ডিএমপি কমিশনারকে ঘুষের প্রস্তাব

সেদিনের ‘মর্নিং মিটিংয়ে’ যা ঘটেছিল

  সিরাজুল ইসলাম ১১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে যুগ্ম কমিশনার ইমাম হোসেনের ঘুষ দেয়ার প্রস্তাবের ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনে এখনও তোলপাড় চলছে। ইমাম হোসেনকে ডিএমপি থেকে বদলির অনুরোধ করা হলেও বরং অন্য কর্মকর্তাদের বদলি করা হচ্ছে। সর্বশেষ যুগ্ম কমিশনার শাহ মিজান শাফিউর রহমানকে ঢাকার বাইরে বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে।

যে ‘মর্নিং মিটিং’-এর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম হোসেনকে ডিএমপি কমিশনার দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়েছিলেন সেই মিটিংয়ের বিস্তারিত তথ্য যুগান্তরের হাতে এসেছে। ইমাম ইস্যুতে সেদিন কোন কর্মকর্তার কী ভূমিকা ছিল তাও জানা গেছে।

ডিএমপির একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র যুগান্তরকে জানায়, ৩০ মে সকাল ১০টায় প্রতিদিনের মতো ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে চা চক্রে (মর্নিং মিটিং) মিলিত হন। চা চক্রে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন, অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) মীর রেজাউল আলম, অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায়, ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) আবদুর রাজ্জাক, ডিবির জয়েন্ট কমিশনার মাহবুব আলম এবং উপকমিশনার (সদর দফতর) আনিসুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মিটিংয়ের শুরুতেই ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আজ আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার একজন অধীনস্থ (যুগ্ম কমিশনার ইমাম হোসেন) আমাকে ঘুষের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করিনি। এ কারণে বিভিন্নভাবে সে আমাকে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। আমাকে ছোট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি এরকম চাকরি কখনও করিনি। করোনা পরিস্থিতি না হলে তাকে দেখে নিতাম।’

এ সময় অতিরিক্তি কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে আইজিপি মহোদয় বরাবর একটি অভিযোগ দিতে পারেন। কারণ, সে (ইমাম) দুষ্ট প্রকৃতির লোক। আগের কমিশনারের আমলেও সে নানা অপকর্ম করেছে। নিজের অফিস বাদ দিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকদের বাসায় গিয়ে পড়ে থাকে। সে কোনো কমান্ড মানে না।’

এরপর অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ‘স্যার, আইজিপি মহোদয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে একটি চিঠি দেয়া দরকার। কারণ, আমরা দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে শুধু মুখে মুখে বলে আসছি।

এর আগে সাবেক আইজিপি শহীদুল হকও তাকে বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাকে বরিশাল মেট্রোপলিটনে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগের সপক্ষে রেকর্ড না থাকায় তিনি তা পারেননি। আপনি একটি চিঠি দিলে রেকর্ড থাকবে।’

তখন অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘আমি তো মনে করি চিঠি এখনই দেয়া উচিত। কারণ, দেরি হলে হয়তো ভুলে যাবেন। তখন বিষয়টি চাপা পড়ে যেতে পারে।’

এ সময় ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আজ তো শনিবার। চিঠি লেখার মতো তো কেউ নেই অফিসে।’

এ সময় কৃষ্ণপদ বলেন, ‘যারা আছেন তাদের মাধ্যমেই চিঠি দিন। অফিসে আপনার স্টাফ অফিসার এবং স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে।’

এরপর কমিশনার বেল চাপলে তার স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রবিউল ইসলাম ভেতরে আসেন। রবিউলকে কমিশনার কানে কানে কিছু নির্দেশনা দিয়ে ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে আইজিপি বরাবর চিঠির ড্রাফট লিখতে বলেন।

তিনি বলেন, ‘চিঠিটি ড্রাফট করে আমাকে দেখিয়ে নিবা। এটা খুবই কনফিডেন্সিয়াল বিষয়। চিঠিটি একজন অফিসার দিয়ে পুলিশ সদর দফতরে আজই পৌঁছে দিবা।’ এরপর আরও প্রায় আধা ঘণ্টা মর্নিং মিটিং চলে।

ওই দিনই বিকাল ৫টার পর সহকারী কমিশনার (তৎকালীন এসি অ্যাডমিন, বতর্মানে এসি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল) আশিক হাসান পুলিশ সদর দফতরে একজন ডিআইজির হাতে চিঠিটি পৌঁছে দেন। আইজিপিকে চিঠি দেয়ার পর এক সপ্তাহেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এরপর ৫ জুন যুগান্তরে ‘ডিএমপি কমিশনারকে ঘুষের প্রস্তাব দিলেন যুগ্ম কমিশনার’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে অন্য সংবাদমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রচার বা প্রকাশ করা হয়।

ওই দিনের মর্নিং মিটিংয়ে উপস্থিত অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অতিরিক্ত কমিশনার (কাউন্টার টেরোরিজম) মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই দিনের চা চক্রে এ ধরনের কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ছে না।

অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন বলেন, একাডেমিক এবং প্রশাসনিক বিষয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

যুগ্ম কমিশনার শাফিউর রহমানকে বদলি : ২৯ জুন যুগ্ম কমিশনার শাফিউর রহমানকে রংপুরের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে বদলির আদেশ দেয়া হয়। আদেশে ৫ জুলাইয়ের মধ্যে রংপুরে তাকে যোগদান করতে বলা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে সেখানে যোগ না দেয়ায় ৬ জুলাই পুলিশ সদর দফতর থেকে তাকে দুটি চিঠি দেয়া হয়।

একটি চিঠিতে তাকে সতর্ক করে বলা হয়, ‘বিষয়টি আপনার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হতে পারে।’ অপর চিঠিতে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল ত্যাগ না করলে তাকে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত করার হুমকি দেয়া হয়। এ হুমকির পর ৭ জুলাই বর্তমান কর্মস্থল থেকে তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

অথচ যুগ্ম কমিশনার ইমাম হোসেনের দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত থমকে গেছে। জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) জানাতে ১৪ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দেন দুদক মহাপরিচালক একেএম সোহেল। কিন্তু এখনও দুদককে কিছুই জানানো হয়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হলেও ইমাম হোসেন খুব প্রভাবশালী। সরকারের উচ্চপর্যায়ে রয়েছে তার ঘনিষ্ঠতা। তাই তার বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে না।

অন্যদিকে, তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত আখ্যা দিয়ে যে চিঠি দেয়া হয়েছে সেই চিঠি কীভাবে ফাঁস হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত চলছে। যুগ্ম কমিশনার শাফিউর রহমান চিঠিটি ফাঁস করেছেন বলে ইমাম হোসেনের পক্ষ থেকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ কারণেই তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

তবে শাফিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এ বদলিকে আমি স্বাভাবিক হিসেবে দেখছি। দেশে ষড়যন্ত্রের দীর্ঘদিনের ইতিহাস রয়েছে তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র হয়ে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

এ বিষয়ে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ এবং যুগ্ম কমিশনার (বর্তমানে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি) ইমাম হোসেনের বক্তব্য নিতে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মইনুর রহমান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি খুবই কনফিডেন্সিয়াল। তাই এ মুহূর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বলতে পারি, বদলি পুলিশের একটি রুটিন ওয়ার্ক।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত