দুই মাস পর সচল হচ্ছে বুয়েট, ক্লাসে ফেরার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের

  ঢাবি প্রতিনিধি ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুয়েট

দীর্ঘ দুই মাসের অচলাবস্থা শেষে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ফের সচল হয়েছে। বুয়েট কর্তৃপক্ষ তিন দফা দাবি পূরণ করায় আন্দোলন থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী। পাশাপাশি ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রমে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

২৮ ডিসেম্বর থেকে টার্ম পরীক্ষায় বসতেও সম্মতি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুরু থেকেই সচেষ্ট থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বুধবার বিকালে বুয়েটের শহীদ মিনারের পাদদেশে সংবাদ সম্মেলন করে এসব কথা জানান তারা। বুয়েট কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি মেনে নেয়ার পর নিজেদের অবস্থান জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম মুখপাত্র ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মাহমুদুর রহমান সায়েম। বক্তব্য রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আরেক মুখপাত্র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অন্তরা মাধুরী তিথী।

সার্বিক বিষয়ে বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের সবগুলো দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। সর্বশেষ ছাত্র রাজনীতি ও র‌্যাগিং নিষিদ্ধের একটি সারাংশ আমরা প্রকাশ করেছি। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরে যাবে। সবার সহযোগিতায় আমরা কাজগুলো করতে পেরেছি।

শনিবার একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠকে ২৮ ডিসেম্বরের পরীক্ষার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। তিনি আরও বলেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা নোটিশ আকারে প্রকাশ করেছি। এটি অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

৬ অক্টোবর বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এরপর থেকে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ১৪ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে তিনটি দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

যা বাস্তবায়নে ৩ সপ্তাহ সময় নেয় বুয়েট কর্তৃপক্ষ। দাবিগুলো ছিল- মামলার অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কার, বুয়েটের আহসানউল্লাহ, তিতুমীর ও সোহরাওয়ার্দী হলে আগে ঘটে যাওয়া র‌্যাগিংয়ের ঘটনাগুলোয় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি, সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি এবং র‌্যাগিংয়ের জন্য সুস্পষ্টভাবে বিভিন্ন ক্যাটাগরি ভাগ করে শাস্তির নীতিমালা প্রণয়ন করার পর একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে অনুমোদন করে বুয়েটের অধ্যাদেশে সংযোজনের জন্য পরবর্তী ধাপগুলোয় পাঠানো।

শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ২১ নভেম্বর আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৬ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং ৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে। ২৭ নভেম্বর র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় ৯ জনকে হল থেকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সর্বশেষ সোমবার রাতে র‌্যাগিং ও সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হলে শিক্ষার্থীদের স্থায়ী বহিষ্কারসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রেখে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এর পরপরই নিরসন হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির অচলাবস্থার। শিক্ষার্থীদের তিন দাবির মধ্যে শুধু তিতুমীর হলে আগের র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি বাকি রয়েছে।

এটি হলেই শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তিতুমীর হলে র‌্যাগিংয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদুর রহমান লিখিত বক্তব্যে বলেন, আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা পরদিন ৮ অক্টোবর থেকে হত্যার বিচার এবং একই সঙ্গে একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিতের দাবিতে প্রথমে আট দফা ও পরে সংশোধিত দশ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু করি।

এর মধ্যে ১৫ অক্টোবর বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে ভর্তি-ইচ্ছুকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে আমাদের আন্দোলন দুই দিনের জন্য শিথিল করি এবং আন্দোলনের ৯ দিনের মাথায় ১৬ অক্টোবর গণশপথের মধ্য দিয়ে মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন তুলে নেই। আমাদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে কোনো অপশক্তি যাতে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে না পারে এবং একই সঙ্গে বুয়েট প্রশাসন যাতে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে সে জন্যই মূলত মাঠপর্যায়ের আন্দোলন থেকে সরে আসা হয়।

এরপর আমরা নিয়মিত বুয়েট প্রশাসনের কাছ থেকে দাবিগুলোর অগ্রগতির আপডেট নিতে থাকি। এর মধ্যে তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত নিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে ১৩ নভেম্বর আবরার হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে। প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে শুরু থেকেই সচেষ্ট ছিলেন। এজন্য তাকে আমরা আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে আইনমন্ত্রী মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেয়ার ব্যাপারে জানিয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ২ নভেম্বর ভিসির সঙ্গে ছাত্রকল্যাণ পরিদফতরের পরিচালক ও বিভিন্ন অনুষদের ডিন উপস্থিতিতে আমরা সভা করে বুয়েটকে দ্রুত সচল করার জন্য আমরা সবশেষে শুধু তিনটি পয়েন্টের কথা বলি এবং এ তিনটি পয়েন্টের প্রথম দুটি মেনে নেয়া হলে আসন্ন টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ নেয়া হবে এবং তৃতীয়টি টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর অন্তত এক সপ্তাহ আগে মেনে নেয়া হলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা হবে বলে জানাই।

এরপর ২১ নভেম্বর বুয়েট প্রশাসন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ২৬ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে এবং ছয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে একাডেমিক বহিষ্কার করে, যা আমাদের তিনটি পয়েন্টের প্রথম পয়েন্ট ছিল। এরপর ২৭ নভেম্বর বুয়েট কর্তৃপক্ষ আহসানউল্লা হল ও সোহরাওয়ার্দী হলে আগে ঘটে যাওয়া

র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তি দেয়, যা আমাদের দেয়া দ্বিতীয় পয়েন্ট ছিল। তিতুমীর হলের র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় পুনরায় তদন্তের প্রয়োজন হওয়ায় এটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে আরও সময় প্রয়োজন এবং আজকে এ ব্যাপারে প্রশাসনের সভা আছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।

বুয়েট শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, যেহেতু তাদের দুটি দাবি প্রশাসন মেনে নিয়েছে, তাই তারা ২৭ নভেম্বর পরীক্ষার তারিখের ব্যাপারে বুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, রেজিস্ট্রার, সব অনুষদের ডিনদের উপস্থিতিতে ভিসি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সময় চেয়ে ২৯ ডিসেম্বর পরীক্ষা শুরু করার কথা বলেন। তখন ভিসি ২৮ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষা শুরু করার অনুরোধ করলে তারা তাতে সম্মত হন।

সর্বশেষ ২ ডিসেম্বর র‌্যাগিং ও সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে তার শাস্তির নীতিমালা বিষয়ে বুয়েট প্রশাসন একটি নোটিশ প্রকাশ করে এবং আজ সকালে এ নোটিশ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানায়। একই সঙ্গে এখন থেকে নবাগত শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোড অব কনডাক্ট জানিয়ে অঙ্গীকার নেয়ার পরিকল্পনা আছে বলে শিক্ষকেরা তাদের জানান।

তখন একটি সুস্থ ও নিরাপদ বুয়েটের স্বার্থে বুয়েটের বর্তমান শিক্ষার্থীরাও প্রয়োজনে এমন অঙ্গীকারনামা দিতে সম্মত আছেন বলে তারা জানিয়ে আসেন। প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যেই তিনটি দাবি মেনে নেয়ায় বুয়েট প্রশাসনকে ধন্যবান জানিয়ে তাদের দেয়া রায় মেনে নিয়ে তারা আন্দোলনের সমাপ্তি টানছেন। বুয়েট প্রশাসন আবরার ফাহাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে সচেষ্ট হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনে শক্তি জোগানোয় বুয়েটের সব শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীসহ যারা আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র মাহমুদুর রহমান সায়েম। তিনি বলেন, আমাদের এ আন্দোলন শুরু থেকেই এ ক্যাম্পাসের সব সাধারণ শিক্ষার্থীর আন্দোলন ছিল।

এ আন্দোলনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সবার উপস্থিতিতে নেয়া হয়েছে, কারও একক সিদ্ধান্তে কোনো কাজ করা হয়নি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বহিরাগত অপশক্তির প্রভাব দমনের জন্য আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা সর্বদা সচেষ্ট ছিলাম। আমরা চাই আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হোক।

ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জেরে খুন হন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। চুক্তির বিরোধিতা করে ৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর পরদিন ৬ অক্টোবর রাতে শিবির সন্দেহে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ২৫ জনকে আসামি করে ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ। আসামি ২৫ জনের মধ্যে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

তদন্ত শেষে পুলিশ বলেছে, আবরারকে হত্যায় সরাসরি যুক্ত ছিল ১১ জন। তারাই আবরারকে কয়েক দফায় মারধর করে। বাকি ১৪ জন বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। অভিযোগপত্রভুক্ত ২৫ আসামির মধ্যে ২১ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২১ জনের মধ্যে ১৬ জনের নাম আবরারের বাবার করা হত্যা মামলার এজাহারে আছে।

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

আরও
আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১২৩ ৩৩ ১২
বিশ্ব ১৩,৪৬,৯৭৪ ২,৭৮,৬৯৮ ৭৪,৭০২
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×