বিশেষজ্ঞদের মত: করোনা মোকাবেলায় সমন্বয়ের অভাব

অনেক বিষয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেন না * মন্ত্রী বললেন, আক্রান্ত ২৯ মৃত ৪ অধিদফতরের ঘোষণা ৩৫-৩

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিচ্ছে না। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ সংক্রান্ত অনেক বিষয় জানেন না। তিনি নিজেই এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সোমবার মন্ত্রী ঘোষণা দেন গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে নতুন সংক্রমিত হয়েছেন ২৯ জন, মারা গেছেন ৪ জন। এর দেড় থেকে দু’ঘণ্টা পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে বলা হয় আক্রান্ত ৩৫ মৃত ৩। এ অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সমন্বয়হীন কার্যক্রম ও অস্পষ্ট নির্দেশনা বন্ধ না করলে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা আছে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কমিটির সভাপতি এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক। সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের সচিবদের নিয়ে গঠিত কমিটি এই কমিটি। নিয়ম অনুযায়ী এই কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে সার্বিক করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা।

কিন্তু, স্বয়ং কমিটির সভাপতির বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সংস্থা, অধিদফতরের তথ্যের গড়মিল এবং কার্যক্রমে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। করোনা মোকাবেলায় সমন্বয়হীনতার বিষয়ে সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এদিন সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সে এক সভায় ডা. জাহিদ মালেক বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তবে করোনা মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ের যে কমিটি গঠন হয়েছে, ওই কমিটির সদস্যভুক্ত সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে সব তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানাচ্ছে না। এটা চলতে থাকলে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

এদিকে সোমবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মৃত ব্যক্তির পরিসংখ্যানও মন্ত্রী সঠিকভাবে দিতে পারেননি। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পকারখানা খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এ বিষয়েও তিনি কিছুই জানতেন না।

৫ এপ্রিল গার্মেন্টস খোলা বা বন্ধ রাখা নিয়ে ৪ তারিখ থেকে নানা ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৫ এপ্রিল থেকে গার্মেন্টস খোলা থাকার কথা। সে হিসাবে শ্রমিক কর্মচারীরা কষ্ট করে ঢাকা, চট্টগ্রামে ফিরেছেন। কিন্তু সরকার ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বৃদ্ধি করে।

করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানানো হয়। এর মধ্যে পোশক শিল্পকারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদানের জন্য ঢাকায় যেভাবে এসেছে তাতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। তারা ঢাকায় আসার পর পোশাক কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়।

ফলে তারা আবার ফিরে যায়। এ সময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা যায়নি। এতে তাদের ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরো বেড়েছে। অথচ বিষয়গুলো নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে নিলে এত সমস্যা হতো না।

সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হতো না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এখানেই সমন্বয়ের অভাব দেখছেন তারা। তারা বলেন, এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, সেগুলো সমন্বিতভাবে পালন করা হচ্ছে; এ ক্ষেত্রে আমরা কোনো সমস্যা দেখছি না।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সমস্যা হয়তো শত বছর পর একবার আসে। এ অবস্থায় প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। তার পরও আমরা কিন্তু জীবন বাজি রেখে কাজ করছি। যেমন দেখেন, ভোক্তা অধিকার অধিদফতর প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের সব দিকনির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে চলেছি। সংশ্লিষ্ট সবাইকে এসব বিষয় অবহিত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ক্রুটি হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এর পরও কেউ যদি বলে সমন্বয় হচ্ছে না; তাহলে তো আমাদের কষ্ট লাগে।’

সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যু সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন- সে বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, সোমবার সকালে একটি বৈঠক চলার সময় তিনি (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) ফোন করেছিলেন। আইইডিসিআর তাকে তথ্য দিয়েছিল।

সেটা সেই সময়ের জন্য ঠিক ছিল। পরে অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে শেষ আপডেট তথ্য জানানো হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘পৃথিবীর একটি দেশও করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমাদের দেশে তুলনামূলক ঘাটতি বেশি।

কিন্তু, এটা গোপন করার দরকার নেই; উন্নত দেশগুলোও সেটা করছে না। সব কিছু খোলসা করলে সেখানে সবাই নজর দিতে পারে। এতে সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। নইলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখার বলেন, ‘সরকারি ছুটির মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিয়ে আসার ঘটনায় চরম সমন্বয়হীনতা এবং অস্পষ্টতা ফুটে উঠেছে। এরপর নির্দেশনা এলেও সেটা মানছেন না অনেক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী।

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস একটা জাতীয় দুর্যোগ। এটা সবার সহযোগিতা নিয়েই মোকাবেলা করতে হবে। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, উদ্যোক্তা, বেসরকারি শিল্প কলকারখানাকে এ দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বউদ্যোগে ভূমিকা রাখতে হবে।’

এ বিষয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট আলমগীর সামসুল আলামীন যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনায় যথেষ্ট অস্পষ্টতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ৪ এপ্রিল বলা হয়েছে, গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ থাকবে। অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের কী হবে, সে ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।

এছাড়া অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেসব সচল রাখতে হলে, তাদের বাড়ি থেকে আসতে হবে। এদিকে গণপরিবহনগুলো বন্ধ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এদিকে পুলিশ বলছে, ঢাকা থেকে কাউকে বের হতে দেয়া হবে না। একই সঙ্গে কাউকে ঢুকতেও দেয়া হবে না।’

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকেই করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের কার্যক্রমে চরম সমন্বয়হীনতা এবং কিছু অসস্পষ্ট নির্দেশনা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে, নইলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস শনাক্ত চিহ্নিতকরণ পরীক্ষা এখন কেন্দ্রীভূত পর্যায়ে রয়েছে। এটা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। শুধু মহানগর বা জেলা নয়, উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও ছড়িয়ে দিতে হবে।’

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত