দেশে প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন, জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার : প্রধানমন্ত্রী
jugantor
দেশে প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন, জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার : প্রধানমন্ত্রী
পদ্মা সেতু ছিল আমাদের আত্মসম্মানের ব্যাপার

  বাসস  

১৩ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-পাচ্চর-ভাঙ্গা পর্যন্ত বিশ্বমানের এক্সপ্রেসওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন

দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-পাচ্চর-ভাঙ্গা পর্যন্ত বিশ্বমানের এক্সপ্রেসওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তিনি। এর ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি দেশের প্রথম নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে। এটিকে জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার। এই এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যানবাহনগুলো কোনো ধরনের বাধা বা ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই সরাসরি গন্তব্যে যেতে পারবে। এর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য ধীরগতির যানবাহন চলাচলের পৃথক লেন নির্মাণ করা হয়েছে।’

শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় এই ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে হলে স্টিমার বা লঞ্চে যেতে হতো। আর আমাদের গোপালগঞ্জ যেতে স্টিমারেই ২৪ ঘণ্টা লাগত। লঞ্চে সময় লাগত আরও বেশি। ১৯৮১ সালে যখন দেশে ফিরে আসি, তখনও সেই অবস্থাই ছিল।’

তিনি বলেন, ‘শুধু সড়ক নয়, আমরা নৌ, বিমান ও রেলপথেরও উন্নয়ন করছি। পদ্মা সেতু ছিল আমাদের আত্মসম্মানের ব্যাপার। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। আপনারা জানেন পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল।

আমি সেটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। কানাডার কোর্টে প্রমাণ হয়, সেখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মানের। পদ্মা নদীর মতো একটি খরসে াতা নদীতে এজাতীয় সেতু নির্মাণ করাটা বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার থাকলেও আমরা এই সেতু নির্মাণ করছি।

সরকারপ্রধান দেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপানে তার প্রথম সফর স্মরণ করে বলেন, ‘আমি প্রথমবার সরকার গঠন করে জাপান যাই। তখন পদ্মা ও রূপসা সেতু নির্মাণের জন্য তাদের অনুরোধ করেছিলাম।’

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুও ১৯৭৩ সালে জাপান সফরে গিয়ে যমুনা সেতু নির্মাণের কথা বলেছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে যমুনা সেতু নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি করে দেয় জাপান। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরে যমুনা সেতু নির্মাণ করা হয়। পরে জাপানই পদ্মা সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডিও করে দেয়।’

একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জ সড়ক জোনে নির্মিত ২৫টি সেতু এবং তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় ৬ লেনবিশিষ্ট ৮ কিলোমিটার তৃতীয় কর্ণফুলী (শাহ আমানত সেতু) সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক উদ্বোধন করেন।

পরে পৃথক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী এদিন মুজিববর্ষ-২০২০ উদযাপন উপলক্ষে ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম-পরিচ্ছন্ন শহর’ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রকল্প বিষয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন।

রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, পিএমও’র এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ, পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ‘আন্তর্জাতিকমানের এই এক্সপ্রেসওয়ে দুইটি সার্ভিস লেনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এখন মাত্র ২৭ মিনিটে ঢাকা থেকে মাওয়ায় যাওয়া যাবে।’

প্রকল্পের বিবরণ অনুসারে এক্সপ্রেসওয়েতে পাঁচটি ফ্লাইওভার, ১৯টি আন্ডারপাস এবং প্রায় ১০০টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

এটিতে মাওয়া থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার এবং পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি এক্সপ্রেসওয়ে পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের একটি অংশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ের দুটির অংশ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত হবে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন। দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতুর চার কিলোমিটার মঙ্গলবার ২৬তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে ২০১৬ সালে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করে। নির্ধারিত সময়সীমার তিন মাস আগেই কাজ সম্পন্ন হয়।

৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে পাঁচটি ফ্লাইওভার রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২.৩ কিলোমিটার কদমতলী-বাবুবাজার লিংক রোড ফ্লাইওভার। অন্য চারটি ফ্লাইওভার হলো আবদুল্লাহপুর, শ্রীনগর, পুলিয়াবাজার এবং মালিগ্রামে।

এক্সপ্রেসওয়ের জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আটিতে চারটি রেলওয়ে ওভার ব্রিজ রয়েছে। রয়েছে চারটি বড় সেতু। এর মধ্যে ৩৬৩ মিটার ধলেশ্বরী-১, ৫৯১ মিটার ধলেশ্বরী-২, ৪৬৬-মিটার আড়িয়ালখাঁ এবং ১৩৬-মিটার কুমার সেতু।

এ যেন আকাশে ভ্রমণ : শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন উপলক্ষে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শিবচরের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ফরিদপুর থেকে আসা যাত্রী রুবাইয়েত হোসেন মুন্না বলেন, সড়কে নয়, যেন আকাশপথে ভ্রমণ। রাস্তায় নেই কোনো ঝামেলা। নেই ধুলাবালু। গাড়িতে উঠে বসার পর অল্প সময়ে ভাঙ্গা থেকে ফেরিঘাটে চলে আসি। এমন একটি প্রকল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই।

ঢাকা থেকে আসা বরিশালগামী যাত্রী সজীব হোসেন জানান, অবিশ্বাস্য ব্যাপার- মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে আমাদের বাস মাওয়া ঘাটে এসে পৌঁছল। আগে সময় লাগত প্রায় দেড় ঘণ্টা।

খুশি শরীয়তপুরের মানুষ : শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন হওয়ায় শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কারণ এই সড়ক ঢাকার সঙ্গে শরীয়তপুরের যাতায়াতের সময় অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত সহজ করেছে।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন উপলক্ষে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। এতে জেলা পরিষদের চেয়াম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেদুর রহমান খোকা সিকদার, জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের, পুলিশ সুপার এসএম আশরাফুজ্জামানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

আনন্দে উদ্বেলিত ভাঙ্গাবাসী : ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনে আনন্দে উদ্বেলিত ফরিদপুরের ভাঙ্গাবাসী। সবার চোখে-মুখে এখন খুশির ঝিলিক। উপজেলা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, এতদিন আমাদের কাছে যা স্বপ্ন ছিল, আজ তা বাস্তবে পরিণত হল।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা ইচাহাক মোল্লা বলেন, আগে ঢাকা যেতে ৫ ঘণ্টা লাগত। এখন এক ঘণ্টায় ঢাকা যেতে পারব। ভাঙ্গা বাজার বণিক সমিতি সেক্রেটারি আবুজাফর মুন্সী বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ায় আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা হল।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন উপলক্ষে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই সম্মেলন কক্ষে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মৃধা, পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান, ফরিদপুরে র‌্যাব-৮-এর কমান্ডার মেজর সাব্বির হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঝর্না হাসান ও ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুর রহমান খান প্রমুখ।

উদ্বোধনের খবর শুনে ভাঙ্গার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সফিউদ্দিন মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, ভাঙ্গা এলাকায় এখন নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। এ অঞ্চলের লোক এখন বাড়ি থেকে ঢাকায় গিয়ে অনায়াসে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোবাহান মুন্সী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে দৃশ্যমান হলো। এটি উন্নয়নের মাইলফলক। বিশাল এই কাজ সম্পাদনের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।

ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের বনফুল পরিবহনের চালক মোকলেচুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত আসতে ফেরি বাদে দেড় ঘণ্টা সময় লেগেছে। এ ছাড়া আগে সড়কে নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না। নতুন সড়কে এলোপাতাড়ি গাড়ি চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে দুর্ঘটনা কম হবে।

ট্রাকচালক শেখ রহমান জানান, ২২ মিনিটে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা এসেছেন। বিষয়টি স্বপ্নের মতো। স্বাধীন লিং পরিবহনের ড্রাইভার আবদুস ছালাম জানান, মাওয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে আসলাম, মনে হয়েছে বিদেশি কোনো রাস্তা দিয়ে এলাম। মাওয়া ঘাট থেকে মাত্র ২৫ মিনিটে ভাঙ্গায় পৌঁছালাম। আগে ২ ঘণ্টা সময় লাগত। গাড়ির ব্রেকে পা দেয়া লাগে নাই।

দেশে প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন, জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার : প্রধানমন্ত্রী

পদ্মা সেতু ছিল আমাদের আত্মসম্মানের ব্যাপার
 বাসস 
১৩ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-পাচ্চর-ভাঙ্গা পর্যন্ত বিশ্বমানের এক্সপ্রেসওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন
ছবি: যুগান্তর

দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-পাচ্চর-ভাঙ্গা পর্যন্ত বিশ্বমানের এক্সপ্রেসওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তিনি। এর ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি দেশের প্রথম নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে। এটিকে জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার। এই এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যানবাহনগুলো কোনো ধরনের বাধা বা ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই সরাসরি গন্তব্যে যেতে পারবে। এর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য ধীরগতির যানবাহন চলাচলের পৃথক লেন নির্মাণ করা হয়েছে।’

শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় এই ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে হলে স্টিমার বা লঞ্চে যেতে হতো। আর আমাদের গোপালগঞ্জ যেতে স্টিমারেই ২৪ ঘণ্টা লাগত। লঞ্চে সময় লাগত আরও বেশি। ১৯৮১ সালে যখন দেশে ফিরে আসি, তখনও সেই অবস্থাই ছিল।’

তিনি বলেন, ‘শুধু সড়ক নয়, আমরা নৌ, বিমান ও রেলপথেরও উন্নয়ন করছি। পদ্মা সেতু ছিল আমাদের আত্মসম্মানের ব্যাপার। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। আপনারা জানেন পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল।

আমি সেটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। কানাডার কোর্টে প্রমাণ হয়, সেখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মানের। পদ্মা নদীর মতো একটি খরসে াতা নদীতে এজাতীয় সেতু নির্মাণ করাটা বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার থাকলেও আমরা এই সেতু নির্মাণ করছি।

সরকারপ্রধান দেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপানে তার প্রথম সফর স্মরণ করে বলেন, ‘আমি প্রথমবার সরকার গঠন করে জাপান যাই। তখন পদ্মা ও রূপসা সেতু নির্মাণের জন্য তাদের অনুরোধ করেছিলাম।’ 

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুও ১৯৭৩ সালে জাপান সফরে গিয়ে যমুনা সেতু নির্মাণের কথা বলেছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে যমুনা সেতু নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি করে দেয় জাপান। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরে যমুনা সেতু নির্মাণ করা হয়। পরে জাপানই পদ্মা সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডিও করে দেয়।’

একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জ সড়ক জোনে নির্মিত ২৫টি সেতু এবং তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় ৬ লেনবিশিষ্ট ৮ কিলোমিটার তৃতীয় কর্ণফুলী (শাহ আমানত সেতু) সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক উদ্বোধন করেন।

পরে পৃথক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী এদিন মুজিববর্ষ-২০২০ উদযাপন উপলক্ষে ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম-পরিচ্ছন্ন শহর’ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রকল্প বিষয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন।

রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, পিএমও’র এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ, পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ‘আন্তর্জাতিকমানের এই এক্সপ্রেসওয়ে দুইটি সার্ভিস লেনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এখন মাত্র ২৭ মিনিটে ঢাকা থেকে মাওয়ায় যাওয়া যাবে।’

প্রকল্পের বিবরণ অনুসারে এক্সপ্রেসওয়েতে পাঁচটি ফ্লাইওভার, ১৯টি আন্ডারপাস এবং প্রায় ১০০টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

এটিতে মাওয়া থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার এবং পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি এক্সপ্রেসওয়ে পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের একটি অংশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। 

আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ের দুটির অংশ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত হবে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন। দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতুর চার কিলোমিটার মঙ্গলবার ২৬তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে ২০১৬ সালে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করে। নির্ধারিত সময়সীমার তিন মাস আগেই কাজ সম্পন্ন হয়। 

৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে পাঁচটি ফ্লাইওভার রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২.৩ কিলোমিটার কদমতলী-বাবুবাজার লিংক রোড ফ্লাইওভার। অন্য চারটি ফ্লাইওভার হলো আবদুল্লাহপুর, শ্রীনগর, পুলিয়াবাজার এবং মালিগ্রামে।

এক্সপ্রেসওয়ের জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আটিতে চারটি রেলওয়ে ওভার ব্রিজ রয়েছে। রয়েছে চারটি বড় সেতু। এর মধ্যে ৩৬৩ মিটার ধলেশ্বরী-১, ৫৯১ মিটার ধলেশ্বরী-২, ৪৬৬-মিটার আড়িয়ালখাঁ এবং ১৩৬-মিটার কুমার সেতু।

এ যেন আকাশে ভ্রমণ : শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন উপলক্ষে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শিবচরের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ফরিদপুর থেকে আসা যাত্রী রুবাইয়েত হোসেন মুন্না বলেন, সড়কে নয়, যেন আকাশপথে ভ্রমণ। রাস্তায় নেই কোনো ঝামেলা। নেই ধুলাবালু। গাড়িতে উঠে বসার পর অল্প সময়ে ভাঙ্গা থেকে ফেরিঘাটে চলে আসি। এমন একটি প্রকল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই। 

ঢাকা থেকে আসা বরিশালগামী যাত্রী সজীব হোসেন জানান, অবিশ্বাস্য ব্যাপার- মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে আমাদের বাস মাওয়া ঘাটে এসে পৌঁছল। আগে সময় লাগত প্রায় দেড় ঘণ্টা। 

খুশি শরীয়তপুরের মানুষ : শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন হওয়ায় শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কারণ এই সড়ক ঢাকার সঙ্গে শরীয়তপুরের যাতায়াতের সময় অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত সহজ করেছে।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন উপলক্ষে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। এতে জেলা পরিষদের চেয়াম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেদুর রহমান খোকা সিকদার, জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের, পুলিশ সুপার এসএম আশরাফুজ্জামানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

আনন্দে উদ্বেলিত ভাঙ্গাবাসী : ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনে আনন্দে উদ্বেলিত ফরিদপুরের ভাঙ্গাবাসী। সবার চোখে-মুখে এখন খুশির ঝিলিক। উপজেলা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, এতদিন আমাদের কাছে যা স্বপ্ন ছিল, আজ তা বাস্তবে পরিণত হল।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা ইচাহাক মোল্লা বলেন, আগে ঢাকা যেতে ৫ ঘণ্টা লাগত। এখন এক ঘণ্টায় ঢাকা যেতে পারব। ভাঙ্গা বাজার বণিক সমিতি সেক্রেটারি আবুজাফর মুন্সী বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ায় আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা হল।

এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন উপলক্ষে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই সম্মেলন কক্ষে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মৃধা, পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান, ফরিদপুরে র‌্যাব-৮-এর কমান্ডার মেজর সাব্বির হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঝর্না হাসান ও ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুর রহমান খান প্রমুখ।

উদ্বোধনের খবর শুনে ভাঙ্গার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সফিউদ্দিন মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, ভাঙ্গা এলাকায় এখন নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। এ অঞ্চলের লোক এখন বাড়ি থেকে ঢাকায় গিয়ে অনায়াসে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোবাহান মুন্সী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে দৃশ্যমান হলো। এটি উন্নয়নের মাইলফলক। বিশাল এই কাজ সম্পাদনের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।

ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের বনফুল পরিবহনের চালক মোকলেচুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত আসতে ফেরি বাদে দেড় ঘণ্টা সময় লেগেছে। এ ছাড়া আগে সড়কে নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না। নতুন সড়কে এলোপাতাড়ি গাড়ি চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে দুর্ঘটনা কম হবে।

ট্রাকচালক শেখ রহমান জানান, ২২ মিনিটে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা এসেছেন। বিষয়টি স্বপ্নের মতো। স্বাধীন লিং পরিবহনের ড্রাইভার আবদুস ছালাম জানান, মাওয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে আসলাম, মনে হয়েছে বিদেশি কোনো রাস্তা দিয়ে এলাম। মাওয়া ঘাট থেকে মাত্র ২৫ মিনিটে ভাঙ্গায় পৌঁছালাম। আগে ২ ঘণ্টা সময় লাগত। গাড়ির ব্রেকে পা দেয়া লাগে নাই।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন