বন্যা পরিস্থিতি

উত্তরে অপরিবর্তিত পূর্বাঞ্চলে উন্নতি

৯ নদীর পানি বিপদসীমার উপরে * বানের পানিতে তিন শিশুর মৃত্যু, নিখোঁজ ১ * কিছু জায়গায় বেড়েছে পানিবাহিত রোগ * শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব

  যুগান্তর ডেস্ক  ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সার্বিক বন্যা অব্যাহত আছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিম, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত তেমন একটা হয়নি। এতে উজান থেকে বানের পানি আসা বন্ধ হওয়ায় ব্রহ্মপূত্র-যমুনার তীরবর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়নি। তবে এ দুই নদীর পানি নেমে আসছে পদ্মায়। এ কারণে পদ্মা নদীর তীরবর্তী রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও মাদারীপুরের নিম্নাঞ্চলে ঢুকে গেছে বানের পানি। রংপুর ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অবশ্য মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি অব্যাহত আছে। বৃষ্টির এ পানি যুক্ত হচ্ছে নদ-নদীতে। এটা অবশ্য তেমন প্রভাব ফেলছে না। এ কারণে সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। তবে উত্তরে অপরিবর্তিত রয়েছে।

কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে এক যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। মানুষ গৃহস্থালি মালামালসহ ছাগল, হাঁস, মুরগি ও গরু, মহিষের গো-খাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির অভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। শুকনো খাবার না থাকায় ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। তবে প্রশাসন ও বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এসব ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। নদ-নদী, খাল-বিল থেকে পানি কিছুটা নেমে গেলেও সে সঙ্গে বাড়ছে পানিবাহিত রোগ।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) মঙ্গলবারের বুলেটিনে বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় (আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত) কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। অপরদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জে উন্নতি হতে পারে। ব্রহ্মপূত্র-যমুনার পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদীগুলোর পানি সমতল বাড়ছে। যমুনার পানি নামতে থাকায় এ পরিস্থিতি আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকবে। মেঘনা অববাহিকার উপরের অংশে প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে।

এ পরিস্থিতি আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশে বন্যার কারণের মধ্যে আছে ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকে নেমে আসা বানের পানি, অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল। এসব কারণে বর্তমানে নয়টি নদী বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধরলা, ঘাঘট, আত্রাই, পদ্মা, সুরমা, পুরাতন সুরমা। পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের ১০১ স্থানে পানি সমতল পর্যবেক্ষণ করে থাকে। এর মধ্যে ১৫ স্থানে পানি বইছে বিপদসীমার উপরে। ৬৩ স্থানেই বেড়েছে পানির সমতল। যুগান্তর ব্যুরো, স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি সামান্য কমলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি ১ সেমি. কমে বিপদসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ২ সে.মি. কমে বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া করতোয়ার পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে এখনও বিপদসীমার কিছুটা নিচে রয়েছে। এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। গোবিন্দগঞ্জে করতোয়ার তীর এবং ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নদী ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। গাইবান্ধা সদরের নতুন ব্রিজ থেকে ডেভিড কোম্পানিপাড়ার আগের বাড়ি পর্যন্ত শহর রক্ষা বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যার আগে তড়িঘড়ি করে বালু দিয়ে সংস্কার শুরু করে। বন্যার পানির তোড়ে বালু সরে গিয়ে বাঁধের ৪টি পয়েন্টে ফুটো দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ছে। সে সঙ্গে বাঁধের গোড়ার মাটি ধসে যাচ্ছে। এতে শহর রক্ষা বাঁধটি এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

কুড়িগ্রাম ও রৌমারী : কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নদ-নদীর পানি সামান্য কমলেও ধরলা, দুধকুমর ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি গত ৫ দিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে ডুবে শান্ত, বেলাল ও মোস্তাকিম নামে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দি প্রায় দেড় লাখ মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। ৬ দিন ধরে বন্যার পানিতে ভাসলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ তৎপরতা চোখে পড়ছে না। চলতি বন্যায় জেলায় নদী ভাঙনের শিকার হয়ে ভিটেমাটি হারিয়েছে ৫০০ পরিবার। মঙ্গলবার ধরলার পানি বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া, দুধকুমর নদীর পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা নদী তীরবর্তী ৪টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের ২০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এসব ইউনিয়ন হল, কৈজুরি, গালা, জালালপুর, খুকনি ও সোনাতনী। এসব ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি, গালা, জালালপুর, খুকনি ও সোনাতনী ইউনিয়নের প্রায় ১৮টি গ্রামে যমুনা নদীর ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। কয়েকদিনের অব্যাহত ভাঙ্গণে এসব এলাকার অন্তত ২০০ বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে।

দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর (জামালপুর) : দেওয়ানগঞ্জ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। পৌর এলাকাসহ ৮টি ইউনিয়নে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। মঙ্গলবার দুপুরে দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টের যমুনার পানি ২৪ ঘণ্টায় ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হাসান বলেন, বানভাসিদের জন্য ২১ টন জিআর চাল, ১ লাখ ৭৭ হাজার নগদ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ১৭৭টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ইসলামপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যার্তদের জন্য ২৬ টন চাল ও নগদ ২ লাখ ২১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৮০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

সিলেট ও গোলাপগঞ্জ : সিলেট জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সম্প্র্রতি আকস্মিক বন্যায় সিলেটের সদর উপজেলার জালালাবাদ, মোগলগাঁও, হাটখোলা এবং কান্দিগাঁও ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া খাদিমনগর, টুকেরবাজার, খাদিমপাড়া, টুলটিকর ইউনিয়নগুলোর আংশিক প্লাবিত হয়েছে। সিলেটে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। নদীতে ধীরগতিতে পানি কমার কারণে প্লাবিত এলাকাগুলোর পানিও কমছে ধীরে ধীরে। এ কারণে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ সহজে কমছে না। মঙ্গলবার দুপুরে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

সুনামগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার : সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল কমে যাওয়ায় দ্রুত নামতে শুরু করেছে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি। মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ২৪ ঘণ্টায় জেলায় গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৪৩ মি.মিটার। দোয়ারাবাজারে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে পা পিছলে বানের পানিতে ডুবে নাজির আহমদ (৩০) নামে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। তিনি উপজেলার পাণ্ডারগাঁও ইউনিয়নের মঙ্গলপুর গাজীনগর গ্রামের ছিদ্দেক আলীর ছেলে।

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) : হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ির জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ের ঢাল ও চূড়ায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে ২৪টি ত্রিপুরা পরিবার। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে টিপরা পল্লীতে ব্যাপক ধস দেখা দিয়েছে। এতে এসব বাড়িঘর ভেঙে যেতে পারে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত