নমুনা পরীক্ষায় বিড়ম্বনা

চট্টগ্রামে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ০২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে প্রতিদিনই করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন এক বা একাধিক মানুষ। নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় এদের হিসাব কেউ রাখছে না। সরকারি হিসাবে উঠছে না তাদের নাম। তাই করোনায় মারা যাওয়া রোগীর যে পরিসংখ্যান চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ দিচ্ছে তা প্রকৃত চিত্র নয়। প্রকৃত অর্থে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের কয়েকগুণ হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে করোনা উপসর্গ বা অন্য কোনো জটিল রোগ নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গেলেও মিলছে না চিকিৎসা। করোনা পরীক্ষার আগে এমন রোগীদের যেমন হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছে না, তেমনি শ্বাসকষ্টের রোগী হলেও তারা পাচ্ছে না আইসিইউ সেবা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কোভিড নন কোভিড- যে ধরনের রোগীই হোক না কেন ভর্তি করানোর নির্দেশনা দেয়া হলেও ‘সিট খালি নেই’ উল্লেখ করে এমন রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, শিল্পপতিসহ একাধিক ব্যক্তির বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে প্রতিষ্ঠিত লোকজনই চিকিৎসা নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছেন সেখানে সাধারণ মানুষের বেলায় যে কী হচ্ছে তার খবর কে রাখে? বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো, চিকিৎসা না পাওয়াসহ নানা কারণে করোনার উপসর্গ থাকলেও তা গোপন করা হচ্ছে। মৃত্যুর পর দ্রুততম সময়ে প্রিয়জনদের দাফন করে ফেলা হচ্ছে।

চিকিৎসা নৈরাজ্যের শিকারদের মধ্যে আছেন চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক হাসান শাহরিয়ারও। কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য তার মাকে চট্টগ্রামের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে চাইলেও পারেননি।

নিরুপায় হয়ে পরে তিনি চলে যান ঢাকায়। চট্টগ্রাম বারের বিশিষ্ট আইনজীবী আবুল কাশেম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা শিক্ষা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক সাবরিনা ইসলাম সুইটি, চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের পিএস, শিল্পপতি মোহাম্মদ ইউনুচ, মাদারবাড়ি ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাজহারুল ইসলামসহ অসংখ্য মানুষ চট্টগ্রামে চিকিৎসা নৈরাজ্যের শিকার হয়ে মারা গেছেন। তবে করোনা উপসর্গ থাকলেও করোনা পজিটিভ ছিল কিনা তা শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি। মারা যাওয়ার পর এদের নমুনাও নেয়া হয়নি। ফলে জানা গেল না তারা কোভিড-১৯ রোগী ছিলেন কি না।

চট্টগ্রামে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের করোনা সেলের প্রধান ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, করোনায় চট্টগ্রামে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান দেয়া হচ্ছে প্রকৃত অর্থে এর ৫-১০ গুণ বেশি রোগী মারা যাচ্ছে। নমুনা পরীক্ষা সহজে না হওয়ার কারণে মৃত্যু ও আক্রান্তের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া কোভিড-১৯ চিকিৎসা নিয়ে চট্টগ্রামের সিভিল ও স্বাস্থ্য প্রশাসন যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।’ সূত্র বলছে, গত ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রামে করোনায় মৃত্যু হয় ১৫৪ জনের। এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেলায়ই ৭৫ জন। বিভাগে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৯৮৩ জন।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি যুগান্তরকে বলে, “এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, করোনা উপসর্গের রোগীদেরই নমুনা সংগ্রহে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শুরুর দিকে বাসায় গিয়ে নমুনা আনা হলেও এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না, হাসপাতালে রোগী বেড়ে যাওয়ায়

। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহতো দূরহই বটে। পরীক্ষা করা হলে অনেকেরই পজিটিভ আসত। তবে তিনি বলেন, কেবল করোনার কারণেই নয়, অনেক রোগেরই সর্বশেষ অবস্থা কিন্তু শ্বাসকষ্ট। এখন সব শ্বাসকষ্টের রোগীকেই ‘করোনা রোগী’ হিসেবে ট্রিট করছে বেসরকারি হাসপাতাল বা স্বজনরা। যে কারণে চিকিৎসা সংকট তৈরি হয়েছে। স্বজনরাই মৃত্যুর খবর গোপন করে দ্রুত দাফন করছেন।”

গত ২৮ মে চট্টগ্রামের আইনজীবী আবুল কাশেম চৌধুরীর (৬৮) বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নিয়ে তার ছোট ভাই ব্যাংকার মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাই এজমা’র রোগী ছিলেন। হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়বেটিসও ছিল তার। আগের দিন তার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করি। করোনা টেস্টের রিপোর্ট না থাকায় কোনো ক্লিনিক ভর্তি নিতে রাজি হয়নি।

২৮ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর অবজারভেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করি। করোনা টেস্টের রিপোর্ট না থাকায় অক্সিজেন ও আইসিইউ সেবাও দেয়া হয়

নি। পরে তাকে বাসায় নিয়ে যাই। সন্ধ্যায় ভাইয়ের মৃত্যু হয়।’ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জিয়াউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘এভাবে বিনা চিকিৎসায় চট্টগ্রামে মানুষ মারা যাচ্ছে। এটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নৈরাজ্যের চিত্র বৈকি!’

গত শনিবার করোনা উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা শিক্ষা ইন্সটিটিউটের শিক্ষিকা সাবরিনা ইসলাম সুইটি (৪৯) ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পার্সোনাল অফিসার (পিএ) আবদুল মান্নান (৫০) করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। চবি শিক্ষিকাকে নগরীর বেসরকারি মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শনিবার সন্ধ্যায়। রোববার ভোররাতে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলেও শয্যা খালি না থাকার কথা বলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার পরিবারের। তবে হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নুরুল হক যুগান্তরকে জানান, ‘একজন রোগীকে বাঁচানোর জন্য আরেকজন রোগীকে মেরে ফেলার সুযোগ নেই। চবির ওই শিক্ষিকার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। শয্যা খালি না থাকায় তাকে তারা আইসিইউতে নিতে পারেননি।’

সূত্র জানায়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এভাবে রোগী ফিরিয়ে দেয়া নিয়ে সিএমপি কমিশনার শনিবার বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে তিনি দায়ী ক্লিনিকের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলেরও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, সব ধরনের রোগী ভর্তি করতে হবে। এর আগে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বেসরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মনিটরিংয়ের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত