অনুমোদন ছাড়াই চলছে ‘এসটিসি ব্যাংক’

আমানত সংগ্রহ ও চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল টাকা

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান ১২ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই নিজেদের ‘ব্যাংক’ হিসেবে প্রচার করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। প্রতিষ্ঠানের নামে এফডিআরের বিনিময়ে শাখা ব্যবস্থাপক, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, অফিসার পদে লোক নিয়োগ দিচ্ছে।

চাকরিপ্রার্থীর ইচ্ছা অনুযায়ী পদেরও প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের মতো বিভিন্ন মেয়াদে ও নামে আমানত সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু সমবায় অধিদফতরের নিবন্ধন নিয়ে ‘এসটিসি ব্যাংক’ নামের এ প্রতিষ্ঠানটি এভাবেই বেআইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মৌচাক মার্কেটের পূর্বপাশের ভবন লিলি প্লাজার তৃতীয়তলায় (সাদ রেস্টুরেন্টের ওপর) এসটিসি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রোববার চাকরিপ্রার্থী সেজে এ প্রতিবেদক পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখা যায়, ভেতরে ব্যাংকের মতো নগদ গ্রহণ ও প্রদানের ৩টি বুথ রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন অফিস করছেন। চাকরিপ্রার্থীরা সেখানে ইন্টারভিউ দিতে আসছেন। প্রত্যেককে কিছুক্ষণ পরপর ভেতরে এক্সিকিউটিভদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট ছোট রুমে এক্সিকিউটিভরা চাকরিপ্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির পরীক্ষার ব্যাপারে বলার পর বাধ্যতামূলকভাবে এফডিআর করার প্রসঙ্গে আলোচনা করছেন।

এ প্রতিবেদকের ইন্টারভিউ নেন এসটিসি ব্যাংকের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড অডিট) মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি জানান, তারা ম্যানেজার থেকে শুরু করে অফিস সহকারী পর্যন্ত লোক নিয়োগ দিচ্ছেন। প্রতি পদের জন্য চাকরিপ্রার্থীকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা এফডিআর করতে হয়। ম্যানেজার পদের জন্য ৫-৭ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর করতে হবে। এর নিচের পদের জন্য কম অঙ্কের এফডিআর করতে হবে। চাকরি ছাড়ার ৩ মাস আগে হেড অফিসে আবেদন করলে এফডিআরের টাকা ফেরত দেয়া হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের ৬৭টি ব্রাঞ্চ অফিস রয়েছে। চাকরিপ্রার্থী চাইলে বাংলাদেশের যে কোনো জেলায় অফিস করতে পারবে।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও প্রসপেক্টাস ঘেঁটে দেখা গেছে, বিভিন্ন নামে ও মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৪৪টি ব্রাঞ্চের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করছে। দৈনিক সঞ্চয় প্রকল্প, মুদারাবা মাসিক সঞ্চয়, মুদারাবা শিক্ষা সঞ্চয়, মুদারাবা হজ সঞ্চয় নামে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা ব্যাংকের মতো আমানত হিসেবে নিচ্ছে। এছাড়া সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের শেয়ারও বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব শেয়ারের নাম দেয়া হয়েছে- অংশীদার, নিকট, আস্থা, বিশ্বাস, প্রিয়, আমার ও আপন।

জানতে চাইলে এসটিসি ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মাহবুব কাদের তালুকদার টেলিফোনে যুগান্তরকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের লাইসেন্স (অনুমোদন) নেয়া হয়নি। আদালতের রায় নিয়ে তারা ব্যাংক শব্দ ব্যবহার করছেন। তবে সমবায় অধিদফতর থেকে কো-অপারেটিভ সোসাইটির লাইসেন্স নেয়া আছে।

তিনি বলেন, দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক ও আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক যেভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করছে আমরাও সেভাবে আমানত সংগ্রহ করছি। ৩ বছরের এফডিআরে গ্রাহকদের সাড়ে ১৩ শতাংশ সুদ দেয়া হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমি মৌচাক ব্রাঞ্চে অফিস করি।

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মির্জা আতিকুর রহমান চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমরা চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিই। এটা ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে ওই ব্যক্তির নামেই জমা থাকে। বেতনের পাশাপাশি তাকে এই টাকার জন্য ৮ শতাংশ সুদ দেয়া হয়। টাকা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সিকিউরিটি মানি। ওই ব্যক্তি যদি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়, তাহলে এই টাকা থেকে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করা হবে- এ কারণে টাকা নেয়া হয়।

ব্যাংক শব্দ কেন ব্যবহার করছেন এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নেয়া আছে কিনা জানতে চাইলে আতিকুর রহমান বলেন, এটা সমবায় ব্যাংক। সমবায় অধিদফতর থেকে লাইসেন্স নেয়া আছে। সে ক্ষমতাবলেই গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করা হয়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সের দরকার নেই।

২০০১ সালের ১৫ জুলাই জারি হওয়া সমবায় আইনেও সমবায় প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যাংক শব্দ যুক্ত করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। আইনের ২৩ক-এর উপধারা ২-এ বলা আছে, সমবায় আইনের অধীন নিবন্ধিত সমবায় ভূমি উন্নয়ন ব্যাংক, কেন্দ্রীয় সমবায় ভূমি উন্নয়ন ব্যাংক, কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক ছাড়া কোনো প্রাথমিক সমবায় সমিতি, কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি বা জাতীয় সমবায় সমিতি নামের সঙ্গে ব্যাংক শব্দ ব্যবহার করতে পারবে না। উপধারা ৩-এ বলা আছে, কোনো ব্যক্তি এই ধারার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৭ বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনের ২৩খ ধারার উপধারা ১-এ বলা আছে, কোনো সমবায় সমিতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করতে পারিবে না। উপধারা ২-এ বলা আছে, কোনো ব্যক্তি এই ধারার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৭ বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আইনে বলা আছে, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক ছাড়া কোনো সমবায় সমিতি তার সদস্য ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ বা ঋণ দিতে পারবে না।

সমবায় অধিদফতরের মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমবায় অধিদফতর কাউকে লাইসেন্স দেয়নি, দিতেও পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কাজ করলে সমবায় আইন অনুযায়ী তা দণ্ডযোগ্য। কেউ সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সমবায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে গত বছরের ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানের সভাপতিত্বে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ও দমন কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্সের অষ্টম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভাতেও বলা হয়, ‘এসটিসি ব্যাংক’ নামে একটি সমবায় সমিতি অবৈধভাবে ব্যাংক শব্দ ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্থানীয় প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে এসব কার্যক্রম বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

এছাড়া সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যেসব কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান নামের সঙ্গে ব্যাংক শব্দ যুক্ত করে অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নেয়া কার্যক্রম রিটের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করছে তাদের তথ্যসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় সমন্বয় কমিটির পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

সভায় বিএফআইইউর মহাব্যবস্থাপক জানান, বিএফআইইউ আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংকের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা সিআইডিতে পাঠিয়েছে এবং দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এসব বিষয়ে আইনি সহায়তা গ্রহণের জন্য ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসিকে নিয়োগ দিয়েছে।

বিএফআইইউ’র প্রধান কর্মকর্তা আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান যুগান্তরকে বলেন, কোনো কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। এসটিসি ব্যাংকের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত