চেয়ারম্যান নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে রিট, পরমাণু শক্তি কমিশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা!

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৮ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তারা জানান, দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে কমিশন সভা। আগে প্রতি মাসে ৩ থেকে ৪টি সভা অনুষ্ঠিত হতো। কখনও কখনও সপ্তাহে একাধিক সভাও হতো। কিন্তু এই প্রথম এর ব্যত্যয় ঘটে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং একের পর এক বদলি আতঙ্কে সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। এতে দেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে চেয়ারম্যান নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ায় বঞ্চিত সিনিয়র বিজ্ঞানীদের মধ্যে ড. মো. আজিজুল হক হাইকোর্টে রিট করেন। শুনানি শেষে ১১ ফেব্রুয়ারি ৪ সপ্তাহের মধ্যে চেয়ারম্যান নিয়োগের আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- এ মর্মে ব্যাখ্যা তলব করে সরকারকে রুল দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ১ মাসের মধ্যে আবেদনকারীর আবেদন নিষ্পন্ন করে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে কোর্টকে জানাতে বলেছেন। মামলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী ড. আজিজুল হক যুগান্তরকে বলেন, পরমাণু শক্তি কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে বর্তমানে ১০ নম্বরে রয়েছেন। তার আগে আরও ৯ জন সিনিয়র বৈজ্ঞানিক রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এর আগে একজন বৈজ্ঞানিকের আবেদনের ভিত্তিতে সরকার কমিশনকে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করে দিতে বলেছিল। সে অনুযায়ী কমিশন সভা করে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু সে তালিকা থেকে সিনিয়রিটি অনুযায়ী চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়নি। এ কারণে কমিশনজুড়ে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে শনিবার সন্ধ্যায় কমিশন চেয়ারম্যান ডা. সানোয়ার হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার সেলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিনিয়র বৈজ্ঞানিক যুগান্তরকে বলেন, অচলাবস্থার কারণে দুই মাস ধরে কোনো কমিশন সভা করা সম্ভব হয়নি। সভায় কোনো সদস্য যোগদান করবেন না- এমন আশঙ্কায় এতদিন সভা আহবান করা হয়নি। আগামী সপ্তাহে কমিশনের সভা আহবানের কথা রয়েছে। কিন্তু জানা গেছে, অচলাবস্থা নিরসন না হলে ওই সভায় কমিশনের কোনো সদস্য যোগদান করবেন না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কমিশনের সভায় পাস করতে হয়। কিন্তু দুই মাস ধরে সভা না হওয়ায় এই প্রকল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কমরত বিজ্ঞানীদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ৪ জন সদস্য ও ১ জন চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে ‘কমিশন’ গঠিত হয়ে থাকে। চেয়ারম্যান কমিশনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োজিত থাকেন। কমিশনে কর্মরত বিজ্ঞানীদের মধ্য থেকে সরকার কর্তৃক চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বরের বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের আদেশে দেশের অন্যতম বিজ্ঞানী ডা. মো. সানোয়ার হোসেনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, সানোয়ার হোসেন কমিশনের বিজ্ঞানীদের জ্যেষ্ঠতাক্রমে ১০ নম্বরে। কিন্তু তারপরও তাকে ১ জানুয়ারি থেকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে চলতি দায়িত্ব নিয়োগ দেয়া হয়। এ অবস্থায় কমিশনে কর্মরত অন্য সদস্যরা কমিশনের সভায় যোগদান করছেন না।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলেছেন, শুধু এই নিয়োগই নয়, ইতিমধ্যে কমিশনে আরও বেশ কয়েকটি পদে বদলির আদেশ জারি এবং একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে ১ মাসের মধ্যে চারবার বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। রি-অ্যাক্টর ফিজিক্সে পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই বিজ্ঞানী তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে সাভারের এইআরই থেকে ঢাকার কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে নিউক্লিয়ার সেফটি সিকিউরিটি অ্যান্ড সেফগার্ডস (এনএসএসএস) বিভাগে বদলির অনুরোধ জানিয়ে আগের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাকে এনএসএসএস বিভাগে বদলি করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ৭ জানুয়ারি ওই বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে আবার সাভারে ফেরত পাঠানো হয়। ১২ জানুয়ারি আবার তাকে ঢাকার শাহাবাগ পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের ইলেকট্রনিক্স বিভাগে বদলি করা হয়। ওই আদেশ বাতিল করে ১৩ জানুয়ারি তাকে আবারও প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয়। তবে ওই বদলিতে তাকে তার কাজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এনএসএসএস বিভাগে বদলি না করে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিভাগে বদলি করা হয়।

জানা গেছে, ১৩ ফেব্রুয়ারি আরেকটি বড় ধরনের বদলির আদেশ হয়। সেখানে দু’জন বৈজ্ঞানিককে প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয় এবং অপর একজন বৈজ্ঞানিককে কিউএমডি থেকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগে বদলি করা হয়। এছাড়া একজন সিনিয়র বৈজ্ঞানিককে আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিভাগ (আবিবি) থেকে এনএসএসএস বিভাগে বদলি করা হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি এসব বদলিতে ৩ বার আদেশ জারি করা হয়। আবিবি’র একজন শীর্ষ কর্মকর্তার পরামর্শ ও চাহিদা মোতাবেক বিভাগের কিছু জরুরি কাজ সম্পাদনের লক্ষ্যে ৩ মাস আগে একজনকে বদলি করে আবিবিতে আনা হয়। ওই বৈজ্ঞানিক আরও কিছুদিন আবিবিতে থাকতে আবেদন করলে তাকে এক চিঠিতে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়। কিন্তু ২৩-২৪ তারিখে ওই বৈজ্ঞানিক নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকায় ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানে বাধ্য হন। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন সিনিয়র বৈজ্ঞানিকের নামও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যাদের শিগগির অন্যত্র বদলি করা হবে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন কমিশন গঠনের পর এরই মধ্যে আগের কমিশনের নেয়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। এতে কমিশন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও হেয়প্রতিপন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ একাধিক বিজ্ঞানীর।

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত