কাউন্সিলর নির্বাচন: বায়েজিদে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে মামলার মিশন!

৬ মাসে ৩০ মামলায় ঘুরে ফিরে একই আসামি * ভুয়া ভিকটিম সাজিয়েও করা হচ্ছে মামলা

  চট্টগ্রাম ব্যুরো ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচন ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মিথ্যা মামলার মিশনে নেমেছে একটি পক্ষ! এরই মধ্যে অন্তত ৩০টি মামলায় ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ৪০-৫০ জন নেতাকর্মী আসামি হয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছেন। এমনও মামলা আছে যাকে ভিকটিম সাজানো হয়েছে তিনি নিজেই জানেন মামলা হওয়ার বিষয়। পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থেকেও মামলার আসামি হতে হয়েছে কাউকে কাউকে।

বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে হাত করেই প্রতিপক্ষ এ ধরনের মিথ্যা মামলায় হয়রানির মিশন বাস্তবায়ন করছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। মামলার আসামিদের বেশিরভাগই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি মামলায় প্রধান আসামি হওয়ার নজিরও রয়েছে চন্দনাইশ থানা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ওজির আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি দিদারুল আলম চৌধুরীর। এ ধরনের একটি মামলায় ভিকটিম নিজেই আদালতে এফিডেভিড দিয়ে বলেছেন, দিদারুল আলম চৌধুরী বা অন্য কারও দ্বারা তিনি আক্রান্ত হননি। তাকে ভিকটিম সাজিয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় ১৫০ জনের বিরুদ্ধে যে মামলা (নম্বর-১৬ (১১)১৯) করা হয়েছে ওই মামলাটি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচন করার কথা ছিল যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান বাদলের। কিন্তু আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচন করায় তার নির্দেশে কাউন্সিলর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তারই ঘনিষ্ঠ যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান বাদল। তার পরিবর্তে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ আহমদ চৌধুরী নির্বাচন করে সামান্য ভোটের ব্যবধানে সাহেদ ইকবাল বাবুর কাছে হেরে যান।

যদিও নির্বাচন কমিশনকে ‘ম্যানেজড’ করে ফরিদ আহমদ চৌধুরীকে হারানো হয়েছে বলে দাবি তার (ফরিদ আহমদ)। ওই নির্বাচনের এক বছর না যেতেই ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর খুন হন মেহেদী হাসান বাদল।

নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চল তথা বায়েজিদে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণকারী বাদল মারা যাওয়ার পর রাজনীতি দেখভাল করেন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম চৌধুরী। সূত্র জানায়, শিবির ও জঙ্গিবিরোধী অবস্থানের কারণে ২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে শিবিরের হাতে এইট মার্ডার সংঘটিত হয়। ওই সময় মেহেদী হাসান বাদল টার্গেট থাকলেও ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। কিন্তু মারা যান ৭ ছাত্রলীগ-নেতাকর্মীসহ ৮ জন। যদিও ১৫ বছর পর এসে নিজ দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপের হাতেই খুন হন বাদল।

সূত্র জানায়, আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জালালাবাদ ওয়ার্ড থেকে আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন কাউন্সিলর প্রার্থী হতে তৎপরতা শুরু করেন। মূলত এ কারণেই প্রতিপক্ষ গ্রুপটি মহিউদ্দিন ও তার অনুসারীদের ঘায়েল করতে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার-প্রোপাগান্ডা চালানো ছাড়াও মিথ্যা মামলা দায়ের করে এলাকাছাড়া করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম চৌধুরী অভিযোগ করেন, ৬ মাসে তিনিসহ তাদের ৪০-৫০ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়েছে। কখনও থানায় কখনও আদালতে এসব মামলা হয়েছে। ওসি আতাউর রহমান খন্দকারের আমলে এসব মামলা হয়। বাংলাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে বাজার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা করা হয়। গুলিতে আহত হয়ে পঙ্গু অবস্থায় বাসায় পড়ে থাকার পরও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেয়া হয়েছে। কোনো ঘটনাই ঘটেনি অথচ তার (দিদারুল আলমের) বিরুদ্ধেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি মামলা দেয়া হয়েছে।

মারধর, সরকারি কাজে বাধা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে সব মামলাতেই তাকে করা হয়েছে প্রধান আসামি। বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের করা এমন একটি মামলায় (নম্বর-১৬ (১১)১৯) বাদী হলেন সাবিহা জাবেদ। এই মামলায় ভিকটিম দেখানো হয়েছে তারই কলোনির রুবিনা আক্তার নামে জনৈক গার্মেন্টস কর্মীকে। তাকে কুপিয়ে জখম, মারধর ও চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে দিদারুল আলম, মিল্টন বড়–য়াসহ সুনির্দিষ্ট ৯ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও দেড়শ’ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।

মামলার ভিকটিম ২০ নভেম্বর আদালতে হাজির হয়ে এফিডেভিট (নম্বর-৭১৫০/১৯) দিয়ে বলেছেন, তিনি কোনোকালে মামলার বাদী সাবিহা জাবেদের কলোনিতে ভাড়াটিয়া ছিলেন না। তাকে কেউ কুপিয়ে আহত করেননি। মামলার আসামিদের কাউকেও তিনি চিনেন না।

দিদারুল আলম চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে আদালতে দায়ের করা অপর দুটি মামলার বাদী হচ্ছেন মো. রিপন ও মো. সাহেদ। রিপন ১২ নভেম্বর ও সাহেদ ১৭ নভেম্বর মামলা দুটি দায়ের করেন আদালতে। তিনটি মামলাতেই যুবলীগ নেতা মিল্টন বড়–য়াও আসামি রয়েছেন।

সূত্র অভিযোগ করেছে, প্রকৌশলী আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও দিদারুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন ৪০-৫০ জন নেতাকর্মী কোনো না কোনো মামলার আসামি হয়ে এখন এলাকা ছাড়া। দিদারুল আলম চৌধুরী আরও অভিযোগ করেন, মূলত মেহেদী হাসান বাদলের খুনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত গ্রুপই বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী নেতাকর্মীদের ধ্বংস করতে মিথ্যা মামলার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তারা প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে, অপপ্রচার করে তাদের ঘায়েল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন।

তবে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি প্রিটন সরকার মিথ্যা মামলায় ঘুরেফিরে একই ব্যক্তিদের আসামি দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়ার প্রশ্নই আসে না। কোনো ঘটনা না হলে মামলা কেন হবে। তা ছাড়া কোনো মামলায় বাদী বা ভিকটিম যদি এফিডেভিট দিয়ে থাকেন তবে তা তাদের বিষয়। ভয়ভীতির কারণে বা ম্যানেজড হয়েও এ ধরনের এফিডেভিট দিতে পারেন। তবে তিনি বলেন, মামলা হওয়া মানেই অভিযুক্ত না। আদালত থেকেও অনেক মামলা এসেছে। তারা তদন্ত করছেন। তদন্ত করে যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না যায় তবে সেসব মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হবে। আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই চার্জশিট দেয়া হবে আসামিদের বিরুদ্ধে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×