বাউফল উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণে বড় অনিয়ম: অভিযোগ গুরুতর তবুও কাজের উদ্বোধন এমপির

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাউফল উপজেলা কমপ্লেক্স
বাউফল উপজেলা কমপ্লেক্স

নির্মাণ কাজে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগের পরও পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলেন পটুয়াখালী-২ আসনের এমপি আ স ম ফিরোজ। ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের এ কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজে ১৬২টি প্রি-কাস্ট পাইলে বড় ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ।

পরে বাউফলের উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হলেও তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবার ক্রটিপূর্ণ ওই প্রি-কাস্ট পাইল দিয়েই শুরু হল ভবন নির্মাণ।

কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ একজন ঠিকাদার পেলেও মূলত কাজটি করছেন বাউফলের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম। যিনি নিজেই এমপি ফিরোজের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে দাবি করছেন। ফলে বড় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও ক্রটিপূর্ণ প্রি-কাস্ট পাইল দিয়েই শুরু হল কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ। আর বহালতবিয়তে আছেন সেই উপসহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামও।

তবে কাজের অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেননি সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ এমপি। বলেছেন, উদ্বোধনের সময় সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রকৌশলীরাও ছিলেন। অনিয়মের ব্যাপারে কিছু জানা নেই।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজটি পায় পটুয়াখালীর এ কে মা অ্যান্ড জেবি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে মাঠপর্যায়ে কাজটি করছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম।

জানতে চাইলে আমিনুল বলেন, ‘কাজটি আমিই করছি। মা অ্যান্ড জেবির লাইসেন্স ধার করে কাজটি করছি আমরা।’

মা অ্যান্ড জেবির প্রোপ্রাইটর মহিউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিশেষ অনুরোধে পার্টনার হিসেবে আমিনুলকে নেয়া হয়েছে। তবে কাজের ব্যাপারে আমরাও খোঁজখবর রাখছি।’ বিশেষ অনুরোধটি কার জানতে চাইলে অবশ্য বলতে রাজি হননি মহিউদ্দিন।

উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণে ১৮০টি প্রি-কাস্ট পাইল বসানোর কথা রয়েছে নির্মাণ চুক্তিতে। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ১৬২টি পাইল প্রস্তুত হওয়ার পর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসেন এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল হুদা। তার পরিদর্শনের সময়ই ধরা পড়ে পাইল নির্মাণে বড় ধরনের ত্রুটি।

১২ ডিসেম্বর দেয়া ওই পরিদর্শন প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রতিটি পাইলের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ৫০০ মিলিমিটারের স্থলে দেয়া হয়েছে ১৩ হাজার ১৫০ মিলিমিটার। পাইলের প্রস্থচ্ছেদ ৩০০ পূরণ ৩০০-এর স্থলে করা হয়েছে ৩০০ পূরণ ২৯০। যে চেম্বারে পাইল বসবে সেগুলো অতিরিক্ত ঢালাই দিয়ে ইরেগুলেশন করা হয়েছে। পাইলের হুক ডিজাইন অনুযায়ী করা হয়নি এবং স্ট্রিআপ ২২০ পূরণ ২২০-এর স্থলে ২১০ পূরণ ২১০ করা হয়েছে।’

পরিদর্শন রিপোর্টে এসব অনিয়মকে মারাত্মক বলে উল্লেখ করার পাশাপাশি এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালককে দৃষ্টি দেয়া ও দায়িত্বরত উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন নূরুল হুদা। বিষয়টির সমাধান না করে উল্লিখিত প্রি-কাস্ট পাইল বসানোর ব্যাপারে আপত্তি এবং বিষয়টি দেখভালের জন্য পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলীকেও নির্দেশ দেন তিনি।

এতকিছুর পরও বৃহস্পতিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন পটুয়াখালী-২ আসনের এমপি আ স ম ফিরোজ।

বাউফলের একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানায়, ‘পটুয়াখালীর মহিউদ্দিন আহম্মেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কাজটি পেলেও কাজটি যে করছেন সেই আমিনুল ইসলামকে মানুষ চেনেন এমপি ফিরোজের ম্যানেজার হিসেবে। তার প্রভাবেই এতবড় অনিয়ম। এমন গুজবও রয়েছে যে, ফিরোজই ভিন্ন নামে এ কাজটি করছেন।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে এমপি ফিরোজ বলেন, ‘এসব অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমার নির্বাচনী এলাকায় এতবড় একটি উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন আমি করব এটাই স্বাভাবিক। তবে এ কাজে অনিয়মের বিষয়ে আমাকে এর আগে কেউ কিছু জানায়নি। তাছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্য কর্মকর্তারাও ছিলেন। তারাও কেউ কিছু আমায় বলেননি।’

অভিযোগ সত্ত্বেও কিভাবে ত্রুটিপূর্ণ পাইল দিয়ে কাজটি চলছে তা জানতে উপসহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামকে ফোন দেয়া হলে তিনি পরিচয় শুনেই লাইন কেটে দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে রাখেন।

নির্মাণ কাজের তদারকিতে থাকা বাউফল উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যে মাপে প্রি-কাস্ট পাইলগুলো করা হয়েছে সেটি আসলে স্টিমেট’র মাপ। আর নুরুল হুদা সাহেব যে মাপের কথা বলেছেন সেটি ডিজাইনের মাপ। আমরা উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছি। নতুনভাবে প্ল্যান রিভাইজ করতে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা যাবে না। তাই তাদের সঙ্গে কথা বলে পাইলগুলো খানিকটা গভীরে বসাচ্ছি। পরে পাইল ক্যাপ করার সময় বাড়তি ঢালাই দিয়ে বিষয়টি পুষিয়ে নেব।’

এমপি ফিরোজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই উনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। বরিশাল পলিটেকনিক থেকে পাস করার পর উনি আমাকে ঢাকার নাভানায় চাকরি দিয়েছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে আমি এলাকায় ঠিকাদারি ব্যবসা করছি। মূলত আমি এমপি ফিরোজের স্নেহেই মানুষ।’

এদিকে নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আমিনুল ইসলামের দেয়া যুক্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এলজিইডি পটুয়াখালীর একজন প্রকৌশলী বলেন, ‘এটা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পাইল কিছুটা ভেতরে বসিয়ে পাইল ক্যাপ বাড়তি দিয়ে দৈর্র্ঘ্য পোষাণো গেলেও প্রস্থসহ অন্যান্য যে ত্রুটি রয়েছে সেগুলোর সমাধান দেয়া অসম্ভব। বরঞ্চ এ পাইল বসানোর কারণে পুরো ভবনটিই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাছাড়া ডিজাইন রিভাইজ না করিয়ে এভাবে কাজ করার অনুমতিও কোনো প্রকৌশলী দিতে পারেন না।’

পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সামাদ বলেন, ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পটুয়াখালী থেকে এলজিইডির কেউ বাউফলে যায়নি। এমপি সাহেবের অনুষ্ঠানে হয়তো তার উপজেলার কর্মকর্তারা ছিলেন।’

পাইলে ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আমাকে চিঠি দিয়েছেন। কাজ শুরু হওয়ার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। ডিজাইন রিভাইজ কিংবা প্রকল্প প্রস্তাবের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হলে অবশ্যই দাফতরিক অনুমোদন নিতে হবে। আমার জানা মতে, তা নেয়া হয়নি। ত্রুটিপূর্ণ পাইল দিয়ে অবশ্যই ওই কাজ চলতে পারে না। আমরা বিষয়টি দেখব।’

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘উপসহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে প্রক্রিয়া চলছে।’ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নূরুল হুদা প্রশিক্ষণজনিত কারণে দেশের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×