ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালান: সম্পদের পাহাড় গড়েছেন চট্টগ্রামের আবু
jugantor
ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালান: সম্পদের পাহাড় গড়েছেন চট্টগ্রামের আবু
১৭ ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য * ২০ জনের বিরুদ্ধে সিআইডির মামলা

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো  

২১ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কসমেটিকস ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালানে জড়িত চট্টগ্রাম ফটিকছড়ির আবু আহম্মেদ ওরফে আবু (৪৯)। গত এক দশকে সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি তার নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াডের অর্গানাইজড টিম।

খোঁজ মিলেছে তার বিপুল পরিমাণ জমি ও প্রাসাদতুল্য বাড়ির। এরই জেরে সিআইডি বুধবার আবু আহম্মেদ ও তার ১৯ সহযোগীর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছে। আবু আহম্মেদ হচ্ছেন ফটিকছড়ি উপজেলার ফতেপুর গ্রামের ফয়েজ আহমেদ ওরফে বলি সওদাগরের ছেলে। পুলিশ বলছে, বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।

সূত্র জানায়, দেশের শীর্ষ সোনা চোরাকারবারিদের আবু আহম্মেদ অন্যতম। প্রসাধনী ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালান করে আবু এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। তার সম্পত্তির মধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ও জাহানপুর এলাকায় ২৪টি দলিল মূলে বহু জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার ১৬ কাঠা জমি ছাড়াও চান্দগাঁওয়ে ৬ তলা বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি রয়েছে। এছাড়া রাউজানের ফতেহনগর এলাকায় পল্লী কানন ও পল্লী শোভা কনভেনশন হল, ফটিকছড়ির জাফর নগর এলাকায় দৃষ্টিনন্দন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৩ তলা বাড়ি জাহানারা ম্যানশন, রিয়াজুদ্দিন বাজারে দুটি, স্যানমার ওশান সিটিতে একটি দোকান ছাড়াও দুবাইয়ে ২-৩টি দোকানের খোঁজ মিলেছে। ২০০৫ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তার নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

এদিকে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, মামলায় ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তারা জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন। এসব তথ্য যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। আবুর চোরাচালান সিন্ডিকেটে আর কেউ জড়িত থাকলেও তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।

এদিকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, নগরীর রিয়াজুদ্দিন বাজারকে ঘিরে আবু আহমেদের সোনা চোরাচালান ব্যবসা সক্রিয় ছিল। দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো স্বর্ণ রিয়াজুদ্দিন বাজার থেকে পরবর্তীতে পাচার করা হতো ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি রিয়াজুদ্দিন বাজারে অভিযান চালায় তৎকালীন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বাবুল আক্তার। অভিযানে রিয়াজুদ্দিন বাজারের বাহার মার্কেট থেকে তিনটি সিন্দুক জব্দ করে। এর মধ্যে একটি সিন্দুক থেকে ২৫০টি স্বর্ণের বার এবং আরেকটিতে পাওয়া যায় নগদ ৬০ লাখ টাকা। এ ঘটনায় আবু আহম্মেদ ও তার ম্যানেজার এনামুল হককে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় ৫টি মামলা আছে। এর মধ্যে ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ২০১৪ সালে ৯০৪ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় ঢাকা বিমানবন্দর থানায়। একই বছর একই বিমানবন্দরে ৫২৫ পিস সোনার বার এবং সৌদি রিয়েল এবং বিপুল অংকের টাকা উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় পল্টন থানায় এবং শাহবাগ থানায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

২০১৩ সালের ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর হিলভিউর বাসার সামনে থেকে একবার অপহৃত হন আবু। সে সময় ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান বলে জানা যায়। এর পরই আবুর আয়ের উৎস নিয়ে নড়েচড়ে বসে গোয়েন্দা সংস্থা। ওই ঘটনার দীর্ঘ ৫ মাস পর ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় মামলা করা হয় এবং ঐ মামলায় পুলিশ ৫ আসামিকে গ্রেফতার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেই আবুর নাম বেরিয়ে আসে। পুলিশ জানতে পারে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতেই আবুকে অপহরণ করা হয়।

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি মহসীন যুগান্তরকে জানান, সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড অর্গানাইজডের উপ-পুলিশ পরিদর্শক হারুন উর রশিদ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় বুধবার আবুর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলায় আবু ছাড়াও ইকবাল আহমেদ ওরফে নিজাম, আবু রাশেদ, এস এম আসিফুর রহমান, ওবায়দুল আকবর, রফিক, মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বাবলু, ইমরানুল হক কপিল চৌধুরী, এমতিয়াজ হোসেন, মোহাম্মদ আলী, ফরিদুল আলম, মোহাম্মদ এরশাদুল আলম, মো. হাসান, রুবেল চক্রবর্তী, মিনহাজ উদ্দিন, সাগর মহাজন, দিনবন্ধু সরকার, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক কমিশনার শাহজাহান ও টিটু ধরকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এদিকে গ্রেফতার ১২ জন বৃহস্পতিবার আদালে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে গডফাদার আবু সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালান: সম্পদের পাহাড় গড়েছেন চট্টগ্রামের আবু

১৭ ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য * ২০ জনের বিরুদ্ধে সিআইডির মামলা
 নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো 
২১ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কসমেটিকস ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালানে জড়িত চট্টগ্রাম ফটিকছড়ির আবু আহম্মেদ ওরফে আবু (৪৯)। গত এক দশকে সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি তার নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াডের অর্গানাইজড টিম।

খোঁজ মিলেছে তার বিপুল পরিমাণ জমি ও প্রাসাদতুল্য বাড়ির। এরই জেরে সিআইডি বুধবার আবু আহম্মেদ ও তার ১৯ সহযোগীর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছে। আবু আহম্মেদ হচ্ছেন ফটিকছড়ি উপজেলার ফতেপুর গ্রামের ফয়েজ আহমেদ ওরফে বলি সওদাগরের ছেলে। পুলিশ বলছে, বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।

সূত্র জানায়, দেশের শীর্ষ সোনা চোরাকারবারিদের আবু আহম্মেদ অন্যতম। প্রসাধনী ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালান করে আবু এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। তার সম্পত্তির মধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ও জাহানপুর এলাকায় ২৪টি দলিল মূলে বহু জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার ১৬ কাঠা জমি ছাড়াও চান্দগাঁওয়ে ৬ তলা বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি রয়েছে। এছাড়া রাউজানের ফতেহনগর এলাকায় পল্লী কানন ও পল্লী শোভা কনভেনশন হল, ফটিকছড়ির জাফর নগর এলাকায় দৃষ্টিনন্দন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৩ তলা বাড়ি জাহানারা ম্যানশন, রিয়াজুদ্দিন বাজারে দুটি, স্যানমার ওশান সিটিতে একটি দোকান ছাড়াও দুবাইয়ে ২-৩টি দোকানের খোঁজ মিলেছে। ২০০৫ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তার নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৪০৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

এদিকে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, মামলায় ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তারা জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন। এসব তথ্য যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। আবুর চোরাচালান সিন্ডিকেটে আর কেউ জড়িত থাকলেও তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।

এদিকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, নগরীর রিয়াজুদ্দিন বাজারকে ঘিরে আবু আহমেদের সোনা চোরাচালান ব্যবসা সক্রিয় ছিল। দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো স্বর্ণ রিয়াজুদ্দিন বাজার থেকে পরবর্তীতে পাচার করা হতো ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি রিয়াজুদ্দিন বাজারে অভিযান চালায় তৎকালীন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বাবুল আক্তার। অভিযানে রিয়াজুদ্দিন বাজারের বাহার মার্কেট থেকে তিনটি সিন্দুক জব্দ করে। এর মধ্যে একটি সিন্দুক থেকে ২৫০টি স্বর্ণের বার এবং আরেকটিতে পাওয়া যায় নগদ ৬০ লাখ টাকা। এ ঘটনায় আবু আহম্মেদ ও তার ম্যানেজার এনামুল হককে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় ৫টি মামলা আছে। এর মধ্যে ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ২০১৪ সালে ৯০৪ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় ঢাকা বিমানবন্দর থানায়। একই বছর একই বিমানবন্দরে ৫২৫ পিস সোনার বার এবং সৌদি রিয়েল এবং বিপুল অংকের টাকা উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় পল্টন থানায় এবং শাহবাগ থানায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

২০১৩ সালের ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর হিলভিউর বাসার সামনে থেকে একবার অপহৃত হন আবু। সে সময় ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান বলে জানা যায়। এর পরই আবুর আয়ের উৎস নিয়ে নড়েচড়ে বসে গোয়েন্দা সংস্থা। ওই ঘটনার দীর্ঘ ৫ মাস পর ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় মামলা করা হয় এবং ঐ মামলায় পুলিশ ৫ আসামিকে গ্রেফতার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেই আবুর নাম বেরিয়ে আসে। পুলিশ জানতে পারে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতেই আবুকে অপহরণ করা হয়।

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি মহসীন যুগান্তরকে জানান, সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড অর্গানাইজডের উপ-পুলিশ পরিদর্শক হারুন উর রশিদ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় বুধবার আবুর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলায় আবু ছাড়াও ইকবাল আহমেদ ওরফে নিজাম, আবু রাশেদ, এস এম আসিফুর রহমান, ওবায়দুল আকবর, রফিক, মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বাবলু, ইমরানুল হক কপিল চৌধুরী, এমতিয়াজ হোসেন, মোহাম্মদ আলী, ফরিদুল আলম, মোহাম্মদ এরশাদুল আলম, মো. হাসান, রুবেল চক্রবর্তী, মিনহাজ উদ্দিন, সাগর মহাজন, দিনবন্ধু সরকার, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক কমিশনার শাহজাহান ও টিটু ধরকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এদিকে গ্রেফতার ১২ জন বৃহস্পতিবার আদালে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে গডফাদার আবু সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।