যুগান্তরকে শেখ কবির হোসেন

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সময়ের দাবি

ইউজিসির নির্দেশনায় যেসব সমস্যা আছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব

  মুসতাক আহমদ ১৩ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেছেন, শিক্ষা বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার মতো কার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থগিত রাখার সুযোগ নেই। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশ অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্জিত সুফল ব্যবহার করে আমরাও এই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম, ভর্তি ও পরীক্ষা গ্রহণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সার্বিক অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের অনুমতি দিয়েছে। আমরা একে সাধুবাদ জানাই।

চলমান করোনা সংক্রমণে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিস্থিতি ও অন্যান্য বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বর্ষীয়ান এই শিক্ষানুরাগী। বেসরকারি ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এফআইইউ) বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন আরও বলেন, বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। গ্রামপর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে ইন্টারনেট সেবা।

মানুষ ঘরে বসেই দেশ-বিদেশে ভিডিও কলে কথা বলছেন স্বজনের সঙ্গে। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ শতাংশই বর্তমানে মোবাইল সেবা নিচ্ছে। ইন্টারনেটসেবীর সংখ্যাও কম নয়। তাই এই সময়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার মানে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। সুতরাং বিশ্বের সঙ্গে তালমেলানো এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মসূচির অংশীদার হতেই এই করোনাকালে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সময়ের দাবি।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনলাইনে লেখাপড়া, ভর্তি ও পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে ১৪ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই নির্দেশনাটি এসেছে। ওই বৈঠকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটা শুধু এখনকার সংকট উত্তরণের জন্যই নয়, ভবিষ্যতের জন্যও দরকার বলে শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় ওই বৈঠকে অনলাইন কার্যক্রম শক্তিশালী করার ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

তিনি বলেন, নির্দেশনায় যেসব দিক এসেছে তাতে খুব খারাপ কিছু নেই। কিছু জায়গায় সমস্যা আছে। তবে আমরা মনে করছি, ইউজিসির সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় তা সমাধান সম্ভব। ঈদের পর আমরা ইউজিসির সঙ্গে আলোচনায় বসব। আশা করি, কোনো সমস্যা থাকবে না।

‘ইউজিসির তথ্য হচ্ছে- ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুই করেনি। প্রস্তুতি ছাড়া সেগুলো এখন কী করে অনলাইনে আসবে। এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ কবির হোসেন বলেন, অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিটিসিএল (টেলিযোগাযোগ বিভাগ) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহায়তা করতে পারে। তাদের সেই বিশেষ ব্যবস্থা আছে।

এ ছাড়া ইউজিসির সহায়তার হাত নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা (ইউজিসি) ভবন, ল্যাবরেটরি সব দেয়। শিক্ষকদের বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসে। শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠিয়ে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা লেখাপড়া করান এবং লেখাপড়া করছেন তারাও এ দেশেরই সন্তান। তাই এদিকে ইউজিসির নজর দেয়া দরকার। বরং আমি বলব, এ ব্যাপারে ইউজিসির আগে থেকেই ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিল। তিনি বলেন, অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশে আমরাও (সমিতি) থাকছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলেছি, কাকে-কীভাবে সহায়তা করা যেতে পারে, আপনারা জানান। এ বিষয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউজিসির নির্দেশনায় জুলাই থেকে ক্লাস এবং জুনে ভর্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে। এতে পরিষ্কারভাবে দুই সেমিস্টার প্রথা চালুর কথা বলা হয়নি। এটাকেই কেউ কেউ বলতে চাচ্ছেন, দুই সেমিস্টারের কথা বলতে চাচ্ছে ইউজিসি। আসলে সেটা নির্দেশনায় পরিষ্কার নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বছরে তিন সেমিস্টারে কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। সেটাই শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী। এ বিষয়ে আমরা ঈদের পর ইউজিসির সঙ্গে কথা বলব।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওনা নেয়ার ব্যাপারে মানবিক হওয়ার কথা বলা আছে নির্দেশনায়। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের কথাও আছে। আমি মনে করি, ইউজিসির নীতিনির্ধারকরা বিধান দেয়ার ক্ষেত্রে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি সামনে রাখেন। কিন্তু যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান সরকার আসার পর অনুমতি পেয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত নতুন, সেগুলোর পরিস্থিতি আর পুরনো এবং বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গতি সমান নয়।

যাদের বিষয়টি সামনে রেখে এই বিধান (বেতন-ভাতা পরিশোধ) করা হয়েছে, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যা নেই। সেখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ঠিকমতো পরিশোধ করা হয়েছে। আর যাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই তারা কেউ আংশিক পরিশোধ করেছে। এখানে ইচ্ছাকৃত বা সঙ্গতি থাকার পরও দেয়া হয়নি বলে আমার মনে হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সরকারের বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির প্রতিনিধি আছে। চ্যান্সেলরের নিযুক্ত ভিসি ও কোষাধ্যক্ষরাই আছেন। তাদের কাছ থেকেই সরকার তথ্য নিতে পারে যে, সঙ্গতি থাকার পরও কেউ বেতন-ভাতা দেয়া থেকে বিরত থেকেছে কি না বা আংশিক দিয়েছে কি না।

শুক্রাবাদে অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আছে। প্রতিষ্ঠানটির তুলনামূলক বেশ আয় আছে। এরপরও সেটি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মার্চে আংশিক দিয়েছে। এপ্রিলে এখনও দেয়নি বলে অভিযোগ আছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুক্রাবাদের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্যোক্তার নাম উল্লেখ করে শেখ কবির হোসেন, তিনি বা তার প্রতিষ্ঠান যদি এমনটি করে থাকেন, তাহলে সেটা কাম্য নয়। আমি তার সঙ্গে কথা বলব-এমনটি কেন করা হল। তিনি আরও বলেন, সঙ্গতি থাকা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি এমন করে থাকে সেটা ঠিক করেনি।

তিনি আরও বলেন, নির্দেশনায় ছাত্রছাত্রীদের দিকটি মানবিকভাবে দেখতে বলেছে ইউজিসি। আমরা মানবিকভাবেই দেখে আসছি। কেননা, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এককালীন টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয় না। বিশেষ করে ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ভর্তি আর পরীক্ষার আগে অল্প করে টাকা দিয়ে থাকে। কেউ কেউ পাস করে চলে যায়। পরে সার্টিফিকেট নেয়ার সময়ে টাকা দেয়। কিন্তু অনেক বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই এই সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আসলে নির্দেশনা দেয়ার সময়ে ইউজিসি উপর-নিচ (আর্থিক সঙ্গতিপূর্ণ ও সঙ্গতিহীন) গুলিয়ে ফেলে। আমার অনুরোধ থাকবে, অবস্থা বিবেচনা করে যেন তারা নির্দেশনা দেন। ২ হাজার শিক্ষার্থী থাকলে বা প্রতিষ্ঠার পর ২ বছর পার করলেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আয়-ব্যয়ে সমান (ব্রেক ইভেন্ট) পর্যায়ে আসে না। আমার জানামতে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই এখনও লোকসানে আছে। প্রতিষ্ঠান চালাতে ট্রাস্টিদের এখনও অর্থের সংস্থান করতে হয়। যেমন: আমাদের (ফারইস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টিরা নতুন করে টাকা দিয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি কিনেছেন। এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাবেন যাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় সঞ্চিত অর্থ ভেঙে জমি কিনেছে ও ভবন বানাচ্ছে। এখন ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি আদায় বন্ধ থাকলে জনবলের বেতন-ভাতা পরিশোধ করবে কীভাবে। বরং তাদের ভবন ভাড়া আর বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সেবা সার্ভিসের বিল পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত