বাগমারায় দুই বাহিনীর সংঘাত, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

  রাজশাহী ব্যুরো ২২ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা থেকেই জঙ্গিগোষ্ঠী জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) উত্থান। এই জঙ্গিগোষ্ঠী দুর্গম এই উপজেলাটিতে নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জেএমবি দমন হয়। থেমে যায় ওদের বর্বরতা। তবে নতুন করে সেখানে দুটি বাহিনী গড়ে উঠেছে। বাহিনী দুটি কোনো মতাদর্শে পরিচালিত নয়। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। দুই বাহিনীর করণে উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা সর্বদা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

বাহিনী দুটির একটির গডফাদার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান। আর আরেকটির গডফাদার লুৎফরেরই এক সময়ের শিষ্য মান্দিয়াল গ্রামের বাসিন্দা জাবের আলী (৪৫)। পুলিশ জানায়, সাত-আট মাস ধরে লুৎফর ও জাবের আলাদা। দু’জনে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। এখন দুই বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।

এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়েছে। এমন একটি মামলায় সোমবার রাতে জাবেরসহ তার ছয় সহযোগী গ্রেফতার হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া অন্যরা হলেন- জাবেরের প্রধান সহযোগী একই গ্রামের জিয়াউর রহমান (৪০), খয়রা গ্রামের নারায়ণ চন্দ্র সাহা (৩৯), বীরকয়া গ্রামের মোজাম্মেল হক (৩৬), মো. সামসুদ্দিন (৩৫) এবং মন্দিয়াল গ্রামের জাফর আলী (৪৬)।

লুৎফরের সহযোগী জালাল উদ্দিনের দায়ের করা চাঁদাবাজির একটি মামলায় এদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। এখন আরেক পক্ষের ক্যাডারদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন লুৎফর রহমান। ২০১৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হঠাৎ দলীয় মনোনয়নে তিনি চেয়ারম্যান নির্র্বাচিত হন। এ কারণে শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। চেয়ারম্যান হয়েই লুৎফর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। এর জন্য তিনি শিষ্য হিসেবে জাবের আলীকে আশ্রয়প্রশ্রয় দেন।

তারপর লুৎফর কিছু পুকুর নিয়ে মাছচাষ শুরু করেন। পরে তিনি মাছের খাবারের ব্যবসাও চালু করেন। শুরুতে এই মাছের খাবার বিক্রির দায়িত্ব দেন জাবের আলীকে। এভাবে দিন দিন জাবের আলী চেয়ারম্যানের ক্যাডারে পরিণত হয়ে এলাকার বিল-খাল ও পুকুর দখল করতে শুরু করেন।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, লুৎফর রহমান তার ক্যাডার জাবের আলীর মাধ্যমেই পশ্চিম নাককাটি, পূর্বনাককাটি, মরা বিলসহ বেশ কিছু বিল দখলে নিয়ে মাছচাষ করে কোটিপতি হন। একসময়ের দিনমজুর জাবেরও হয়ে ওঠেন অর্থবিত্তের মালিক। কিন্তু পরে দু’জনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

এরই মাঝে ২০১৮ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লুৎফর রহমানের ভরাডুবি হয়। এই পরাজয়ের পেছনে জাবের আলীর হাত আছে বলে সন্দেহ করেন লুৎফর। এরপর থেকেই বিরোধ। এলাকার বিল দখল নিয়ে দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। সাত-আট মাস ধরে তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে আসছে। এ নিয়ে জাবের বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। আর লুৎফর বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে একটি।

পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে আরও জানা যায়, ৩ ডিসেম্বর জাবের বাহিনীর হামলার শিকার হন চেয়ারম্যানের অনুসারী বীরকয়া গ্রামের মোবারক হোসেন (৪৫)। পিটিয়ে মোবারকের হাত-পা ভেঙে দেয় তারা।

এর সপ্তাহখানেক আগে জাবের বাহিনীর লোকজন হামলা চালায় মোবারকের স্ত্রী আঞ্জুরী বেগমের (৩৫) ওপর। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ঘুমন্ত আঞ্জুরী বেগমের ডান স্তন কেটে দেয়। এ ঘটনায় জাবেরসহ তার ১৭ ক্যাডারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একই ভাবে জাবের বাহিনীর হামলার শিকার হন কুতুবপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৫৫)।

অন্যদিকে ১৯ ডিসেম্বর লুৎফর বাহিনীর লোকজন রাতের অন্ধকারে হামলা চালিয়ে জাবের বাহিনীর অন্যতম মোতালেব (২৫) নামে এক ভ্যানচালককে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়। ভ্যান চালাতে না পেরে তিনি এখন পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ওই ঘটনায় মোতালেব বাদী হয়ে লুৎফর বাহিনীর ১০ ক্যাডারের বিরুদ্ধে বাগমারা থানায় মামলা করেন।

পাল্টাপাল্টি হামলা ও মামলার মধ্যেই জাবেরসহ ছয়জন গ্রেফতার হল। এর আগে ১৯ ডিসেম্বর রাতে বাগমারার জ্যোতিনগঞ্জ বাজার থেকে জাবের আলীকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। গ্রেফতারের পর মোটরসাইকেলে করে থানায় নেয়ার পথে পুলিশকে ঘিরে ফেলে তার ক্যাডাররা। তারা দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে আহত করে হ্যান্ডকাফসহ জাবের আলীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকে জাবের আলী আত্মগোপনে ছিল। তাকে গ্রেফতারের পর এখন লুৎফর বাহিনীর ক্যাডারদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।

তবে নিজের কোনো বাহিনী নেই দাবি করে লুৎফর রহমান বলেন, জাবের আলী একসময় আমার লোক ছিল। তবে এখন সে চরম দুর্বৃত্ত। এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী।

বাগমারা থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, এলাকায় আধিপাত্য বিস্তার নিয়েই লুৎফর রহমান ও জাবের আলীর মধ্যে দ্বন্দ্ব। আগে একসঙ্গে থাকলেও সাত-আট মাস ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছে। এ কারণে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। দুই গ্রুপের লোকজনকেই ধরার চেষ্টা চলছে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত