ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনে ৫ রোগীর মৃত্যু 

১১ অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ৮টিই মেয়াদ উত্তীর্ণ

কারণ জানতে পৃথক তদন্ত কমিটি * কিছু সরঞ্জাম মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল -হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

  যুগান্তর রিপোর্ট  ২৯ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে বুধবার রাতে ভয়াবহ আগুনে ৫ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন একজন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। দেখা গেছে, ১১টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের মধ্যে ৮টিই মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। হাইড্রেন্ট কে চালাবে, কে কাজ করবে, কার দায়িত্ব এগুলো সুনির্দিষ্ট করা ছিল না। কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে প্রাথমিকভাবে তা নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগুন নির্বাপণে নিজেদের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আগুন লাগার পর রাত পৌনে ১০টার দিকে সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- মো. মাহবুব (৫০), মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৪৫)।
বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি হাসপাতালটিতে ত্রুটিপূর্ণ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে ফায়ার সেফটির ওপর গুরুত্ব দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। বেলা ১১টায় পরিদর্শনের সময় মেয়র বলেন, ইউনাইটেড হাসপাতালের সম্প্রসারিত অংশে ফায়ার ফাইটার, ফায়ার ড্রিল ও ফায়ার টিম ছিল না। ১১টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের মধ্যে মাত্র ৩টির মেয়াদ ছিল। অন্য ৮টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের মেয়াদ আগেই উত্তীর্ণ হয়ে যায়। হাইড্রেন্ট কে চালাবে, কে কাজ করবে, কার দায়িত্ব এগুলো সুনির্দিষ্ট করা ছিল না।
এদিকে কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা তা জানতে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধনের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন ফায়ার ব্রিগেড ট্রেনিং সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বাবুল চক্রবর্তী, উপসহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ ও বারিধারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র অফিসার মো. আবুল কালাম আজাদ। আর পুলিশের পক্ষ থেকে গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আবদুল আহাদকে (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন গুলশান বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে জানিয়ে কমিটির সদস্য নিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে জানান, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, রোগীর আত্মীয়স্বজন, ওই ওয়ার্ডের ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয় ছাড়াও যিনি ফায়ার সার্ভিসে প্রথম ফোন করেছিলেন তাদের সবার বক্তব্য নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কোনো আলামত যেন না সরানো হয়, সে ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে।’
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী যুগান্তরকে বলেন, আগুনের ঘটনায় নিহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজন করোনা পজিটিভ নিয়ে ওই হসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বাকি দু’জন ভর্তি হয়েছিলেন করোনা উপসর্গ নিয়ে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় করোনা পজিটিভ তিনজনকে আইইডিসিআরের নিয়ম অনুযায়ী দাফন করা হবে। আর বাকি দু’জনের নমুনা পরীক্ষা ও ময়নাতদন্ত শেষে (নেগেটিভ হলে) তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ ঘটনায় পুলিশের গুলশান থানা তদন্ত করছে জানিয়ে সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, এ ঘটনায় কোনো গাফিলতি থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অগ্নিকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নিহত ভারনন অ্যান্থনি পলের মেয়ে পুলিশকে জানিয়েছেন, বুধবার রাত পৌনে ১০টার দিকে তিনি প্রথম আগুন দেখতে পান। ঘটনার সময় তিনি হাসপাতালের প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। আগুন দেখে তিনি রাত ৯টা ৪৮ মিনিটে প্রথম ৯৯৯-এ ফোন দেন। তিনি জানান, মুহূর্তের মধ্যেই হাসপাতাল কম্পাউন্ডে করোনা রোগীদের জন্য তাঁবু টানিয়ে যেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে।
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার কামরুল ইসলাম জানান, হাসপাতালটির নিচতলায় তাঁবু টানিয়ে অস্থায়ী চারটি আইসোলেশন কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। সামনের কক্ষের রোগীরা বের হতে পারলেও আগুন নেভানোর পর ভেতরে একটি কক্ষে ৫ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, নিহতদের মধ্যে মো. মাহবুব গত ১৫ মে, মনির হোসেন ১৬ মে, অ্যান্থনি পল ও খোদেজা বেগম ২৫ মে আর রিয়াজুল আলম ২৭ মে হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছিলেন।
সুদীপ কুমার চক্রবর্তী আরও জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগুনের সূত্রপাতস্থলে বিপুলসংখ্যক দাহ্য পদার্থ স্যানিটাইজার ছিল। এছাড়াও ঘটনার সময় প্রচণ্ড বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রেস ব্রিফিং : বৃহস্পতিবার বিকালে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির চিফ অব কমিউনিকেশনস অ্যান্ড বিজনেস ডা. শাগুফা আনোয়ার বলেন, সম্ভবত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন আইসোলেশন ইউনিটের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় আবহাওয়া খারাপ ছিল ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বাতাসের তীব্রতায় আগুন দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভর্তি ৫ জন রোগীকে বাইরে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। তারা মৃত্যুবরণ করেছেন। তারা করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিলেন।
ডা. শাগুফা বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দমকল বাহিনীকে তাৎক্ষণিক খবর দেয়া হয়। হাসপাতালের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও দমকল বাহিনীর সহায়তায় ১৫-২০ মিনিটে আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়। কারোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি।
হাসপাতালটির যোগাযোগ ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের এই পরিচালক আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভর্তি সকল রোগীর নিরাপত্তার ব্যাপারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। কাজেই হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের পরিবারকে এই অনভিপ্রেত ঘটনায় আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
ফায়ার সার্ভিসের গঠিত কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দিক থেকে যা যা সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা দরকার ছিল, তা করেছি। তারপরও আমাদের কারও কোনো গ্যাপ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ১২ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী রোববারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় করোনা ইউনিটে কোনো চিকিৎসক বা নার্স ছিল না- এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সেখানে নার্সও ছিল, ডাক্তারও ছিল। কিন্তু তারা বের হতে পেরেছেন। আর যারা রোগী ছিলেন তারা কেউই হাঁটাহাঁটির অবস্থায় ছিলেন না, লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
অবহেলার অভিযোগ স্বজনদের : অগ্নিকাণ্ডে নিহত রোগীদের কয়েকজনের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালটির বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিহতদের একজন রিয়াজুল আলমের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার জেনি বলেন, এতটুকু করোনা ইউনিট থেকে দু চার জনকে বের করতে পারলো না? অবশ্যই অবহেলা ছিলো। আমার হাজব্যন্ডকে মেরে ফেলা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে আরেকজন খোদেজা বেগমের সন্তান মোহাম্মদ আলমগীর বলেছন হাসপাতালের ওরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেনি।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত