টিভি দেখা নিয়ে বিতণ্ডা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ খুন
jugantor
নারায়ণগঞ্জে রিতু হত্যা
টিভি দেখা নিয়ে বিতণ্ডা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ খুন
২০ মাস পর রহস্য উদ্ঘাটন * ২ সপ্তাহের পরিচয়েই লিভ টুগেদার

  সিরাজুল ইসলাম  

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

টিভি দেখা নিয়ে বিতণ্ডা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ খুন

রাজধানীর পুরান ঢাকায় সেলাই মেশিনের মোটর কিনতে গিয়ে লেদার ব্যাগের কারিগর লুৎফর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় টেইলারিং কারিগর নাজমা আক্তার রিতুর।

২ সপ্তাহের পরিচয়েই তারা লিভ টুগেদার শুরু করেন। এর ২১ দিনের মাথায় বাসায় টেলিভিশন দেখা নিয়ে দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। রিতু থাপ্পড় মারেন লুৎফরকে। প্রতিশোধ নিতে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় রিতুকে।

হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে বেগ পেতে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। কারণ, এক যুগ আগে প্রেম করে নজরুল ইসলাম নাদিম নামের এক যুবককে বিয়ে করেছিলেন রিতু। এরপর থেকে তিনি ছিলেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। নাদিমের বিষয়ে তেমন কিছু জানা ছিল না রিতুর পরিবারের সদস্যদের। হত্যার পর রিতুর পরিবারের পক্ষ থেকে নাদিমকে দায়ী করা হয়।

প্রকৃত অর্থে নাদিমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রিতুর যোগাযোগ ছিল না। এ বিষয়টিও রিতুর পরিবারের সদস্যরা জানতেন না। অন্যদিকে লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ওই ঘর থেকে ছানোয়ার শেখ নামে এক ব্যক্তির পাসপোর্ট জব্দ করে। পুলিশ ছানোয়ারকে ঘিরেও তদন্ত চালায়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ৩ বছর আগে থেকেই ছানোয়ার বিদেশে অবস্থান করছিলেন। তদন্তে জানা যায়, ছানোয়ারের সঙ্গে রিতুর কোনো পরিচয়ই ছিল না।

অবশেষে ২০ মাস পর রহস্য উদ্ঘাটন করে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। এরইমধ্যে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে লুৎফর। শিগগিরই এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২২ জুন নারায়ণগঞ্জের ২০১ নম্বর নিমাইকাশারী এলাকার বাসা থেকে রিতুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রিতুর ভাই আবদুর রশিদ বাদী হয়ে ওই বছরের ২৬ জুন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় রিতুর সাবেক স্বামী নজরুল ইসলাম নাদিমকে একমাত্র আসামি করা হয়।

এজাহারে বলা হয়, ২০১৮ সালের ১ জুন রিতু ও নাদিম ওই বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া উঠে। গ্রামের বাড়ি নরসিংদী (প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া) বলে জানায়। ২২ জুন ওই দম্পতির তালাবদ্ধ রুম থেকে দুর্গন্ধ পান আশপাশের ভাড়াটিয়ারা। পরে বাড়ির মালিক থানায় খবর দিলে পুলিশ তালা ভেঙে ৩১ বছর বয়সী রিতুর লাশ উদ্ধার করে। এ সময় ভিকটিমের রুম থেকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, ছানোয়ার শেখ নামের একজনের পাসপোর্ট ও দুটি চেকবই জব্দ করে পুলিশ। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের খবর দেয় পুলিশ।

সিআইডি প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে জানান, তদন্ত চলাকালে ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কললিস্টের সূত্র ধরে মাসুদ মিয়া নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়।

কারণ, রিতুর সঙ্গে টেলিফোনে মাসুদ অনেক কথা বলেছেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, মাসুদের সঙ্গে রিতুর খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। মাসুদের মতো অনেকের সঙ্গেই রিতুর কথা হতো।

পরে আরেকটি নম্বরের কললিস্টের সূত্র ধরে ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বংশালের মালিটোলা থেকে লুৎফর রহমানকে গ্রেফতার করে এসআই সেলিম রেজার নেতৃত্বাধীন সিআইডির একটি টিম। পরদিন সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাতেই উঠে আসে হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত।

লুৎফরের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে সিআইডির ডিআইজি মাইনুল হাসান যুগান্তরকে বলেন- ২০১৮ সালের মে মাসে সেলাই মেশিনের মোটর কিনতে পুরান ঢাকার নবাবপুরে যান রিতু। সেখানে রাস্তায় লুৎফরের সঙ্গে দেখা হয়। লুৎফর নবাবপুরের পাশে মালিটোলায় ব্যাগ সেলাইয়ের কাজ করেন।

লুৎফরের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর রিতু তাকে বলেন, আমি একটি মোটর কিনব। আমাকে একটু হেল্প করুন। এরপর রিতুকে নিয়ে লুৎফর পাশের কয়েকটি দোকানে গিয়ে সেলাই মেশিনের বেশকিছু মোটর দেখেন। কিন্তু কোনোটিই রিতুর পছন্দ হয়নি। তাই মোটর কিনতে লুৎফরকে নিয়ে রিতু ইসলামপুরে যান। সেখান থেকে মোটর কিনে দু’জন মিলে রায় সাহেব বাজার মোড়ে আসেন। সেখানে রিতু মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে যান। এ সময় মাথায় পানি ঢেলে তাকে সুস্থ করে তোলেন লুৎফর। এরপর রিতুকে রায়েরবাগে পৌঁছে দেন লুৎফর। এ সূত্র ধরে তাদের সঙ্গে প্রায়ই টেলিফোনে কথা হতো।

লুৎফর জানান, পরিচয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই জুনে রিতু বাসা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। বাসা পরিবর্তনের সময় লুৎফরকে রিতু জানায়, বাড়িওয়ালা ব্যাচেলর ভাড়া দেয় না। তাই এ বিষয়ে তুমি আমাকে একটু সহায়তা করবে। তুমি বাড়িওয়ালাকে বলবে আমরা স্বামী-স্ত্রী। তোমার নাম বলবে নাদিম (রিতুর সাবেক স্বামী)। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর কথা বলবে।

সে অনুযায়ী, ১ জুন তারা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ২০১ নম্বর নিমাইকাশারী এলাকার আবদুর রহিমের বাড়ির একটি রুমে উঠেন। ২০ জুন রাতে লুৎফর রুমে উচ্চশব্দে টিভি দেখছিলেন। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। লুৎফরকে থাপ্পড় দেন রিতু। ক্ষুব্ধ হয়ে ইটের টুকরো দিয়ে রিতুর মাথায় আঘাত করেন লুৎফর। এতে অচেতন হয়ে খাটের ওপর পড়ে যান রিতু। এ সময় রিতুর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন লুৎফর। রাতটি লাশের পাশে কাটিয়ে সকালে রুমটি বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যান তিনি। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর হলেও হত্যাকাণ্ডের পর তিনি চলে যান হবিগঞ্জে। ৩-৪ মাস সেখানে থাকার পর তিনি আবার ঢাকায় আসেন।

দীর্ঘদিন পর কিভাবে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করলেন জানতে চাইলে সিআইডির এসআই সেলিম রেজা যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানতে পারি ভিকটিম রিতু রায়েরবাগ এলাকায় টেইলারিংয়ের কাজ করতেন। রায়েরবাগে গিয়ে ছবি দেখিয়ে তার দর্জি দোকান শনাক্ত করি। কিন্তু সেখান থেকে রিতুর স্বামীর বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রিতু আগে যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেখানে গিয়ে জানা যায়, ওই বাড়িতে তিনি (রিতু) শায়লা নামে ভাড়া থাকতেন। বাড়ির মালিক জানান, আসামি নাদিমের বাড়ি নরসিংদী সদরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে এলাকার মানুষদের ছবি দেখিয়েও আসামি নাদিমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভিকটিম রিতুর কললিস্ট পর্যালোচনা করে একটি নম্বর শনাক্ত করি। ওই নম্বরটি রিতুর একটি সেটে স্থাপন করে ঘটনার কয়েকদিন আগে ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ২০ জুন পর্যন্ত ওই নম্বরটি নিমাইকাশারী এলাকায় ব্যবহার হয়েছে। ২১ জুন ওই নম্বরটির অবস্থান ছিল হবিগঞ্জের মাধবপুরে। তখন আমি ওই নম্বর ব্যবহারকারীকে ঘাতক হিসেবে সন্দেহ করি। তার মোবাইলের রেজিস্ট্রেশন ফরম থেকে ছবি সংগ্রহ করি। রেজিস্ট্রেশন ফরমে তার ঠিকানা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার বীরপাশা গ্রামে।

সেখানে গিয়ে ঠিকানার সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। কেউ বলে লুৎফর ঢাকার যাত্রবাড়ী থাকেন। আবার কেউ বলেন, পুরান ঢাকার সুরিটোলায় থাকেন। তিনি ব্যাগের কাজ করেন। পরে আমি যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ ও সুরিটোলা এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন ব্যাগের কারখানায় তাকে খুঁজতে থাকি। কিন্তু তার সন্ধান মিলছিল না।

সেলিম রেজা বলেন, বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হলে তারা জানান, জব্দকৃত পাসপোর্ট হল গুরুত্বপূর্ণ আলামত। তাই পাসপোর্টে থাকা ঠিকানা অনুযায়ী নড়াইলের লোহাগড়া থানার পদ্মবিলা গ্রামে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, ঘটনার ৩ বছর আগে থেকেই পাসপোর্টধারী ছানোয়ার শেখ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন।

ছানোয়ার শেখের ইমো নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। ছানোয়ার শেখ জানান, ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে তিনি প্রায়ই ঢাকায় যাতায়াত করতেন। তখন একদিন কুড়িল থেকে সায়েদাবাদ যাওয়ার পথে তার একটি ব্যাগ হারিয়ে যায়। ওই ব্যাগে তার পাসপোর্ট, চেকবই এবং কিছু টাকা ছিল। এ ঘটনায় তখন ভাটারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল।

সিআইডির এসআই বলেন, পাসপোর্টধারী ছানোয়ার শেখ সন্দেহের বাইরে চলে যাওয়ার পর লুৎফরের ছবি নিয়ে বারবার ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় যাই। একদিন বাড়ির গলির মাথায় একটি লেপ-তোশকের দোকানে ছবিটি দেখালে এক ব্যক্তি জানান, এ লোকটাকে তিনি ওই ভিকটিমের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতে দেখেছেন।

এরপর তাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেই। তার কললিস্ট অনুযায়ী পুরান ঢাকার মালিটোলা এলাকায় যাই। ব্যাগের ক্রেতা হিসেবে বিভিন্ন কারখানায় গেলেও লুৎফরের খোঁজ মিলছিল না। একপর্যায়ে ব্যাগের ক্রেতা সেজে লুৎফরকে সরাসরি ফোন দেই। বেশ কয়েকদিন ঘোরানোর পর ১১ ফেব্রুয়ারি মালিটোলার কারখানায় দেখা দেয় লুৎফর। তার সঙ্গে কয়েকজন ছিল।

তাই ঠিকমতো লুৎফরকে চিনতে পারছিলাম না। ব্যাগের দাম-দর নিয়ে আলোচনার এক ফাঁকে সবাইকে ছোট ভাই সম্বোধন করে কার গ্রামের বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজনগরের ঠিকানা বলেন তাকে ‘দোস্ত’ সম্বোধন করে ‘তুই আমাকে চিনিস নাই’ বলে জড়িয়ে ধরি। এ সময় আমার সঙ্গে থাকা এসআই জিয়া উদ্দিন উজ্জ্বল তার হাতে হাতকড়া পরায়।

পরে আমরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে বিষয়টি বংশাল থানার ওসিকে জানাই। পরে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।

নারায়ণগঞ্জে রিতু হত্যা

টিভি দেখা নিয়ে বিতণ্ডা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ খুন

২০ মাস পর রহস্য উদ্ঘাটন * ২ সপ্তাহের পরিচয়েই লিভ টুগেদার
 সিরাজুল ইসলাম 
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
টিভি দেখা নিয়ে বিতণ্ডা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ খুন
প্রতীকী ছবি

রাজধানীর পুরান ঢাকায় সেলাই মেশিনের মোটর কিনতে গিয়ে লেদার ব্যাগের কারিগর লুৎফর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় টেইলারিং কারিগর নাজমা আক্তার রিতুর।

২ সপ্তাহের পরিচয়েই তারা লিভ টুগেদার শুরু করেন। এর ২১ দিনের মাথায় বাসায় টেলিভিশন দেখা নিয়ে দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। রিতু থাপ্পড় মারেন লুৎফরকে। প্রতিশোধ নিতে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় রিতুকে।

হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে বেগ পেতে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। কারণ, এক যুগ আগে প্রেম করে নজরুল ইসলাম নাদিম নামের এক যুবককে বিয়ে করেছিলেন রিতু। এরপর থেকে তিনি ছিলেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। নাদিমের বিষয়ে তেমন কিছু জানা ছিল না রিতুর পরিবারের সদস্যদের। হত্যার পর রিতুর পরিবারের পক্ষ থেকে নাদিমকে দায়ী করা হয়।

প্রকৃত অর্থে নাদিমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রিতুর যোগাযোগ ছিল না। এ বিষয়টিও রিতুর পরিবারের সদস্যরা জানতেন না। অন্যদিকে লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ওই ঘর থেকে ছানোয়ার শেখ নামে এক ব্যক্তির পাসপোর্ট জব্দ করে। পুলিশ ছানোয়ারকে ঘিরেও তদন্ত চালায়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ৩ বছর আগে থেকেই ছানোয়ার বিদেশে অবস্থান করছিলেন। তদন্তে জানা যায়, ছানোয়ারের সঙ্গে রিতুর কোনো পরিচয়ই ছিল না।

অবশেষে ২০ মাস পর রহস্য উদ্ঘাটন করে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। এরইমধ্যে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে লুৎফর। শিগগিরই এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২২ জুন নারায়ণগঞ্জের ২০১ নম্বর নিমাইকাশারী এলাকার বাসা থেকে রিতুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রিতুর ভাই আবদুর রশিদ বাদী হয়ে ওই বছরের ২৬ জুন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় রিতুর সাবেক স্বামী নজরুল ইসলাম নাদিমকে একমাত্র আসামি করা হয়।

এজাহারে বলা হয়, ২০১৮ সালের ১ জুন রিতু ও নাদিম ওই বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া উঠে। গ্রামের বাড়ি নরসিংদী (প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া) বলে জানায়। ২২ জুন ওই দম্পতির তালাবদ্ধ রুম থেকে দুর্গন্ধ পান আশপাশের ভাড়াটিয়ারা। পরে বাড়ির মালিক থানায় খবর দিলে পুলিশ তালা ভেঙে ৩১ বছর বয়সী রিতুর লাশ উদ্ধার করে। এ সময় ভিকটিমের রুম থেকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, ছানোয়ার শেখ নামের একজনের পাসপোর্ট ও দুটি চেকবই জব্দ করে পুলিশ। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের খবর দেয় পুলিশ।

সিআইডি প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে জানান, তদন্ত চলাকালে ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কললিস্টের সূত্র ধরে মাসুদ মিয়া নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়।

কারণ, রিতুর সঙ্গে টেলিফোনে মাসুদ অনেক কথা বলেছেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, মাসুদের সঙ্গে রিতুর খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। মাসুদের মতো অনেকের সঙ্গেই রিতুর কথা হতো।

পরে আরেকটি নম্বরের কললিস্টের সূত্র ধরে ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বংশালের মালিটোলা থেকে লুৎফর রহমানকে গ্রেফতার করে এসআই সেলিম রেজার নেতৃত্বাধীন সিআইডির একটি টিম। পরদিন সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাতেই উঠে আসে হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত।

লুৎফরের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে সিআইডির ডিআইজি মাইনুল হাসান যুগান্তরকে বলেন- ২০১৮ সালের মে মাসে সেলাই মেশিনের মোটর কিনতে পুরান ঢাকার নবাবপুরে যান রিতু। সেখানে রাস্তায় লুৎফরের সঙ্গে দেখা হয়। লুৎফর নবাবপুরের পাশে মালিটোলায় ব্যাগ সেলাইয়ের কাজ করেন।

লুৎফরের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর রিতু তাকে বলেন, আমি একটি মোটর কিনব। আমাকে একটু হেল্প করুন। এরপর রিতুকে নিয়ে লুৎফর পাশের কয়েকটি দোকানে গিয়ে সেলাই মেশিনের বেশকিছু মোটর দেখেন। কিন্তু কোনোটিই রিতুর পছন্দ হয়নি। তাই মোটর কিনতে লুৎফরকে নিয়ে রিতু ইসলামপুরে যান। সেখান থেকে মোটর কিনে দু’জন মিলে রায় সাহেব বাজার মোড়ে আসেন। সেখানে রিতু মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে যান। এ সময় মাথায় পানি ঢেলে তাকে সুস্থ করে তোলেন লুৎফর। এরপর রিতুকে রায়েরবাগে পৌঁছে দেন লুৎফর। এ সূত্র ধরে তাদের সঙ্গে প্রায়ই টেলিফোনে কথা হতো।

লুৎফর জানান, পরিচয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই জুনে রিতু বাসা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। বাসা পরিবর্তনের সময় লুৎফরকে রিতু জানায়, বাড়িওয়ালা ব্যাচেলর ভাড়া দেয় না। তাই এ বিষয়ে তুমি আমাকে একটু সহায়তা করবে। তুমি বাড়িওয়ালাকে বলবে আমরা স্বামী-স্ত্রী। তোমার নাম বলবে নাদিম (রিতুর সাবেক স্বামী)। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর কথা বলবে।

সে অনুযায়ী, ১ জুন তারা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ২০১ নম্বর নিমাইকাশারী এলাকার আবদুর রহিমের বাড়ির একটি রুমে উঠেন। ২০ জুন রাতে লুৎফর রুমে উচ্চশব্দে টিভি দেখছিলেন। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। লুৎফরকে থাপ্পড় দেন রিতু। ক্ষুব্ধ হয়ে ইটের টুকরো দিয়ে রিতুর মাথায় আঘাত করেন লুৎফর। এতে অচেতন হয়ে খাটের ওপর পড়ে যান রিতু। এ সময় রিতুর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন লুৎফর। রাতটি লাশের পাশে কাটিয়ে সকালে রুমটি বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যান তিনি। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর হলেও হত্যাকাণ্ডের পর তিনি চলে যান হবিগঞ্জে। ৩-৪ মাস সেখানে থাকার পর তিনি আবার ঢাকায় আসেন।

দীর্ঘদিন পর কিভাবে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করলেন জানতে চাইলে সিআইডির এসআই সেলিম রেজা যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানতে পারি ভিকটিম রিতু রায়েরবাগ এলাকায় টেইলারিংয়ের কাজ করতেন। রায়েরবাগে গিয়ে ছবি দেখিয়ে তার দর্জি দোকান শনাক্ত করি। কিন্তু সেখান থেকে রিতুর স্বামীর বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রিতু আগে যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেখানে গিয়ে জানা যায়, ওই বাড়িতে তিনি (রিতু) শায়লা নামে ভাড়া থাকতেন। বাড়ির মালিক জানান, আসামি নাদিমের বাড়ি নরসিংদী সদরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে এলাকার মানুষদের ছবি দেখিয়েও আসামি নাদিমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভিকটিম রিতুর কললিস্ট পর্যালোচনা করে একটি নম্বর শনাক্ত করি। ওই নম্বরটি রিতুর একটি সেটে স্থাপন করে ঘটনার কয়েকদিন আগে ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ২০ জুন পর্যন্ত ওই নম্বরটি নিমাইকাশারী এলাকায় ব্যবহার হয়েছে। ২১ জুন ওই নম্বরটির অবস্থান ছিল হবিগঞ্জের মাধবপুরে। তখন আমি ওই নম্বর ব্যবহারকারীকে ঘাতক হিসেবে সন্দেহ করি। তার মোবাইলের রেজিস্ট্রেশন ফরম থেকে ছবি সংগ্রহ করি। রেজিস্ট্রেশন ফরমে তার ঠিকানা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার বীরপাশা গ্রামে।

সেখানে গিয়ে ঠিকানার সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। কেউ বলে লুৎফর ঢাকার যাত্রবাড়ী থাকেন। আবার কেউ বলেন, পুরান ঢাকার সুরিটোলায় থাকেন। তিনি ব্যাগের কাজ করেন। পরে আমি যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ ও সুরিটোলা এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন ব্যাগের কারখানায় তাকে খুঁজতে থাকি। কিন্তু তার সন্ধান মিলছিল না।

সেলিম রেজা বলেন, বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হলে তারা জানান, জব্দকৃত পাসপোর্ট হল গুরুত্বপূর্ণ আলামত। তাই পাসপোর্টে থাকা ঠিকানা অনুযায়ী নড়াইলের লোহাগড়া থানার পদ্মবিলা গ্রামে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, ঘটনার ৩ বছর আগে থেকেই পাসপোর্টধারী ছানোয়ার শেখ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন।

ছানোয়ার শেখের ইমো নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। ছানোয়ার শেখ জানান, ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে তিনি প্রায়ই ঢাকায় যাতায়াত করতেন। তখন একদিন কুড়িল থেকে সায়েদাবাদ যাওয়ার পথে তার একটি ব্যাগ হারিয়ে যায়। ওই ব্যাগে তার পাসপোর্ট, চেকবই এবং কিছু টাকা ছিল। এ ঘটনায় তখন ভাটারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল।

সিআইডির এসআই বলেন, পাসপোর্টধারী ছানোয়ার শেখ সন্দেহের বাইরে চলে যাওয়ার পর লুৎফরের ছবি নিয়ে বারবার ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় যাই। একদিন বাড়ির গলির মাথায় একটি লেপ-তোশকের দোকানে ছবিটি দেখালে এক ব্যক্তি জানান, এ লোকটাকে তিনি ওই ভিকটিমের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতে দেখেছেন।

এরপর তাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেই। তার কললিস্ট অনুযায়ী পুরান ঢাকার মালিটোলা এলাকায় যাই। ব্যাগের ক্রেতা হিসেবে বিভিন্ন কারখানায় গেলেও লুৎফরের খোঁজ মিলছিল না। একপর্যায়ে ব্যাগের ক্রেতা সেজে লুৎফরকে সরাসরি ফোন দেই। বেশ কয়েকদিন ঘোরানোর পর ১১ ফেব্রুয়ারি মালিটোলার কারখানায় দেখা দেয় লুৎফর। তার সঙ্গে কয়েকজন ছিল।

তাই ঠিকমতো লুৎফরকে চিনতে পারছিলাম না। ব্যাগের দাম-দর নিয়ে আলোচনার এক ফাঁকে সবাইকে ছোট ভাই সম্বোধন করে কার গ্রামের বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজনগরের ঠিকানা বলেন তাকে ‘দোস্ত’ সম্বোধন করে ‘তুই আমাকে চিনিস নাই’ বলে জড়িয়ে ধরি। এ সময় আমার সঙ্গে থাকা এসআই জিয়া উদ্দিন উজ্জ্বল তার হাতে হাতকড়া পরায়।

পরে আমরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে বিষয়টি বংশাল থানার ওসিকে জানাই। পরে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন