তেঁতুলিয়ার শেখ ফরিদ: পাথর শ্রমিক থেকে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক
jugantor
তেঁতুলিয়ার শেখ ফরিদ: পাথর শ্রমিক থেকে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক

  এস এ মাহমুদ সেলিম, পঞ্চগড়  

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তেঁতুলিয়ার শেখ ফরিদ: পাথর শ্রমিক থেকে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক
শেখ ফরিদ। ছবি: সংগৃহীত

তেঁতুলিয়া উপজেলার শালাবাহান ইউনিয়নের পেদিয়াগছ গ্রামের চান মিয়ার ছেলে শেখ ফরিদ (৩৮) এক সময় পাথর শ্রমিক ছিলেন। এর আগে কিছুদিন ফেরি করে বাদাম ও সিদ্ধ ডিম বিক্রি করেছেন। পাথর শ্রমিক থাকা অবস্থায় হঠাৎই তিনি ডাহুক নদীতে ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন শুরু করেন। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি এভাবে পাথর উত্তোলন করে বিপুল অঙ্কের অর্থের মালিক হন। পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি ডাহুক নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে পুলিশ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকা আদায় করে নিয়েছেন। তেঁতুলিয়ার মাঝিপাড়া ও শালবাহানের বিভিন্ন এলাকায় চলা কয়েক শত ড্রেজার মেশিন নিয়ন্ত্রণ করতেন ফরিদ। এভাবেই তিনি পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনকারী চক্রের ডন হিসেবে আভির্ভূত হন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে এক সময়ের পাথর শ্রমিক ফরিদ এখন প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার মালিক। ২০ একর জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন চা-বাগান। ৩টি ট্রাকের মালিক হয়েছেন। আছে পাথরের ব্যবসা। সর্বশেষ তিনি বুড়াবুড়ি এলাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি চা-কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল- প্রকাশ্যে বাংলাবান্ধা-তেঁতুলিয়া জাতীয় মহাসড়কের মাঝিপাড়া এলাকার ডাহুক ব্রিজের পাশে বন বিভাগের জমি অবৈধভাবে দখল করে দিনের পর দিন জমজমাট পাথরের ব্যবসা চালিয়ে এলেও স্থানীয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শেখ ফরিদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করা হয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে তা থেমে আছে। তবে দেরিতে হলেও গত ২৬ জানুয়ারি শেখ ফরিদকে (৩৮) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তেঁতুলিয়ার ভজনপুর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুরের মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অবৈধ বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনসহ ১৪টি মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি প্রশাসন ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধসহ মাটি খনন করে সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। তারপরও শেখ ফরিদসহ চক্রটি ড্রেজারের সাহায্যে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের পাঁয়তারা করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ জানুয়ারি সকালে তারা সাধারণ শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে জুমারউদ্দিন (৫৮) নামে এক শ্রমিক নিহত হন। আহত হন পুলিশ-র‌্যাব সদস্যসহ ৩০ জন। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই তেঁতুলিয়া থানায় পুলিশ দুটি মামলা করে। দুটি মামলাতেই অজ্ঞাতনামা ৪-৫ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তেঁতুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক লুৎফর রহমান বাদী হয়ে হত্যা মামলা ও উপ-পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন বাদী হয়ে সরকারি কাজে বাধা দান, পুলিশ-র‌্যাবের ওপর হামলা ও পুলিশের গাড়ি ভাংচুরের মামলাটি করেন। সরকারি কাজে বাধাদান ও পুলিশের ওপর হামলার মামলায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ হাজার জনের নামে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় বোমা মেশিন চক্রের মূল হোতা শেখ ফরিদকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও তেঁতুলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, শেখ ফরিদের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ ২৬ জানুয়ারি ভজনপুরে সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশ ও র‌্যাবের ওপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাংচুর হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শেখ ফরিদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তার রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার আদালত তার রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর না করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন।

তেঁতুলিয়ার শেখ ফরিদ: পাথর শ্রমিক থেকে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক

 এস এ মাহমুদ সেলিম, পঞ্চগড় 
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
তেঁতুলিয়ার শেখ ফরিদ: পাথর শ্রমিক থেকে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক
শেখ ফরিদ। ছবি: সংগৃহীত

তেঁতুলিয়া উপজেলার শালাবাহান ইউনিয়নের পেদিয়াগছ গ্রামের চান মিয়ার ছেলে শেখ ফরিদ (৩৮) এক সময় পাথর শ্রমিক ছিলেন। এর আগে কিছুদিন ফেরি করে বাদাম ও সিদ্ধ ডিম বিক্রি করেছেন। পাথর শ্রমিক থাকা অবস্থায় হঠাৎই তিনি ডাহুক নদীতে ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন শুরু করেন। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি এভাবে পাথর উত্তোলন করে বিপুল অঙ্কের অর্থের মালিক হন। পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি ডাহুক নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে পুলিশ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকা আদায় করে নিয়েছেন। তেঁতুলিয়ার মাঝিপাড়া ও শালবাহানের বিভিন্ন এলাকায় চলা কয়েক শত ড্রেজার মেশিন নিয়ন্ত্রণ করতেন ফরিদ। এভাবেই তিনি পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনকারী চক্রের ডন হিসেবে আভির্ভূত হন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে এক সময়ের পাথর শ্রমিক ফরিদ এখন প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার মালিক। ২০ একর জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন চা-বাগান। ৩টি ট্রাকের মালিক হয়েছেন। আছে পাথরের ব্যবসা। সর্বশেষ তিনি বুড়াবুড়ি এলাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি চা-কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল- প্রকাশ্যে বাংলাবান্ধা-তেঁতুলিয়া জাতীয় মহাসড়কের মাঝিপাড়া এলাকার ডাহুক ব্রিজের পাশে বন বিভাগের জমি অবৈধভাবে দখল করে দিনের পর দিন জমজমাট পাথরের ব্যবসা চালিয়ে এলেও স্থানীয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শেখ ফরিদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করা হয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে তা থেমে আছে। তবে দেরিতে হলেও গত ২৬ জানুয়ারি শেখ ফরিদকে (৩৮) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তেঁতুলিয়ার ভজনপুর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুরের মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অবৈধ বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনসহ ১৪টি মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি প্রশাসন ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধসহ মাটি খনন করে সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। তারপরও শেখ ফরিদসহ চক্রটি ড্রেজারের সাহায্যে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের পাঁয়তারা করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ জানুয়ারি সকালে তারা সাধারণ শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে জুমারউদ্দিন (৫৮) নামে এক শ্রমিক নিহত হন। আহত হন পুলিশ-র‌্যাব সদস্যসহ ৩০ জন। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই তেঁতুলিয়া থানায় পুলিশ দুটি মামলা করে। দুটি মামলাতেই অজ্ঞাতনামা ৪-৫ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তেঁতুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক লুৎফর রহমান বাদী হয়ে হত্যা মামলা ও উপ-পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন বাদী হয়ে সরকারি কাজে বাধা দান, পুলিশ-র‌্যাবের ওপর হামলা ও পুলিশের গাড়ি ভাংচুরের মামলাটি করেন। সরকারি কাজে বাধাদান ও পুলিশের ওপর হামলার মামলায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ হাজার জনের নামে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় বোমা মেশিন চক্রের মূল হোতা শেখ ফরিদকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও তেঁতুলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, শেখ ফরিদের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ ২৬ জানুয়ারি ভজনপুরে সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশ ও র‌্যাবের ওপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাংচুর হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শেখ ফরিদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তার রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার আদালত তার রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর না করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন।