ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন

নিত্যপণ্যের মজুদ পর্যাপ্ত

আমদানির পাইপলাইনে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য * মূল্য কারসাজি করলে কঠোর শাস্তি * মাঠে আছে ১১ সংস্থা, থাকছে গোয়েন্দা নজরদারি * প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য না কেনার আহ্বান

  ইয়াসিন রহমান ২৭ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া আমদানির পাইপলাইনে আছে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য। তাই করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন জেলা লকডাউন হলেও আসছে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তারপরও যদি কেউ কারসাজি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে।


পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে ইতোমধ্যে সরকারের ১১ সংস্থাকে মাঠে নামানো হয়েছে। সংস্থাগুলো হল- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল, র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), কৃষি বিপণন অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিং টিম। এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিও থাকবে।


জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কাছে যে তথ্য আছে তাতে দেশে নিত্যপণ্যের সংকট নেই। সরবরাহেও কোনো ঘাটতি হবে না। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। কারণ আমাদের চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে মজুদ আছে।


তিনি বলেন, ‘আশা করছি করোনার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না। এছাড়া আসন্ন রমজানেও পণ্যের দাম বাড়বে না। দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। কারসাজি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর কৌশল নেয়া হলে দায়ী ব্যবসায়ীকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, ভোক্তাকে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ দেশে খাদ্যপণ্যের কোনো ঘাটতি নেই।’ জানা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা, মজুদ, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কাছে চিঠি দেয়। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ট্যারিফ কমিশন পণ্যের চাহিদা, মজুদ, আমদানি পরিস্থিতি ও সরবরাহ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর দেশে চিনির চাহিদা ১৮ লাখ টন।

আর প্রতি মাসে চিনির চাহিদা এক লাখ ৩৫ হার্জান টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসে চাহিদা ৩ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে দেশে উৎপাদন হয়েছে ৬২ হাজার টন। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টন। সব মিলিয়ে দেশে সরবরাহ ১৯ লাখ ৩৭ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় পুরো বছরের চাহিদার তুলনায় দেশে বর্তমানে এক লাখ ৩৭ হাজার টন চিনি বেশি আছে। এছাড়া আরও বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানির পাইপলাইনে আছে।


দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। মাসে চাহিদা এক লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে শুধু রমজানে চাহিদা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার টন। মোট সরবরাহ ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। সেক্ষেত্রে বর্তমানে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন ভোজ্যতেল চাহিদার তুলনায় বেশি আছে।


একইভাবে দেশে বছরে মসুরের ডালের চাহিদা ৫ লাখ টন। এক মাসে চাহিদা ৩৮ হাজার টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসে চাহিদা ৮০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার টন। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেশে মোট সরবরাহ ৫ লাখ ৪২ হাজার টন। দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় বর্তমানে দেশে ৪২ হাজার টন ডাল বেশি আছে।
দেশে আদার চাহিদা বছরে ৩ লাখ টন। এক মাসে চাহিদা ২০ হাজার টন। শুধু রমজানে চাহিদা ৩৫ হাজার টন। দেশে উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে এক লাখ টন। মোট সরবরাহ ৩ লাখ ১৮ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় দেশে এখনও চাহিদার তুলনায় ১৮ হাজার টন বেশি আছে। দেশে রসুনের চাহিদা বছরে ৬ লাখ টন। এর মধ্যে মাসে চাহিদা ৪৫ হাজার টন। শুধু রমজান মাসে চাহিদা ৮০ হাজার টন। স্থানীয় উৎপাদন ৫ লাখ ৫২ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ৬৮ হাজার টন। সব মিলে এখন পর্যন্ত সরবরাহ ৬ লাখ ২ হাজার টন। বছরের চাহিদার তুলনায় বেশি আছে ২ হাজার টন।


অন্যদিকে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৭৩ হাজার টন চাহিদা থাকলেও রোজার মাসে চাহিদা থাকে ৫ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে এখন পর্যন্ত ১৭ লাখ ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার টন। সব মিলে এখন দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে ২৫ লাখ ৪৩ হাজার টন। সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ বেশি আছে এক লাখ ৪৩ হাজার টন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ছোলার বার্ষিক চাহিদা এক লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা ৮০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ৫ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে এক লাখ ৬৩ হাজার টন ছোলা। এতে দেশে ছোলার মোট সরবরাহ এক লাখ ৬৮ হাজার টন। সুতরাং এ মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় ৬৮ হাজার টন বেশি ছোলার মজুদ রয়েছে।


এছাড়া খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য মতে, (১৫ মার্চ ২০২০) খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ১৭ লাখ ৫১ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১৪ হাজার ২৯ লাখ টন এবং গম ৩ লাখ ২২ হাজার টন। খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে- এখন খাদ্যশস্যের মজুদ সন্তোষজনক। মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, মূলত কয়েকটা কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এর মধ্যে একটি হল- চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম থাকা। তবে কৃত্রিমভাবে ঘাটতি দেখিয়ে অনেক সময় দাম বাড়ানো হয়। তাই সরকারের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করতে না পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা যারা ভোক্তা, আমাদেরও পুরো মাসের পণ্য একবারে কেনার প্রবণতা বাদ দিতে হবে।


র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, বছরজুড়ে আমাদের সার্বিক অভিযান অব্যাহত আছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে অনেকেই কারসাজি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করায় ইতোমধ্যে অসাধুদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। এছাড়া রমজান যত ঘনিয়ে আসবে, অভিযান আরও জোরদার হবে। কারণ রমজানে খাবারের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল খাবার বিক্রি করে। তাই ভেজাল খাবারসহ বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।


বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি ও রমজান উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাজারে বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করছে। ইতোমধ্যে করোনার প্রভাবের অজুহাতে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়েছিল। তা তদারকির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে। তবে এরপরও যদি কোনো ব্যবসায়ী অসাধু পন্থায় পণ্যের দাম বাড়ায় তাহলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত