খুলনার উপকূলে বেড়িবাঁধ

‘সংস্কার’ বারো মাস বান এলেই ভাঙন

অর্থ ব্যয় হলেও উপকারে আসে না * আম্পানে ভেসে গেছে ৩০ কিলোমিটার, দুর্ভোগ

  আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা ব্যুরো ২৩ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনার কয়রা উপজেলার বেড়িবাঁধ যেন দুগ্ধবতী গাভী। বাঁধ ভাঙলেই স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ঠিকাদারদের পকেট ভারি হয়, কাজেই মেরামত বা সংস্কার চলে সেভাবেই। দৃশ্যত সংস্কারের কাজ চলে বছরজুড়ে, প্রকৃত অর্থে শুধুই জোড়াতালি দেয়া হয়। আর এতে দিনের পর দিন বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলে প্রয়োজনের সময় সে বাঁধ কাজে আসে না।

২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর ১০ বছরেও প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন হয়নি এখানকার ১২১ কিলোমিটার বাঁধের। পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা ও সাতক্ষীরার মধ্যে সীমানা জটিলতার কারণে অবহেলার শিকার এ এলাকার মানুষ। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ভাঙনে প্লাবিত হয়েছে উপজেলার ৮০ ভাগ এলাকা। এতে আইলা পরবর্তী সময়ের মতো দুঃসহ কষ্টের মধ্যে পড়েছেন এ উপজেলার মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ২৫ মে উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে ৫৯৭ কিলোমিটার বাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। এর মধ্যে কয়রা উপজেলার ৬০ কিলোমিটার বাঁধ বিলীন হয়ে যায়। সে সময় ৩ বছর মানুষ নোনা পানিতে আবদ্ধ থাকেন। উপজেলার পাবনা বাঁধ, হারেজখালি, পদ্মপুকুর, শিকারিবাড়ি, পাথরখালি মেরামত করা হয়। কিন্তু ১০ বছরেও কয়রার ক্ষতিগ্রস্ত ৬ ইউনিয়নের কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩/১৪ ও ১৪/২ পোল্ডারের ৬০ কিলোমিটার বাঁধে পর্যাপ্ত মাটি দেয়া হয়নি। বাঁধগুলো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এরপরও গত ১০ বছরে এজন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, ‘সংস্কার’ও হয়েছে। তবে বরাদ্দের সিংহভাগই হয়েছে লুটপাট।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন অভিযোগ করেন, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলার বেড়িবাঁধ সংস্কারে সাড়ে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে ১৮-১৯ অর্থবছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। উন্নয়ন কাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো সাইনবোর্ড প্রদর্শন করা হয়নি। অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম করেই সংস্কার করা হয়েছে। যে কারণে দুর্বল বাঁধ আর মজবুত হয়নি। এসব অনিয়ম নিয়ে এলাকাবাসী মানববন্ধন পর্যন্ত করেছেন। তিনি বলেন, বারবার বাঁধ ভাঙলে কিছু প্রভাবশালীর পকেট ভারি হয়। এজন্য এসব স্বার্থান্বেষী মানুষ বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়াকে আশীর্বাদ হিসেবেই মনে করেন। উপজেলার বেড়িবাঁধ নির্মাণ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্নের দাবি জানান তিনি।

প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেড়িবাঁধ দেখভালেও অসুবিধা হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাঁধের জায়গাটি খুলনার হলেও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ফলে স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানরাও ঠিকমতো তদারকি করতে পারেন না কাজের।

এ অভিযোগ স্বীকার করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা। তিনি বলেন, ‘সমন্বয় সভায় আমরা তাদের পাই না। যেহেতু তারা অন্য জেলার, তাদের সমন্বয় সভাতেও আমরা থাকি না। ফলে সমস্যা, সম্ভাবনা ও সমাধান নিয়ে আমরা কারও সঙ্গে আলোচনাও করতে পারি না।’

খুলনার কয়রা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জিএম মহসিন রেজা বলেন, ‘যখনই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ হয়েছে তখন মূল ঠিকাদারকে কখনও এলাকায় দেখা যায়নি। তিনি কাজ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট কমিশনে কাজটি অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেন। ওই ঠিকাদার আবার তার কমিশন রেখে কাজটি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে অন্য ঠিকাদারদের হাতে দেন। এ হাত বদলের পর মাঠপর্যায়ে ৪০-৪৫ ভাগ বরাদ্দ পাওয়া যায়। এর সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনও জড়িত থাকে।’ তিনি বলেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে পাউবোর প্রকৌশলীদের নির্দিষ্ট সময়ে এলাকায় পাওয়া যায় না। সাতক্ষীরায় পাউবোর অফিস হওয়ার কারণে তারাও আমাদের কথাও শোনে না’।

খুলনা-৬ আসনের এমপি আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, আইলার থেকেও বেশি ক্ষতি হয়েছে কয়রা উপজেলাবাসীর। বেড়িবাঁধ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও এসেছেন বাঁধ নির্মাণে সহায়তার জন্য। মানুষের ক্ষতি টাকার অঙ্কে হিসাব করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এর আগে যারা তদারকি করেছে সে সময় ঠিকভাবে দেখভাল হয়নি। ফলে এ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষের।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, আম্পানে এ এলাকায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে লোকালয় তলিয়ে গেছে। দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নে শাকবাড়িয়া নদীর আংটিহারা মজিদ গাজীর বাড়ির পাশে, জোড়শিং বাজারের পাশে, কপোতাক্ষ নদের চোরামুখা খেয়াঘাটের কাছে, গোলখালী তসলিম মোল্লার বাড়ির পাশে, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের গাজীপাড়া গ্রামে, কাটকাটা বাজারের শাকবাড়ীয়া নদীর তীর, মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া গ্রামে কপোতাক্ষ নদ, কয়রা সদর ইউনিয়নের হরিণখোলা ও গোবরা ঘাটাখালি গ্রামে কপোতাক্ষ নদের আধা কিলোমিটার বা তার বেশি এলাকা ভেঙে তলিয়ে গেছে।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সাতক্ষীরা-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘কয়রায় ৩০ কিলোমিটার বাঁধ ধ্বংস হয়েছে। মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছেন। এর আগে বাঁধ নির্মাণে কোনো অনিয়ম হয়নি। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে বাঁধ ভেঙেছে।’ তিনি আরও বলেন, কয়রায় বাঁধ সংস্কার বা দেখভালে প্রশাসনিক কোনো জটিলতা নেই, কোনো সমস্যা হয় না।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত