মিথ্যা দিয়ে সত্য মোছা যায় না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

মুজিববর্ষে সংসদে বিশেষ অধিবেশন, অতিথি হয়ে আসবেন অনেক দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান * বিশ্বব্যাপী ২৯৮টি কর্মসূচি * লাগানো হবে এক কোটি গাছ

  সংসদ রিপোর্টার ১৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি-যুগান্তর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় সংসদ সচিবালয় মার্চ মাসে বিশেষ অধিবেশন ডাকবে। সেই অধিবেশনে অনেক দেশের সরকার-রাষ্ট্রপ্রধানকে দাওয়াত দেয়া হবে। তারা এসে বক্তব্য দেবেন।

বুধবার জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিথ্যা দিয়ে যে সত্যকে মুছে ফেলা যায় না, সেটা আজ প্রমাণিত। মুক্তিযুদ্ধে, মুক্তির সংগ্রামে, বিজয়ের ইতিহাসে জাতির পিতার যে অবদান তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। আজকে সঠিক ইতিহাস উদ্ভাসিত হয়েছে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ইউনেস্কোর মাধ্যমে জাতিসংঘভুক্ত সব দেশ উদযাপন করছে। এর থেকে বড় সত্য আর কি আছে?

একেএম রহমতউল্লাহ ও আবদুস সালাম মুর্শেদীর পৃথক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২৯৮টি কর্মসূচির মাধ্যমে সারা বিশ্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করবে। ইউনেস্কো ২০২০ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন নিঃসন্দেহে আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি’ ও ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির অধীনে আটটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর সারা বছর দেশে ও বিদেশে মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনায় জন্মশতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ, বঙ্গবন্ধুর নিজের রচনা, ভাষণ, অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, দেশে ও বিদেশে সেমিনার, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বইমেলার কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইউনেস্কো, জাতিসংঘ ও বিদেশে স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় বঙ্গবন্ধুর কর্মজীবন নিয়ে প্রচারণা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ ও সংস্থা কর্তৃক উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণসহ অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ২৯৮টি কর্মসূচি রয়েছে।

সংসদ নেতা বলেন, আগামী ১৭ মার্চ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বর্ণাঢ্য উৎসবমুখর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বছরব্যাপী কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে ১৭ মার্চ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে।

কর্মসূচি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও খণ্ডচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় মার্চ মাসে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করবে। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট জন্মশতবার্ষিকীর বিশেষ অনুষ্ঠান করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ‘জুলি ও কুরি’ পদক প্রাপ্তি দিবস উদযাপন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন পালন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন, বাংলা ও ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর গ্রন্থ প্রকাশ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে তৃণমূলের জনগণকে সম্পৃক্ত করে মুজিববর্ষ উদযাপন করা হবে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত ভাষণ ইংরেজি ছাড়াও হিন্দি, উর্দু, ফরাসি, জার্মান, চাইনিজ, আরবি, ফারসি, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, কোরিয়ান ও জাপানি- এই ১২টি ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা একাডেমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক ১০০টি গ্রন্থ প্রকাশ করবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতর, জেনেভা জাতিসংঘ দফতরের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দফতরে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিদেশে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর চেয়ার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজে বঙ্গবন্ধুর সেন্টার স্থাপন, লন্ডনের মাদাম তুসো জাদুঘর এবং জাতিসংঘ সদর দফতরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আদর্শভিত্তিক চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র প্রদর্শন, উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হবে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, পুলিশ ও র‌্যাব বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, আগামী অমর একুশে বইমেলা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হবে। ঢাকা লিট ফেস্ট কর্তৃক ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হবে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কর্তৃক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২০ আয়োজন করা হবে। বঙ্গবন্ধু স্মরণে সারা দেশে এক কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবজারভেটরি স্থাপন করবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বিমানের উড়োজাহাজ ও বিমানবন্দর সজ্জিত করবে। শিল্প মন্ত্রণালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প পুরস্কার প্রদান করবে।

তিনি আরও জানান, মিডিয়া, প্রচার ও ডকুমেন্টেশন উপকমিটি ১১টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা, স্কাই নিউজ চ্যানেল-২৪ ও এনডিটিভিতে কন্টাক্ট রিলিজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে বহুল প্রচারিত প্রভাবশালী পত্রিকা, সাময়িকী ও ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশ।

চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র কমিটি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ওপর ১২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ২৪টি খণ্ড ভিডিওচিত্র এবং একটি ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করবে। এছাড়া মানব মুক্তির থিম নিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের শিল্প, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করবে। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের।

নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, ১৯৭৫-এর পর থেকে ২১টা বছর জাতির পিতার নাম নিশানা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণ, জয় বাংলা স্লোগান এবং শেখ মুজিবের নাম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বাংলার মাটিতে। আজ সেই ভাষণ আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেখানে আলো সেখানেই অন্ধকার। একটা সময় ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু সেই অন্ধকার ভেদ করে এখন বাংলাদেশ আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। জাতির পিতা যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন সেই চেতনা বা আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল।

ফখরুল ইমামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী পেলাম আর কী পেলাম না, সেই হিসাব আমি কখনও মেলাই না। কী মর্যাদা পেয়েছি, না পেয়েছি সেটা নিয়েও আমার কোনো চিন্তা নেই। আমার চিন্তা একটাই- তা হল দেশের জন্য, দেশের মানুষের মঙ্গলে কাজ করে যাওয়া। যে মানুষগুলোর জন্য আমার পিতা (বঙ্গবন্ধু) জীবন দিয়ে গেলেন, সেই মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম- সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। আর আমার কাছে কখনই আমিত্ব বলে কিছু নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×