চট্টগ্রাম ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি: ধুলায় অতিষ্ঠ নগরজীবন

ঠিকাদারের গাফিলতি, মানা হচ্ছে না নিয়ম * পরিবেশগত ছাড়পত্র নেয়া হয়নি

  এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি। ছবি: যুগান্তর

চট্টগ্রামে বছরজুড়ে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িতে অতিষ্ঠ নগরবাসী। পানি সরবরাহে পাইপলাইন বসাতে চার বছর ধরে নগরজুড়ে এ যজ্ঞ চালাচ্ছে সেবা সংস্থাটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বা নগরের অলিগলি কোনোটিই বাদ যায়নি এ থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন নগরবাসী। বর্ষায় খানাখন্দের কষ্ট শেষে শীতে পোহাতে হচ্ছে ধুলাবালির অসহনীয় যন্ত্রণা। পড়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

পরিবেশ আইন ১৯৯৫ ও বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে অবস্থানগত ও বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ছাড়া মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে শুধু রাতে কাজ করার কথা। সড়কের ক্ষেত্রে চলাচলের বিকল্প রাস্তাও খোলা রাখার কথা। একইভাবে ধুলাবালি থেকে রক্ষায় প্রকল্পাধীন এলাকার সড়কে পানি ছিটানোর নিয়ম রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে দিনে অন্তত দুবার তা ছিটাতে হবে। তবে ওয়াসা বা তাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা করেনি, এখনও করছে না। ফলে উন্নয়ন কাক্সিক্ষত হলেও দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না নগরবাসীর। ছোট ছোট ধূলিকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম গবেষণাগারের পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী বলেন, নগরীর আগ্রাবাদ, বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্র ও নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত তিনটি সিএএম (কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং) স্টেশনের মাধ্যমে বাতাসের মানমাত্রা নিরূপণ করা হয়। সাধারণত প্রতি ঘনমিটার বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ বড় ধূলিকণার (এসপিএম) মানমাত্রা ২০০ এবং অনধিক ১৫০ মাইক্রোগ্রাম থাকলে দূষণের সতর্কাবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বুধবার দুপুরে নগরীর নাসিরাবাদ এলাকায় বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ ছিল ২৪০ এসপিএম এবং ১৩০ মাইক্রোগ্রাম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল গেল বছরের নভেম্বরে। তখন নগরীতে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ ৩০৯ মাইক্রোগ্রাম ছিল।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের (মহানগর) পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরুর আগে পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র নেয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত ওয়াসা কোনোটির ছাড়পত্র নেয়নি। গত ৪ ডিসেম্বর বায়ুদূষণ রোধে সেবা সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করা হয়। সভায় সব সেবা সংস্থাকে প্রকল্পের জন্য ছাড়পত্র নিতে অনুরোধ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত ওয়াসা ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেনি।

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচন আসন্ন। মার্চে এ নির্বাচন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখতে অনুরোধ জানিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু কাজ বন্ধ রাখার পক্ষে নয় ওয়াসা।

জনভোগান্তি কমাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দুই সংস্থার কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ৫ জানুয়ারি বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, পানির সংকট নিরসন করতে যেমন পাইপলাইন স্থাপনের বিকল্প নেই, তেমনি পাইপলাইন বসাতে হলে কাটতে হবে সড়ক। এ কাজ করতে গিয়ে যেন নগরবাসীর দুর্ভোগ কম হয়, সেদিকে নজর দিতে তাগিদ দেয়া হয় ওই বৈঠকে। বেশকিছু নির্দেশনাও দেয়া হয় বৈঠকে। বলা হয়, পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ হলে দ্রুত সড়ক সংস্কার করে দিতে হবে। ধুলাবালু যাতে না ওড়ে, সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, সেবা সংস্থার অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে। বিকল্প সড়ক না রেখে একের পর এক সড়ক কেটে চলেছে ওয়াসা। ফলে কোনো কোনো সড়কে বন্ধ থাকছে যানবাহন চলাচল। আবার কোনোটির পাশে বড় গর্ত থাকায় প্রায় সময় যান চলাচলে ঘটছে দুর্ঘটনা। আবার সড়কে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি কোথাও কোথাও মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

ওয়াসা সূত্র জানায়, নগরীর চকবাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৩টি পয়েন্টে ইন্টার কানেকশনের কাজ চলমান রয়েছে। এরপর শুরু হবে ১২ কিলোমিটার সড়কে নতুন করে পাইপ স্থাপন ও সার্ভিস কানেকশনের কাজ। নগরীর অলিগলিতে অর্ধলক্ষাধিক গর্ত খোঁড়া হবে সার্ভিস কানেকশন দেয়ার জন্য।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম ফজলুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ওয়াসা সবসময় চেষ্টা করে পাইপলাইন স্থাপনসহ যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে যাতে জনভোগান্তি কম হয়। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র না নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ডিপিপিও অনুমোদন হয় না।

২০১৩ সাল থেকে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ১৬০ কিলোমিটার সড়কে পাইপ বসানোর কাজ শুরু করে ওয়াসা। এ কাজে সড়ক কেটে মাটির গভীর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বড় আকারের পানি সরবরাহ লাইন। পরে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় আরও ৬৫০ কিলোমিটার পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ ও ২০২১ সালে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত