অসঙ্গতি রেখেই প্রতিবেদন দিয়েছে পিবিআই: সালমান শাহের পরিবারের অভিযোগ

  হাসিব বিন শহিদ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সালমান শাহ ও তার মা

বাংলা সিনেমার এক সময়ের জনপ্রিয় নায়ক সামলান শাহের অপমৃত্যুর মামলায় অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

সালমান শাহের পরিবারের অভিযোগ, অসঙ্গতি রেখেই পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রতিবেদন দিয়েছে।

সালমানের মা নীলা চৌধুরীর নারাজি আবেদনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতিবেদনে সাক্ষী করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নানা কারণে পিবিআইয়ের দেয়া ২৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে সালমানের পরিবার। প্রতিবেদনে সালমান শাহের আত্মহত্যার পেছনে নয়টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।

সালমান শাহের ভক্তরাও প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আগামী ৩০ মার্চ প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপন করা হবে। সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, ওই দিন আদালতে প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে নারাজি দেয়া হবে।

জানতে চাইলে লন্ডন থেকে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, তার ছেলে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ ছিল না। এটিকে (মৃত্যু) আত্মহত্যা বলা হলে মানুষ হাসবে। কাদের স্বার্থে এমন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে তা বোধগম্য নয়। দেশের আইনে অপরাধীদের বিচার না করলেও আল্লাহ প্রদত্ত অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন। অপরাধীদের কেউই শান্তিতে নেই।

নীলা চৌধুরীর আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, পিবিআইয়ের দেয়া প্রতিবেদনে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। সালমান শাহের মায়ের করা মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের সাক্ষী করে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

এমনকি মোহাম্মদপুর থানার এক মামলায় আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ তার দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সালমান শাহের হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আদালতে দিয়েছেন।

সেই আসামির জবানবন্দিও আমলে নেয়া হয়নি। এছাড়া কিছু কিছু বিষয় রয়েছে যা ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়। বরং সুপরিকল্পিত হত্যা বলে প্রমাণ করে। যেমন- অন্তত ৫০ থেকে ৬০ কেজি ওজনের একজন মানুষ (সালমান শাহ) ফ্যানের সঙ্গে ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করলে ফ্যানে ঘষা-মাজার দাগ থাকবে, কিন্তু তা নেই।

সালমানের লাশ নামাতে কেউ দেখেননি। এমনকি ওই সময় পুলিশও সেখানে উপস্থিত ছিল না। যে তোয়ালে দিয়ে সালমানকে মোছানো হয়েছে তা ভেজা ছিল। এতে করে আঙুলের ছাপসহ নানা প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছে।

ঘরটি একদম পরিচ্ছন্নভাবে মোছা ছিল। যাতে কোনো আলামত না থাকে। আর পোস্টমর্টমের পর লাশের গায়ে- বুকে কাটা দাগ থাকার কথা। কিন্তু সালমানের লাশে এমন কোনো কাটা দাগ ছিল না।

পিবিআই বলছে, লাশ প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে তা করা কীভাবে সম্ভব হল? এছাড়া দড়িটি লাগানো ছিল ফ্যানের প্লাস্টিকের ওপর। আর প্লাস্টিকের ওপর দড়ি লাগানো হলে প্লাস্টিক ভেঙে যাওয়ার কথা। এসব নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে আদালতে আমরা নারাজি দাখিল করব।

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক মো. সিরাজুল ইসলাম (বাবুল) যুগান্তরকে বলেন, ক্যান্টমমেন্ট থানার এক চুরির মামলায় ১৯৯৭ সালে আসামি রেজভি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ওই ১১ জনের মধ্যে তিনজনের কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনভাবে বলা হয়েছে- যাতে ওইসব কথা বিশ্বাসযোগ্য হয়। মামলাটি ছিল চুরির।

আর সেই মামলায় ওই সংক্রান্ত কোনো স্বীকারোক্তি না দিয়ে সালমান শাহর অপমৃত্যুর মামলার বিষয়ে রেজভি স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এরপর একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে রেজভি বলেছে- তাকে ভয়-ভীতি ও মারধরের মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য অনুসারে জবানবন্দি দেয়াতে বাধ্য করা হয়েছে।

এ জন্য ওই থানার তৎকালীন এসআই ও ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। রেজভির বক্তব্য আমরাও গ্রহণ করেছি। স্বীকারোক্তিতে দেয়া ওই বক্তব্য মিথ্যা বলে রেজভি আমাদের কাছেও স্বীকার করেছে। তবে তাকে প্রতিবেদনে সাক্ষী করা হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআই কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনার সম্পর্কে যারা জানেন তাদের সাক্ষী করা হয়েছে। নীলা চৌধুরী যাদের বিরুদ্ধে নারাজিতে অভিযোগ করেছেন এবং যারা ঘটনা সম্পর্কে জানেন তাদের বক্তব্য যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে তাদের সাক্ষী করা হয়েছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রাবেয়া সুলতানা রুবি তার প্রথম বক্তব্যে সালমানের মৃত্যুকে হত্যা বলে অভিহিত করেন। অবশ্য পরে ভিডিও বার্তায় তিনি তা অস্বীকার করেন। রুবি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে আমাদের কাছে তার বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন- সে সব কাগজও দাখিল করা হয়েছে। আমরা তার বক্তব্য পর্যালোচনা করেছি। শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

রেজভির জবানবন্দি : ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই সালমানের বাবার ডিওএইচএস’র বাসায় রেজভী হাজির হয়। সালমানের বাবা তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। এর ঠিক তিনদিন পর রিজভী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

জবানবন্দিতে রেজভী জানায়, সালমানকে ঘুমাতে দেখে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ফারুক পকেট থেকে ক্লোরোফর্মের শিশি বের করে এবং সামিরা তা রুমালে দিয়ে সালমানের নাকে চেপে ধরে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে আজিজ মোহাম্মদ ভাই এসে সালমানের পা বাঁধে ও ইনজেকশন পুশ করে। এতে সামিরার মা ও সামিরা সহায়তা করে। পরে ড্রেসিং রুমে থাকা মই নিয়ে এসে, ডনের সঙ্গে আগে থেকেই নিয়ে আসা প্লাস্টিকের দড়ি আজিজ মোহাম্মদ ভাই সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝোলায়। সালমানকে হত্যা করতে ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদের সঙ্গে সামিরার মা লাতিফা হক ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেন।

আদালতে স্বীকারোক্তি দিলেও পরে রেজভী তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে রেজভী জানায়, সালমান শাহের হত্যা বিষয়ে সে কিছুই জানে না। রেজভী এখন কোথায় আছে, কেমন আছে তা কেউ বলতে পারছে না।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে যা আছে : সালমান শাহের মৃত্যু নিয়ে করা পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তের বিস্তারিত কার্যক্রম তুলে ধরা হয়েছে। সালমান শাহের লাশ যে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে ছিল সেই ফ্যানসহ ৪৭টি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সালমানের সুইসাইডাল নোটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সালমান শাহের প্যাডে তৈরি সুইসাইডাল নোটে বলা হয়- ‘আজকের পর যে কোনো দিন আমার মৃত্যু হলে তার জন্য কেউ দায়ী থাকবে না।’ এতে থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও সিআইডির পুলিশের তদন্ত কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে ৪৪ জনের আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেয়ার তথ্য দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামের এক ফ্যাশন শোতে সামিরার সঙ্গে সালমান শাহের পরিচয় হয়। ১৯৯১ সালের ১৮ আগস্ট সালমান তার বাবা-মার সঙ্গে সামিরাকে পরিচয় করিয়ে দেন।

এ বিষয়ে সালমানকে মা বকাবকি করলে সালমান আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপর ১৯৯২ সালের ২০ ডিসেম্বর সালমান শাহ গোপনে সামিরাকে বিয়ে করেন। নায়িকা শাবনূর তাদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করত বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুসারে ৯ কারণে সালমান শাহের আত্মহত্যা : প্রতিবেদনে আত্মহত্যার নয়টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ১. সালমান শাহের গলা বরাবর ঘাড়ে কোনো প্রকার দাগ ছিল না। শরীরেও কোনো আঘাত বা দাগের চিহ্ন নেই।

২. ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। ৩. প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টেও একই তথ্য দেয়া হয়েছে। ৪. রাসায়নিক পরীক্ষায়ও আত্মহত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ৫. মৃত্যুর আগে সালমান শাহ সুইসাইডাল নোট লিখে গেছেন। সেখানে তার মৃত্যুর জন্য কেউকে দায়ী করা হয়নি। ৬. শাবনূরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। আর পরিবার তা মেনে নেয়নি বলেই সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

৭. ১৯৯২ সালের নভেম্বরে শাবনূরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। এতে সালমান স্যাভলন খেয়ে আত্মহত্যা করতে চান। ৮. সালমানের মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল না। ৯. দাম্পত্য জীবন সালমান-সামিরার কোনো সন্তান ছিল না।

সালমান শাহের মায়ের অভিযুক্তরা প্রতিবেদনে সাক্ষী : পিবিআইয়ের দাখিল করা সালমান শাহের মৃত্যুর প্রতিবেদনে ৫৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা, ডলি, মনোয়ারা, ডনকেও সাক্ষী করা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যু

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৩০ ৩৩ ২১
বিশ্ব ১৬,০৪,৫৩৫ ৩,৫৬,৬৬০ ৯৫,৭৩৪
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত