বারবার লঞ্চ দুর্ঘটনা: তদন্ত হলেও প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের প্রশিক্ষণ ও সনদ নিয়ে প্রশ্ন

  সাইদুর রহমান পান্থ, বরিশাল ব্যুরো ০৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

প্রতি বছর দক্ষিণাঞ্চলে নৌ দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার পরপরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কখনই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও কোনো নজির নেই। এ কারণে দোষীরা অধরাই থেকে যায়। পাঁচ বছরে বরিশালে তিনটি বড় লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলেও দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। অপরদিকে ছোট-বড় নৌযানের চালক, সারেং, মাস্টার ও সুকানিদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর সনদ দিচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নৌযান মালিকরা।

ছোট-বড় লঞ্চ বা ট্রলার দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, চালকদের অদক্ষতা-অনভিজ্ঞতা, লঞ্চের ফিটনেসের অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। সোমবার সকালে ঢাকার বুড়িগঙ্গায় ময়ূর-২ এর ধাক্কায় মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় শিশুসহ ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবেদন কি আলোর মুখ দেখবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

২০১৬ সালের ৫ জুলাই ভোররাতে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে ঢাকাগামী সুরভী-৭ লঞ্চের সঙ্গে বরিশালগামী সরকারি নৌযান পিএস মাহসুদের সংঘর্ষ হয়। এতে ছয়জনের মৃত্যু হয়। ১৫ জন আহত হন। হতাহত সবাই পিএস মাহসুদের যাত্রী। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়নি এবং দোষীরাও সাজা পায়নি।

২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় বালুবাহী কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রিন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে যায়। লঞ্চটি তাৎক্ষণিক তীরে নেয়ায় দুই শতাধিক যাত্রী সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান। সেখানেও লোক দেখানো তদন্ত কমিটি করা হয়। কিন্তু দোষী কারা এবং কী ধরনের শাস্তি দেয়া হয়েছে তা জানা যায়নি।

২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি মেঘনা নদীর চাঁদপুর সংলগ্ন মাঝ কাজীর চর এলাকায় এমভি কীর্তনখোলা-১০ এবং এমভি ফারহান-৯ লঞ্চের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই যাত্রী নিহত এবং আটজন আহত হয়। এখানেও বরাবরের মতো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু প্রতিবেদন দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল ও যাত্রী পরিবহন সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, নৌপথে প্রায় সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে। চালক, মাস্টার, সুকানির অদক্ষতা, গাফিলতির কারণেই বেশির ভাগ সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে। চালক ও মাস্টাররা একটু সচেতন হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। অভিযোগ করে তিনি বলেন, সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাস্টার, সুকানি না রাখলে সরকার আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হল সবাই প্রশিক্ষণে একই সনদ পেলে প্রশিক্ষণের পার্থক্যটা কী?

বরিশাল সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক কাজী এনায়েত হোসেন শিপ্লু বলেন, প্রতি বছরই এ ধরনের লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটছে। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তদন্তের প্রতিবেদন কখনও প্রকাশিত হয় না। দোষীদের কোনো বিচার হতেও দেখা যায় না। বিচারহীনতার ফলে প্রতি বছরই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। বরিশাল জনস্বার্থ রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ও বরিশাল জেলা পরিষদের সদস্য মানুওয়ারুল ইসলাম অলি বলেন, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলে সবাই সচেতন হয়ে নৌযান পরিচালনা করত।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র সচিব কাজী ওয়াকিল নেওয়াজ ও বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক আজমল হুদা মিঠুর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, শুধু তদন্ত কমিটি হয়- বিচার হয় না, বিষয়টি তা নয়। মূলত দুর্ঘটনা নিয়ে মানুষের যেভাবে কৌতূহল থাকে, বিচার হওয়ার সময় সেটা তেমন একটা থাকে না। পাশাপাশি তদন্ত ও মামলার দীর্ঘসূত্রতায় বিচার নিয়ে কৌতূহল থাকে না। তিনি বলেন, আগের চেয়ে নৌ দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে গেছে। বিচার ও তদন্ত থেকে সুপারিশের কারণেই দুর্ঘটনা কমেছে। তিনি আরও বলেন, বিচারকার্যও মানুষের সামনে আসা দরকার।

ঘটনাপ্রবাহ : বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি ২০২০

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত