হামলার নির্দেশনা আসে অনলাইনে

ফয়জুল ১০ দিনের রিমান্ডে : ভাই এনামুল গ্রেফতার

  আহমদুল হাসান আসিক ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফয়জুল হাসান ওরফে ফয়জুল

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা করতে ফয়জুল হাসানকে অনলাইনে নির্দেশনা দেয়া হয়। ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ নামের একটি অনলাইন ফোরাম থেকে এ নির্দেশনা আসে। এরপর সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে হামলাকারী ফয়জুল। এমনকি হামলার পর নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে এক সপ্তাহ আগে একটি সাইকেলও কেনে সে। ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) বা আনসার আল ইসলামের অনলাইন ফোরাম। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার ভাবাদর্শ ধারণকারীরা নির্দিষ্ট আইডির মাধ্যমে এ ফোরামের সদস্য হয়। সংগঠনের পরীক্ষিত সদস্যরাই এ ফোরামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। জঙ্গি দমনে বিশেষায়িত ইউনিট পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ফয়জুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, জাফর ইকবালকে নাস্তিক ও ইসলামের শত্রু আখ্যায়িত করে ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ ফোরামে আলোচনার পর ফয়জুল তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। শরীর ঠিক রাখতে সে নিয়মিত জিমে যেত। তিন মাস আগে সিলেটের মদিনা মার্কেট থেকে ছুরি কেনে। জাফর ইকবালকে হত্যা করতে ফয়জুলকে এবিটির কেউ কেউ উদ্বুদ্ধ করে। আরও কয়েকজন এ হামলায় ফয়জুলকে সহায়তা করেছে। ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা দেখে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা ফয়জুলের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ হামলার সঙ্গে এবিটির একটি গ্রুপ জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এটি এবিটির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কিনা এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে ফয়জুলের ভাই এনামুল হাসানকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর গাজীপুর থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট। এ সময় তার কাছ থেকে ফয়জুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ট্যাব উদ্ধার করা হয়। এনামুলের পরনে ফয়জুলের একটি গেঞ্জি ছিল। সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ফয়জুলের ব্যবহৃত সব ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস নিয়ে পালিয়ে যায় এনামুল। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মোবাইল ও ট্যাবের মাধ্যমেই ফয়জুল সিক্রেট অ্যাপস টেলিগ্রাম ও ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ ফোরামে যুক্ত ছিল।

জাফর ইকবালকে হামলা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ফয়জুলকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিমান্ডে হামলার বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ঘটনার পর ফয়জুল অসুস্থ থাকার কারণে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ফয়জুল লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। বাবা-মাকেও জঙ্গিবাদে জড়ানোর দাওয়াত দেয়। ফয়জুলের ভাষ্য- দাখিল পাস করার পর ২০১৬ সালে সিলেটে আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। তার মনে হয়েছে, আলিয়া মাদ্রাসার পড়াশোনা ইসলামের সঠিক লাইনে নেই। এ কারণে সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। দুই চাচার মাধ্যমে সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী হয় ফয়জুল। সিলেটে আহলে হাদিসের অনুসারী একটি প্রকাশনা সংস্থায় কিছুদিন কাজ করে এ মতবাদের প্রতি তার আরও বিশ্বাস বেড়ে যায়। সে যে কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে কাজ করত ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকও আহলে হাদিসপন্থী। আহলে হাদিসপন্থী ব্যক্তিদের সঙ্গে মিশে তার মধ্যে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ সময় এবিটির কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। এবিটির মতাদর্শের বিভিন্ন বই পড়ে সংগঠনে যুক্ত হয় ফয়জুল।

সিটিটিসি ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ফয়জুল এবিটির ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ ফোরামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে এ হামলা এবিটির সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে হয়েছে কিনা এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ থেকে হত্যার নির্দেশনা : ফয়জুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ নামে একটি উগ্রবাদী ফোরাম থেকে ফয়জুল হত্যার নির্দেশনা পায়। এবিটির এই ফোরামে এ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হতো। ফয়জুল সেখান থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়। ওই ফোরামে জাফর ইকবালকে নাস্তিক আখ্যায়িত করে কিভাবে হত্যা করা যায় এ বিষয়ে আলোচনা হতো। ফয়জুল নিজে থেকেই জাফর ইকবালকে হত্যার দায়িত্ব নেয়। ভার্চুয়াল আলোচনার মাধ্যমে ফয়জুলকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। হামলার তিন মাস আগে সিলেটের মদীনা মার্কেট থেকে ছুরিও কেনে সে।

গোয়েন্দারা জানান, শুধু ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ ফোরামই নয়, এবিটির মতাদর্শ প্রচারকারী ‘সালাউদ্দিনের ঘোড়া’সহ বিভিন্ন ফেসবুক পেজ নিয়মিত অনুসরণ করত ফয়জুল। ‘দাওয়া ইল্লাল্লাহ’ ফোরামের নির্দেশনা অনুসারে ফয়জুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করত। এক সময় সে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে যায়। এমনকি তাদের সঙ্গে ফুটবল খেলাও শুরু করে। শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে গত বছরের ৩১ আগস্ট সে জিমেও ভর্তি হয়েছিল। তখন জিমে অনিয়মিত হলেও এক মাস ধরে সে নিয়মিত জিম করত।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, ফয়জুলের কয়েকজন সহযোগীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। চমন নামে ফয়জুলের একজন সহযোগীও পলাতক। চমনের সঙ্গে ফয়জুল তার বোনের বিয়ে দিতে চেয়েছিল।

ফয়জুল ১০ দিনের রিমান্ডে : সিলেট ব্যুরো জানায়, জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুল হাসানের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১টায় সিলেট মহানগর হাকিম আদালত-৩ ফয়জুলের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালতের অতিরিক্ত এপিপি নিরঞ্জন চন্দ সরকার যুগান্তরকে বলেন, হামলার পরিকল্পনাকারীসহ এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে ফয়জুলকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন। শুনানির পর বিচারক হরিদাস কুমার আবেদন মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদন মঞ্জুরের পরই কড়া নিরাপত্তায় ফয়জুলকে সিলেট মহানগর ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকালেই ফয়জুলকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন কর্মকর্তারা। ফয়জুলের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি তার বাবা-মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছেন গোয়েন্দারা।

শনিবার বিকালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়। ছুরি দিয়ে আঘাত করে জাফর ইকবালকে হত্যার চেষ্টা চালায় ফয়জুল হাসান। এ সময় শিক্ষার্থীরা ফয়জুলকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনায় মামলার পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : ড. জাফর ইকবাল ছুরিকাঘাত

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×