বিনিয়োগ কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতিতে ৬ চ্যালেঞ্জ

ঢাকায় শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের আয় মোট আয়ের ৪১.১৯ শতাংশ * রাজধানীর বায়ুদূষণে প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমছে * বৈষম্য প্রবৃদ্ধির ঢেউ ক্ষতিগ্রস্ত করছে -পরিকল্পনামন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতি
অর্থনীতি। ছবি: যুগান্তর

বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ দেশের অর্থনীতিতে ৬ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সরকারি বিনিয়োগ কিছুটা হলেও বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে স্থবির।

এ ছাড়া অন্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- বৈষম্য বৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি না হওয়া, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষাকে কাজে লাগানো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এখন থেকেই সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা জরুরি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) দুই দিনব্যাপী বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের শেষ দিনের আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সম্মেলনের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ঢাকায় মাসিক মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট আয়ের ৪১ দশমিক ১৯ শতাংশ।

আর সর্বনিম্নে থাকা ১০ শতাংশের মাথাপিছু আয় মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ। ফলে আয়বৈষম্য বাড়ছে। অপর এক গবেষণায় বলা হয়েছে রাজধানীর বাতাসে অতিমাত্রার ব্ল্যাক কার্বনের কারণে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল কমছে। সেই সঙ্গে মোট মৃত্যুর একটি বড় অংশই হচ্ছে এ সম্পর্কিত রোগের কারণে।

সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কেএএস মুর্শিদের সভাপতিত্বে আলোচক ছিলেন আইএলওর সাবেক স্পেশাল অ্যাডভাইজার ড. রিজওয়ানুল ইসলাম, পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার, বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এবং বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন।

সম্মেলনে ‘এ গ্লামপেস টু লিভস অব দ্য পিপল ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের মাসিক মাথাপিছু আয় মোট আয়ের ৪১ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ ছাড়া সর্বনিু ১০ শতাংশ মানুষের আয় মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ। সর্বনিু ৫০ শতাংশ মানুষের আয় ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর আরবান স্ট্র্যাটেজির চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যা যানজট। এর পরেই রয়েছে যথাক্রমে বায়ুদূষণ, বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তি, রাস্তার খারাপ অবস্থা, লোডশেডিং, ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহ না থাকা, নিরাপত্তা এবং ইভটিজিং।

বলা হয় গত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকায় এসেছে কিশোরগঞ্জ থেকে। এরপর রয়েছে বরিশাল, ময়মনসিংহ, ভোলা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, রংপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী এবং সবচেয়ে কম মানুষ এসেছে টাঙ্গাইল থেকে। এ ছাড়া গত ১০ বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকায় এসেছে বরিশাল থেকে। এরপর রয়েছে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ভোলা এবং সবচেয়ে কম মানুষ এসেছে শরীয়তপুর থেকে।

‘অ্যাটমোসফেয়ারিক পার্টিকুলেট ম্যাটার অ্যান্ড ব্ল্যাক কার্বন ইন ঢাকা সিটি এ কন্ট্রিবিউটর টু ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় বছরে যেসব মানুষ মারা যায় তার মধ্যে বায়ুদূষণজনিত অসংক্রামক রোগে মারা যাচ্ছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে শ্বাসকষ্টে মারা যায় ৮ শতাংশ, কিডনি রোগে ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ফুসফুস রোগে মারা যাচ্ছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।

আরও বলা হয়, ঢাকার বর্তমানে বায়ুতে ব্ল্যাক কার্বনের উপস্থিতি রয়েছে ৬৫ মাইক্রো গ্রাম কিউবিক মিটার। কিন্তু সহনীয় মাত্রার এ কার্বন থাকা প্রয়োজন ২৫ মাইক্রো গ্রাম কিউবিক মিটার। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু থেকে প্রায় ২২ মাসের বেশি কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতে কমেছে প্রায় ২০ মাস।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমএ মান্নান বলেছেন, বৈষম্যের কারণে প্রবৃদ্ধির ঢেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে প্রবৃদ্ধি একটি উপভোগ্য বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বৈষম্যের বিষয়টি আলোচনায় আসছে। বৈষম্য প্রবৃদ্ধিতে ছায়া ফেলতে পারে কি না, সে বিষয়ে চিন্তা রয়েছে। প্রবৃদ্ধির সুফল সামাজিকভাবে সবার কাছে যাচ্ছে না।

ভর্তুকি, কর রেয়াতসহ সরকারের বিভিন্ন সুবিধা বিতরণের সমস্যা আছে। তিনি বলেন, বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। এখানে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। কীভাবে ফাঁকফোকর বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে আপনারা পরামর্শ দেবেন। মন্ত্রী আরও বলেন, সুশাসনের কোনো মাপকাঠি নেই। আপনারা বলেন স্পেস দিতে হবে।

কিন্তু কে কাকে স্পেস দেবে? আমি তো আমার স্পেস নিয়ে বসে আছি। আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরান। না হলে আমি নিজে স্পেস ছেড়ে দেব- এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কেননা জনগণ আমাকে স্পেস দিয়েছে। এর মধ্যে কেউ নিয়ম অনুযায়ী স্পেস নিলে কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈষম্য বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে দেশের অর্থনীতিতে। শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সাম্যের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি হওয়াটাই বড় কথা। দেশে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি হলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে বিনিয়োগ। কিন্তু এ জন্য পুঁজি সরবরাহ প্রয়োজন। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ এখনও স্থবির। ফলে বিনিয়োগ হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান হচ্ছে না।

যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এ জন্য মানব পুঁজি গঠনে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। বৈষম্য ব্যাপক হারে বাড়ছে। প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা না গেলে দেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে।

ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর আগামী পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে আবার শোভন কর্মসংস্থান তৈরি আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশের প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়ানো সম্ভব যদি নীতি ও পরিকল্পনা ঠিকভাবে করা যায়। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ইতিমধ্যে দেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এগুলো হয়েছে বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের কারণে। শিল্প, কৃষি ও ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন খাতে কিছু না কিছু সংস্কার হয়েছে। যার ফল পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু এখনও ধরে রাখতে হলে পরিবহন, তথ্য প্রযুক্তি ও শিল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা এবং কাঠামোগত সংস্কার চলমান রাখা জরুরি। তিনি বলেন, সরকার যেভাবে চলছে সেখানে অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত।

ফলে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার যে সরকার আছে এতে উন্নয়নের বড় সুযোগও রয়েছে। অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তিসহ বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হলে উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হবে। যাতে এসব প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন ২০৪১ সালে উন্নত দেশে যেতে হলে মূল দুটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। একটি প্রবৃদ্ধি অর্জন। প্রবৃদ্ধি হবে উন্নয়নের চাকা আর এ চাকা সচল রাখতে চালক হবে সুশাসন।

ড. বিনায়ক সেন বলেন, আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন করতেই হবে। এ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আগামী ১০ বছর যদি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায় তাহলে দারিদ্র্য নিরসন সম্ভব।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×