কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়াসিস ও ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফাইলেরিয়াসিসে আক্রান্ত হতে হলে ১০ হাজারবার কিউলেক্স মশার কামড় খেতে হবে। আর যে কোনো মশার শরীরে ওয়েস্ট লাইন ভাইরাস থাকলে, ওই মশা কামড়ালেই চিকুনগুনিয়ার মতো একধরনের জ্বরে আক্রান্ত হবে মানুষ।

কবিরুল বাশার বলেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) দাবি করেছে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত একজন রোগী পেয়েছেন তারা। এটা ছড়িয়ে গেলে কিউলেক্স মশাও বড় ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ ছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ ব্যাপার হবে।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোমিনুর রহমান মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘কিউলেক্স মশক নিয়ন্ত্রণে মশার লার্ভা ও উড়ন্ত মশক নিধনে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে, সেসব ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শরীফ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ডিএসসিসি মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে একদফা বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। শিগগিরই নতুন করে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করা হবে।’

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৪ ২৬
বিশ্ব ৯,১৭,৮৯২১,৯১,৮২৬৪৬,০৬১
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×