জরুরি অবস্থা ঘোষণা ডব্লিউএইচওর

চীন ফেরত ৩৬১ বাংলাদেশি থাকবেন হজ ক্যাম্পে

করোনাভাইরাস: দেখা করতে পারবেন না স্বজনরা * চট্টগ্রামের দু’জনের নমুনা আইইডিসিআরে * চীনে মৃত্যু ২১৩, আক্রান্ত ১০ হাজার * অনুন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়লে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন

  যুগান্তর রিপোর্ট ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চীন ফেরত ৩৬১ বাংলাদেশি থাকবেন হজ ক্যাম্পে

চীনের উহান শহর থেকে ফিরিয়ে আনা ৩৬১ বাংলাদেশিকে আশকোনায় হজ ক্যাম্পে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

তাদের বহন করা বিশেষ বিমানটি শুক্রবার রাত দুটায় ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা। বিমানবন্দর থেকে তাদের বাসে সরাসরি হজ ক্যাম্পে নেয়া হবে।

এদিন পাঁচ চিকিৎসক নিয়ে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট উহানের উদ্দেশে যাত্রা করে। চট্টগ্রাম থেকে চীন ফেরত দুই শিক্ষার্থীর নমুনা ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এরই মধ্যে চীনে মৃতের সংখ্যা ২১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। চীনে ভাইরাসটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

সংস্থাটির প্রধান ড. টেড্রোস গ্যাব্রিয়েসুস বলেছেন, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দেশগুলোয় প্রাণঘাতী ভাইরাসটি ছড়ানো সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ ভাইরাসটি সেখানে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনুন্নত দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে এর নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, ফিরিয়ে আনা ৩৬১ যাত্রীকে বিমান থেকে সরাসরি বাসে হজ ক্যাম্পে নেয়া হবে।

বিমানেই তাদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হবে। লাগেজও বিমান থেকে সরাসরি হজ ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, চীনে তারা পর্যবেক্ষণেই ছিলেন।

এ ছাড়া তাদের প্রায় সবারই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এরপরও হজ ক্যাম্পে নিয়ে নারী ও শিশুদের থেকে অন্যদের পৃথক করা হবে। কারও শরীরে উচ্চ তাপমাত্রা বা করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা গেলে তাদেরও আলাদা করা হবে।

আগত বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা চীনে পর্যবেক্ষণে ছিলেন, সেটি গণনার মধ্যে এনে ১৪ দিনের অবশিষ্ট দিনগুলো তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।

এখানে থাকার সময় তাদের আত্মীয়স্বজনকে সাক্ষাতের জন্য হজ ক্যাম্পে ভিড় না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। শুক্রবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

এরপর তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, করোনাভাইরাস ১৭টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশে এ রোগের কোনো প্রভাব নেই। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একজনকে সন্দেহজনকভাবে ভর্তি রাখা হয়েছে।

তার নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তিনি বলেন, চীনের উহান প্রদেশ থেকে প্রায় ৩৬১ জনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। যারা ফেরত আসছেন তাদের কেউই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন।

এরপরও তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তারা নির্ধারিত সময় আশকোনার হজ ক্যাম্পে থাকবেন। এ সময় পরিবারের সদস্যসহ কারও সঙ্গে তারা দেখা করতে পারবেন না। পরিবারের সদস্যদের কাছে আমরা নিয়মিত খবর দেব।

তিনি আরও বলেন, শুক্রবার বিকাল ৫টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ বিমান উহানের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। আনুমানিক রাত ২টার দিকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফ্লাইটটি দেশে আসবে।

বিমানটিতে পাঁচজন চিকিৎসক রয়েছেন। তারা সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত হয়ে গেছেন। এ ছাড়া বিমানটিতে অ্যাম্বুলেন্সের সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আরও বলেন, হজ ক্যাম্পে রাখা অবস্থায় কেউ অসুস্থ হলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইন ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হবে।

এ জন্য এগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা দেয়ার জন্য পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে। পর্যবেক্ষণে থাকাকালে আত্মীয়স্বজনকে দেখা করতে না চাওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, কেউ তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন না। তারা কেউ কারও সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন আত্মীয়স্বজনের উদ্দেশে একই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি এ ভাইরাসে আক্রান্তদের কথা শুনে অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে বলেছেন। এর আগে চীন সরকার আমাদের বলেছিল- ১৪ দিনের আগে তাদের ফেরত দেয়া যাবে না।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা জানিয়েছে ফেরত দেয়া সম্ভব। এটা জানার পর তাদের ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রামে সন্দেহজনক রোগী : যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চীন থেকে আসা চট্টগ্রামের দুই শিক্ষার্থীকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

২৪ ও ২৫ জানুয়ারি চীন থেকে ঢাকা হয়ে তারা চট্টগ্রাম এসেছেন। বুধবার রাতে তারা জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়। আতঙ্কিত হয়ে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মুখের লালা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। শুক্রবার চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ওই দুই শিক্ষার্থী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এমন নয়। তাদের শরীরে জ্বর, কাশি আছে। চীন ভ্রমণ করে আসায় তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে ডব্লিউএইচওর জরুরি অবস্থা ঘোষণা : বৃহস্পতিবার রাতে জেনেভায় জরুরি বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. টেড্রোস ভাইরাসটিকে একটি অভূতপূর্ব প্রাদুর্ভাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, চীনে কী হচ্ছে সে জন্য কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। বরং অন্য সব দেশে যা ঘটছে সে জন্যই বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মূল কারণ। খবর বিবিসি, সিএনএন, আনন্দবাজার, আল জাজিরা ও রয়টার্সের।

চীনা কর্তৃপক্ষের অসাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রশংসা করে ড. টেড্রোস গ্যাব্রিয়েসুস বলেন, চীনে বাণিজ্য বা ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করার কোনো কারণ নেই। উল্লেখ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর আগেও পাঁচবার বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল। কোনো রোগ খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়লে এ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

ডব্লিউএইচও জানায়, চীন ছাড়া ১৮টি দেশে আরও ৯৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। অন্য দেশের যত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই উহান শহরে ছিলেন। হুবেই প্রদেশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার আরও ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে উৎপত্তিস্থল উহান শহরে মৃতের সংখ্যা ২০৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

চীন থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে অনেক দেশ : এখন পর্যন্ত ২০টির মতো দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, কম্বোডিয়া, শ্রীলংকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তাইওয়ানে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইসরায়েলেও এক রোগীর শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উহান শহর থেকে শত শত বিদেশি নাগরিককে সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। মৃতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের উহান থেকে সরিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশ চীন থেকে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।

বিভিন্ন দেশের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা : রোমে দু’জন চীনা পর্যটক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর চীনে যাওয়ার ফ্লাইট স্থগিত করেছে ইতালি। এর আগে একটি ক্রুজ জাহাজ থেকে ছয় হাজার যাত্রীর নামার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ চীনগামী বিমানের ফ্লাইট বাতিল করছে। এর মধ্যে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স, এয়ার এশিয়া, ক্যাথে প্যাসিফিক, এয়ার ইন্ডিয়া ও ফিনএয়ার ইতিমধ্যে চীনগামী বিমানের সংখ্যা কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।

চীনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা রাশিয়ার : করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিবেশী রাশিয়া। উভয় দেশের মধ্যে রয়েছে ৪২০০ কিলোমিটার সীমান্ত। এটি বিশ্বের ষষ্ঠ দীর্ঘতম সীমান্ত। বৃহস্পতিবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘোষণা দেয়।

ভারতীয়দের ফেরাতে চিকিৎসক নিয়ে বিশেষ বিমান যাচ্ছে চীনে : করোনাভাইরাস-পরবর্তী পরিস্থিতিতে উহানে আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধার করতে বিমান পাঠাচ্ছে ভারত। শুক্রবার উহান শহরে পৌঁছবে বিমানটি। হুবেই প্রদেশে এক হাজার ২০০ ভারতীয় বাস করেন।

তার মধ্যে ৬০০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে উহান শহরে ৩২৫ জনের বেশি ভারতীয় বর্তমানে আটকে রয়েছেন। ৩২৫ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশে ফেরত আনার কথা জানানো হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৬ ২৬
বিশ্ব ৯,৬২,৮৮২২,০৩,২৭৪৪৯,১৯১
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×