অর্থনীতির আকার বাড়লেও ছোট হচ্ছে শেয়ারবাজার
jugantor
অর্থনীতির আকার বাড়লেও ছোট হচ্ছে শেয়ারবাজার
জিডিপির বিপরীতে পুঁজিবাজারের আকার ছোট হচ্ছে * কমছে কর্মসংস্থান ও পুঁজি জোগান

  মনির হোসেন  

০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে অর্থনীতির আকার বাড়ছে। কিন্তু ছোট হচ্ছে শেয়ারবাজার। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বাজার মূলধন কমছে। একইভাবে কমছে বাজার থেকে শিল্পায়নের পুঁজির জোগান। আবার করোনার প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানও কমছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরাও বাজারকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যে কারণে এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রণোদনা দেয়া হয়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের শিল্পায়নের পুঁজির জোগানে এ খাতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। কারণ শেয়ারবাজারই একমাত্র খাত, সেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জোগান দেয়া যায়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পৃথিবীর যে দেশের পুঁজিবাজার যত বেশি সমৃদ্ধ, ওই দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী। তিনি বলেন, শিল্পায়নে পুঁজির জোগান বাড়াতে শেয়ারবাজারকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শেয়ারবাজারই একমাত্র জায়গা, যেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জোগান দেয়া যায়। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, শিল্প উদ্যোক্তা এবং সরকার- সব পক্ষই লাভবান হয়। তবে বাজারের সুশাসন থাকলেও কেবল শেয়ারবাজারে সুফল পাওয়া যায়।

জানা গেছে, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যা ১৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজারমূলধন ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে জিডিপির তুলনায় বাজারমূলধন ১০ শতাংশেরও কম। ২০১০ সালে জিডিপির তুলনায় বাজারমূলধন ছিল ৩৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৯ সালে ১৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ জিডিপির বিপরীতে প্রতিনিয়ত বাজারমূলধন কমছে। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় জিডিপির তুলনায় বাজারমূলধন প্রায় সমান। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাজারমূলধন জিডিপির ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৯৯ দশমিক ২ শতাংশ, চীনে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ ও পাশের দেশ ভারতে ৭৬ দশমিক ৪ শতাংশ ।

পুঁজির জোগানও কমেছে। ২০২০ সালে এ পর্যন্ত মাত্র ১টি বন্ড বাজারে এসেছে। কিন্তু ২০১৯ সালে ৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে করোনার কারণে শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে ডিএসইতে ২৩৮টি ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক রয়েছে। এ ছাড়াও ১৫টির বেশি এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি রয়েছে। এর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে জনবল ছাঁটাই হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনও ছাঁটাই চলছে। বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেনি। এমনকি ডিএসইতে জনবল ছাঁটাই ও বেতন কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। ডিএসইর পরিচালক সালমা নাসরিনকে প্রধান করে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি করা হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. রকিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, পুঁজিবাজারের বিকাশের জন্য সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলেই কেবল শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির সরবরাহ বাড়বে। এতে অর্থনীতিতে গতি আসবে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কিন্তু এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারকে অবহেলা করা হয়েছে। শুধু কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ ছাড়া বাজারের জন্য কোনো প্রণোদনা দেয়া হয়নি। কালো টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক শর্ত দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে বাজারের আকার বাড়বে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজার খোলা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে টানা দুই মাস বন্ধ ছিল বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। এ সময়ে বাজারে লেনদেন হয়নি। এরপর ৩১ মে বাজার চালু হলেও স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না। এক ধরনের কৃত্রিম সাপোর্ট দিয়ে বাজার ধরে রাখা হয়েছে। এতে বাজারে মানুষ স্বাভাবিক লেনদেন করছে না। বেশকিছু বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ক্রয় আদেশ কম থাকায় ওইভাবে লেনদেন হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃত্রিম উপায়ে এভাবে বেশিদিন বাজার ধরে রাখলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমবে। তাদের মতে, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি।

অর্থনীতির আকার বাড়লেও ছোট হচ্ছে শেয়ারবাজার

জিডিপির বিপরীতে পুঁজিবাজারের আকার ছোট হচ্ছে * কমছে কর্মসংস্থান ও পুঁজি জোগান
 মনির হোসেন 
০৬ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে অর্থনীতির আকার বাড়ছে। কিন্তু ছোট হচ্ছে শেয়ারবাজার। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বাজার মূলধন কমছে। একইভাবে কমছে বাজার থেকে শিল্পায়নের পুঁজির জোগান। আবার করোনার প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানও কমছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরাও বাজারকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যে কারণে এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রণোদনা দেয়া হয়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের শিল্পায়নের পুঁজির জোগানে এ খাতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। কারণ শেয়ারবাজারই একমাত্র খাত, সেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জোগান দেয়া যায়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পৃথিবীর যে দেশের পুঁজিবাজার যত বেশি সমৃদ্ধ, ওই দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী। তিনি বলেন, শিল্পায়নে পুঁজির জোগান বাড়াতে শেয়ারবাজারকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শেয়ারবাজারই একমাত্র জায়গা, যেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জোগান দেয়া যায়। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, শিল্প উদ্যোক্তা এবং সরকার- সব পক্ষই লাভবান হয়। তবে বাজারের সুশাসন থাকলেও কেবল শেয়ারবাজারে সুফল পাওয়া যায়।

জানা গেছে, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যা ১৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজারমূলধন ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে জিডিপির তুলনায় বাজারমূলধন ১০ শতাংশেরও কম। ২০১০ সালে জিডিপির তুলনায় বাজারমূলধন ছিল ৩৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৯ সালে ১৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ জিডিপির বিপরীতে প্রতিনিয়ত বাজারমূলধন কমছে। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় জিডিপির তুলনায় বাজারমূলধন প্রায় সমান। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাজারমূলধন জিডিপির ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৯৯ দশমিক ২ শতাংশ, চীনে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ ও পাশের দেশ ভারতে ৭৬ দশমিক ৪ শতাংশ ।

পুঁজির জোগানও কমেছে। ২০২০ সালে এ পর্যন্ত মাত্র ১টি বন্ড বাজারে এসেছে। কিন্তু ২০১৯ সালে ৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে করোনার কারণে শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে ডিএসইতে ২৩৮টি ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক রয়েছে। এ ছাড়াও ১৫টির বেশি এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি রয়েছে। এর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে জনবল ছাঁটাই হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনও ছাঁটাই চলছে। বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেনি। এমনকি ডিএসইতে জনবল ছাঁটাই ও বেতন কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। ডিএসইর পরিচালক সালমা নাসরিনকে প্রধান করে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি করা হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. রকিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, পুঁজিবাজারের বিকাশের জন্য সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলেই কেবল শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির সরবরাহ বাড়বে। এতে অর্থনীতিতে গতি আসবে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কিন্তু এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারকে অবহেলা করা হয়েছে। শুধু কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ ছাড়া বাজারের জন্য কোনো প্রণোদনা দেয়া হয়নি। কালো টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক শর্ত দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে বাজারের আকার বাড়বে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজার খোলা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে টানা দুই মাস বন্ধ ছিল বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। এ সময়ে বাজারে লেনদেন হয়নি। এরপর ৩১ মে বাজার চালু হলেও স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না। এক ধরনের কৃত্রিম সাপোর্ট দিয়ে বাজার ধরে রাখা হয়েছে। এতে বাজারে মানুষ স্বাভাবিক লেনদেন করছে না। বেশকিছু বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ক্রয় আদেশ কম থাকায় ওইভাবে লেনদেন হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃত্রিম উপায়ে এভাবে বেশিদিন বাজার ধরে রাখলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমবে। তাদের মতে, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি।

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস