করোনাভীতি

বরিশালে ডাক্তাররা রোগী দেখছেন না

বন্ধ প্রায় সব বেসরকারি হাসপাতাল * চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জামের তীব্র সংকট

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ২৭ মার্চ ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শুরুর দিকে সর্দি-কাশি ও জ্বরের রোগীদের এড়িয়ে চললেও ক’দিন ধরে সব ধরনের রোগী দেখাই বন্ধ করে দিয়েছেন বরিশালের বেশিরভাগ চিকিৎসক। ফলে চিকিৎসক সংকট এখন চরমে। নগরীর ছোটখাটো ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। এটা চলতে থাকলে গুরুতর অসুস্থ রোগীরা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে।

বরিশালের প্রায় সব প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারের চেম্বারে বলতে গেলে জ্বর-সর্দি-কাশি এবং গলা ব্যথার রোগী নিষিদ্ধ। সরকারিভাবে জ্বর-সর্দি-কাশির রোগীদের জন্য হাসপাতালে আলাদা চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও সেটি মানার নজির বিরল। বরং তাদের নিয়ে চরম অবহেলার কথা শোনা যাচ্ছে। কথা হয় বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘তাদের জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগে আলাদা কর্নার করা হয়েছে। তাদের সেখানেই দেয়া হচ্ছে চিকিৎসা।’ এ ধরনের রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উপসর্গ দেখা দিলে করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হচ্ছে। এছাড়া অন্যদের সাধারণ চিকিৎসা দিয়েই বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’ তবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ার পর অবশ্য পাল্টে যায় পরিস্থিতি।

বরিশালের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান সাউথ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিম রেজা মোফাজ্জেল বলেন, ‘আমাদের এখানে ১৮-২০ জন ডাক্তারের চেম্বার রয়েছে। প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা দিই আমরা। কিন্তু ক’দিন ধরে অধিকাংশ ডাক্তার চেম্বার করছেন না। সর্বশেষ সোমবার চেম্বার করেছেন মাত্র দু’জন। বহু রোগী এসে ডাক্তার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।’ নগরীর বেলভিউ মেডিকেল সার্ভিসেসের পরিচালক মার্কেটিং লিয়াকত আলী জমাদ্দার বলেন, ‘বেশ কয়েকজন ডাক্তার চেম্বার করা বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা এখনও চেম্বার করছেন তাদের নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। হয়তো দেখা যাবে হঠাৎ করে তারা চেম্বারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন।’ সদর রোডের দক্ষিণাঞ্চল গলিতে থাকা প্রাইম ডায়াগনস্টিক ল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল হোসেন সরদার বলেন, ‘৬ জনের মধ্যে ২ জন চিকিৎসক চেম্বার করছেন। বহু রোগী প্রতিদিন ফিরে যাচ্ছেন।’ কনিকা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. কায়েস বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে আমাদের এখানে ৮ জন ডাক্তার চেম্বার করতেন। এখন কেউ-ই করছেন না।’

সোমবার থেকে বন্ধ হয়ে গেছে সদর রোডে থাকা ইউনিক মেডিকেল সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতান আহম্মেদ বাবুল বলেন, ‘তিন দিন ধরে কোনো ডাক্তার চেম্বার করছেন না। বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছি।’ চিকিৎসকের অভাবে বন্ধ করে দেয়া আরেকটি ডায়াগনস্টিক ল্যাবের মালিক বলেন, ‘চোখে অন্ধকার দেখছি। এখন সবচেয়ে বেশি দরকার ডাক্তারদের, সেখানে তারাই পালিয়েছেন। এ রকম হলে দুর্যোগ মোকাবেলা করব কীভাবে?’ নগরীর কলেজ রোড এলাকায় থাকা আরিফ মেমোরিয়াল হসপিটালের চেয়ারম্যান ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অধিকাংশ চিকিৎসক বলে দিয়েছেন যে, তারা এই মুহূর্তে হসপিটালে আসতে পারবেন না। চিকিৎসকের অভাবে দারুণ অসহায়বোধ করছি।’ বরিশাল ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ডাক্তাররা চেম্বার না করায় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই এখন বন্ধ হওয়ার পথে। আমি ছাড়া বলতে গেলে এখন আর কোনো চিকিৎসক নেই এখানে। পরিস্থিতি সামাল দেয়াই মুশকিল হয়ে পড়েছে।’ নগরীর আগরপুর রোডে থাকা মিডটাউন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. বনলতা মুর্শিদা বলেন, ‘চিকিৎসকদের হাসপাতালে আনতে রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকে তো ফোনই ধরছেন না।’

কয়েকজন চিকিৎসক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেছেন, ‘সংক্রমণ থেকে বাঁচার যথাযথ নিরাপত্তা উপকরণ না পাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। বাজারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই, মাস্ক নেই। নিরাপত্তা পোশাক তো দূরের কথা, সাধারণভাবে অপারেশন থিয়েটারে যে অ্যাপ্রোন পরি তাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোন ভরসায় জনসমাগমে বসে রোগী দেখব বলুন? সরকারিভাবে তো দূরের কথা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কোনো নিরাপত্তা উপকরণ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায়ই চেম্বার করা বন্ধ করেছি।’ বরিশাল নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘করোনার ভয়ে যদি তারা চেম্বার করা বন্ধ করেন তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু নেই। তাছাড়া কেবল জ্বর-সর্দি-কাশিই তো নয়, সড়ক দুর্ঘটনা, হাত-পা ভাঙা, বক্ষব্যাধিসহ অনেক রোগে মানুষ ভোগে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ডাক্তাররা যদি সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেয় তাহলে মানুষ কি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে? ক’জন মানুষ সরকারি হাসপাতালে যায়? এ নিয়ে জানতে চাইলে বরিশালের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস বলেন, ‘চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস সম্পর্কে আমার বলার কিছু নেই। এটা তাদের ব্যক্তিগত এখতিয়ার। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রয়েছে।’

লঞ্চ-বাসে ভিড় নেই, শহরে কমে গেছে চলাচল : বরিশাল ব্যুরোর সাইদুর রহমান পান্থ জানান, করোনা আতঙ্কে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে বরিশাল নগরী। আগের মতো নেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে আড্ডা, চায়ের দোকানে ভিড়। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বের হচ্ছেন না। ভিড় নেই লঞ্চ ও বাসেও। তবে ঢাকা থেকে নৌযান ও বাসে মানুষ আসার প্রবণতা বেড়েছে। বরিশাল থেকে ঢাকামুখী মানুষের সংখ্যা অনেক কম। বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেছেন, ‘হরতাল অবরোধে আমরা সব সহ্য করতে পারি, কিন্তু আজ জাতির স্বার্থে ঘরে থাকতে কেন এত অজুহাত। তিনি বলেন, চা-সিগারেটের দোকান, ক্লাব, সাধারণ হাটবাজার, সব ধরনের গণজমায়েত বৈঠক ও আড্ডা না দেয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।’ বরিশাল নগরীতে অনেকে অফিস করছেন বাসায় বসে। অনেকে আবার ছুটিও নিয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্ধ রয়েছে সিনেমা হল, বিভিন্ন হোটেল ও পর্যটন কেন্দ্র। ঢাকায় বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত জোবায়ের আহম্মেদ বলেন, ‘আমি বরিশালের বাড়িতে পরিবার রেখে গেছি। আসার সময় অনেক চাপ থাকলেও ঢাকা যাওয়ার সময় দেখলাম উল্টো চিত্র। কোনো যাত্রী নেই। ৬২০ ধারণ ক্ষমতার গ্রিন লাইন ওয়াটার ওয়েজে বরিশাল থেকে মাত্র ৫০-৬০ জন যাত্রী ওঠে। শেষপর্যন্ত তাদের নিয়েই ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে লঞ্চটি। একই অবস্থা বাসেও। বরিশাল নগরী থেকে বাকেরগঞ্জে অফিস করতে যাওয়া বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত শারমিন লুনা বলেন, আগে বাসে সিট পাওয়া যেত না। কিন্তু এখন মাত্র ৫-৬ জন নিয়েই বাস ছাড়ছে। তবে নারী হিসেবে এটি আবার আমার জন্য ঝুঁকির।’ বরিশাল জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আতঙ্কে মানুষ ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। দুই দিন আগেও ঢাকার যাত্রীদের চাপ ছিল। এখন কমে গেছে। বরিশাল থেকে কোনো যাত্রীই যাচ্ছে না ঢাকায়। বেসরকারি নৌযান সংস্থা ঢাকা-বরিশাল নৌরুটের যাত্রীবাহী লঞ্চ সুন্দরবনের কাউন্টার স্টাফ শাকিল আহম্মেদ বলেন, বরিশাল থেকে ঢাকায় মানুষ যাচ্ছে না। আগে কেবিনের টিকিট পাওয়া যেত না। এখন উল্টো চিত্র। তবে ঢাকা থেকে কিছু যাত্রী পাওয়া যায়। বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, যাত্রী কমে গেছে। গত দুই দিন ঢাকা থেকে বেশ কিছু যাত্রী এলেও বরিশাল থেকে ঢাকামুখী যাত্রী নেই বললেই চলে।

আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫১ ২৫
বিশ্ব ৮,৫৬,৯১৭১,৭৭,১৪১৪২,১০৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×